পাঠ্যপুস্তকে ভূমি বিষয়ক আইন ও নিয়মকানুন নেই কেন? - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

পাঠ্যপুস্তকে ভূমি বিষয়ক আইন ও নিয়মকানুন নেই কেন?



খবর তরঙ্গ ডেস্ক, (খবর তরঙ্গ ডটকম)
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক কিছু শিখানো হয়, কিন্তু ভূমি সম্পর্কে আলাদা কোনো বিভাগ বা পাঠ্যসূচি নেই। কীভাবে জমির হিস্যা, জমির নামজারি, জমাভাগ হয়- তা সাধারণ মানুষ জানে না। এ তথ্যগুলো কোনো পাঠ্যপুস্তকে উল্লেখ নেই। দেশের ৯৫ ভাগ মানুষের জমিজমা সম্বন্ধে কোনো ধারণাই নেই।
প্রত্যেক নাগরিকের নিজের স্বার্থেই ভূমিসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আইন-কানুন ও নিয়মাবলী সবার জানা জরুরী। এমন বাস্তবতা থেকে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আজো এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অথচ আমাদের যত সমস্যা তার বেশির ভাগই জমি নিয়ে। কোর্টে যত মামলা তার ৬০ ভাগই জমিজমা নিয়ে।
অনেকে লেখাপড়া শেষ করেছেন। কিন্তু দেখা যায়, তিনি জমি সম্পর্কে কিছুই বলতে পারেন না। তাই আমরা মনে করি, প্রত্যেক মানুষেরই ভূমিসংক্রান্ত আইন-কানুন সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান থাকা দরকার।
বিশেষ করে মহিবুল হক (বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) তিনি শিক্ষা সচিব ও ভূমি সচিবের কাছে এ বিষয়ে একটি চিঠি দেন। এতে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে ভূমিসংক্রান্ত আইন-কানুন ও নিয়মাবলী অন্তর্ভুক্ত করার গুরুত্ব দেন বেশি।
প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় ভূমির বিষয়টি অত্যাবশকীয় বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি নাগরিক জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ভূমির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকেন। ভূমি কেনা-বেচা, মালিকানা অর্জন, আদালতের মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ভূমি রেকর্ডের বিষয়ে প্রতিনিয়ত প্রতিটি নাগরিকের ভূমিসংক্রান্ত অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। তাই এ বিষয়ে প্রত্যেকেরই প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকা জরুরী।
পাঠ্যপুস্তকে ভূমি আইন ও নিয়মকানুন অন্তর্ভুক্ত হলে বাংলাদেশে বিদ্যমান ও কার্যকরী আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে সচেতন করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে ভূমি বিষয়ক হয়রানি থেকে দেশবাসীও রক্ষা পাবে।
দেশের সব মানুষই ভূমির উপর কম-বেশি নির্ভরশীল। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জটিল। সীমিত সম্পদের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ, সম্পদের অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে ভূমি ব্যবহার নীতিমালার সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি। ভূমি রেজিস্ট্রেশন, সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা এবং এ সম্পর্কিত গ্রহণযোগ্য রেকর্ড প্রণয়নে নিয়োজিত বিভাগসমূহের কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে জনমনে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব রয়েছে। ভূমি সম্পর্কিত বিরোধ নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তা ইত্যাদি ভূমি ব্যবস্থাপনাকে দিনে দিনে জটিল করে তুলছে।
অথচ ভূমির সঙ্গে দেশের অধিকাংশ মানুষ সম্পৃক্ত। আর এ সম্পর্কে প্রায় একশ’ ৪০টি আইন আছে। কিন্তু মানুষকে এগুলো সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে কোনো প্রয়াস দেখা যায় না।
সারাদেশে সব মিলিয়ে ১১০টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি পাবলিক ও ৮৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। এসব বিদ্যাপীঠে কলা অনুষদ, সমাজ-বিজ্ঞান অনুষদ, ব্যবসায়িক অনুষদ, আইন অনুষদ ও বিজ্ঞান অনুষদসহ অনেক অনুষদ রয়েছে। তবে ভূমির অপরিহার্যতা থাকলেও স্বাধীনতাপরবর্তী ৪৪ বছরে এ নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি কোনো সরকারই।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করছেন এমন ব্যক্তিও খাজনা খারিজ, মিউটেশন, নামজারি ও জমাভাগের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে বেড়ান। অথচ বাস্তবে এ চারটি বিষয়ের মধ্যে কোনো ভিন্নতা নেই। একই বিষয় ঘুরিয়ে ভিন্ন নামে বলা হয়। তাই অনেক সময় ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা একই বিষয়ে কাজ করে দেয়ার নামে তিন-চার দফায় উৎকোচও নিয়ে থাকেন। কারও নামে জমি রেকর্ড থাকলে তার আর নামজারি করার প্রয়োজন নেই। অথচ অনেকে রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও নামজারি করতে আসেন। শুধু সাধারণ বিষয় না জানার কারণে অহেতুক হয়রানি হয়ে থাকেন। বহু উচ্চ শিক্ষিত লোকজন মৌজা, দাগ-খতিয়ান, মাঠ পর্চার বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে কিছু জানেন না। বলতে পারেন না ভূমি জরিপ কিভাবে হয় এবং কখন কোন্ পর্যায়ে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। ৩০ ধারা, ৩১ ধারায় কী হয়, কোন্ পর্যায়ে কোথায় আপিল করতে হয় প্রভৃতি। বহু ফৌজদারি মামলার পেছনে ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ জড়িত। এছাড়া জমাজমির মামলাও বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকে। তাই ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে প্রতিটি নাগরিকের শিক্ষাজীবনে এ বিষয়ে প্রয়োজন জ্ঞান আহরণ করা জরুরি।
জমি নিয়ে লাখো লাখো মামলার এদেশে ভূমির গুরুত্ব ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রতিটি নাগরিকের ভূমিবিষয়ক মৌলিক জ্ঞান থাকা জরুরী। প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ে ভূমিসংক্রান্ত মৌলিক জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করা হলে জনসচেতনতা বাড়বে। পাশাপাশি ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা ও মামলা-মোকদ্দমাও কমে যাবে।
লেখক:নাঈম ইসলাম


এ সম্পর্কিত আরো খবর

মতামত এর অন্যান্য খবরসমূহ