একাত্তরের মার্চে কুমিল্লায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত: ড. জি. এম. মনিরুজ্জামান - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

একাত্তরের মার্চে কুমিল্লায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত: ড. জি. এম. মনিরুজ্জামান



(খবর তরঙ্গ ডটকম)

১৯৪৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যে ব্যক্তিটি পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হতে হবে ‘বাংলা’ এমন দাবি প্রথম করেছিলেন, তিনি আর কেউই নন, কুমিল্লা জেলার বিশাল ব্যক্তিত্ব শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮৬Ñ১৯৭১)। তিনি চেয়েছিলেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র; যেখানে বাঙালিরা মাথা উচুঁ করে দাঁড়াবে, সেখানে রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা, আইন-কানুন সব হবে বাংলায়, সিভিল সার্ভিস পরীা হবে বাংলায়, টাকা হবে বাংলায়, স্ট্যাম্প হবে বাংলায়, পার্লামেন্টে বক্তৃতা হবে বাংলায় এবং তার সবকিছুই সম্ভব হয়েছে। এটাই তাঁর জীবনের সার্থকতা।

নির্লোভ, নির্ভীক, সাহসী, স্পষ্টবাদী, অসাম্প্রদায়িক, রাজনীতিবিদ, নিখাঁদ দেশপ্রেমিক সমাজসেবী শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম উপকরণ ভাষার স্বাধীনতা আন্দোলনে পুরোপুরি সফল হয়েছিলেন তাই নয়, তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তির সংগ্রাম তথা স্বাধীনতার সংগ্রামে মার্চ মাসে কুমিল্লা থেকেই বলা যায় দুর্বার সোচ্চার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৫৮ সালে যখন মার্শাল ’ল হয় তখন তিরি যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী ছিলেন। মার্শাল ’ল-এর পরে তিনি ঢাকা ছেড়ে কুমিল্লায় এসে বসবাস করেন।

১৯৭১ সালে অন্য সব ব্যক্তি বা নিজ ধর্মের এমনকি পরিবারের সাথেও ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাশ্ববর্তী দেশ বা অন্য কোথাও পালিয়ে যেতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা না করে স্বেচ্ছায় দেশের জন্য নিজের জীবনটাই দান করেছিলেন। একদিকে তিনি যেমন ছিলেন বিশাল পলিটিশিয়ান, পার্লামেন্টারিয়ান, অসম্ভব তীক্ষ্ম মেধাসম্পন্ন ব্যক্তি, অন্যদিকে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহজ সরল একদম শিশুর মতো ব্যক্তি। তাঁর বাড়িতে সার্বণিক একটি রাজনৈতিক আবহাওয়া এবং রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজমান ছিলো।

১৯৬১ সালে দেশের পরিস্থিতি খারাপ হয়ে আসলে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর বড় ছেলে সাংবাদিক সঞ্জীব দত্তের স্ত্রী আর ছেলেমেয়ের দায়িত্ব নিয়ে তাঁকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন। এই ব্যক্তিটির বাড়িতে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, প্রভাষ লাহিড়ি, ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, তাজউদ্দিন আহমেদ, ড. কামাল হোসেন প্রমুখ বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিগণ আসতেন এবং তাঁরা নানা রকম সমস্যা নিয়ে নিত্যনৈমিত্তিক আলোচনা করতেন।

১৯৬৯-৭০ সালে এ জাতীয় ব্যক্তিবর্গ প্রায়ই তাঁর বাড়িতে মাঝরাতে আসতেন এবং বৈঠক শেষ করে ভোর হওয়ার আগেই আগন্তুকগণ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেন। দেখা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন জেলমুক্ত থাকতেন তখন তিনি প্রায়ই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িতে আশীর্বাদ নিতে আসতেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকেও বিভিন্ন আন্দোলনে প্রত্য বা পরো ভাবে অংশগ্রহণ করায় কিছুদিন পরপর জেলখানায় আটক থাকতে হতো। তাঁর বাড়ির সামনে সারাণ ১৪/১৫ জন পুলিশ বসে থাকতো এবং বাইরের কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হতো না। বাড়ির কোনো সদস্যকে পাসপোর্ট করতে দেওয়া হয় না, এমন কি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পাসপোর্টটিও সিজ করে নেওয়া হয়। অথচ এই মানুষটিই সারাজীবন ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন হতে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত গভীর ভাবে জড়িত ছিলেন।

১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। ঢাকাতে ছাত্র বিােভে পুলিশ, ইপিআর বা আর্মি ছাত্রদেরকে গ্রেফতার এবং মারতে থাকে। পুরো ঢাকা শহর উত্তাল হয়ে ওঠে। কেউ বুঝতে পারছিলো না যে কী হবে বা কী হতে যাচ্ছে। এসময় ভয়েস অব আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (এবিসি), বিবিসি, আকাশবাণী, পাকিস্তান রেডিও-টেলিভিশন মিডিয়াগুলো সংবাদ কাভারেজ দিতো। তবে পাকিস্তান রেডিও-টেলিভিশন সঠিক খবর জানাতে গাফিলতি করতো। তখন চরম অস্থিরতা। ভুট্টো-ইয়াহিয়া আলোচনা চললেও কোথাও গিয়ে তা ব্যর্থ হতো। ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই ঢাকার মতো কুমিল্লাতেও অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারি মাসের ঢাকায় প্রত্যেকটি রাতে বড় আকারের বিশেষ এক ধরনের প্লেন লাল লাইট জ্বালিয়ে মুভ করতো।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর নাতনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া রোকেয়া হলের ছাত্রী আরমা দত্তের নিকট হতে এ ধরনের খবর পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন।  এরই মাঝে ৭ মার্চ বেলা ৩ টায় ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের তারিখ নির্ধারিত হওয়ায় ৬ মার্চ সন্ধ্যা থেকে কার্ফু দেওয়া হয়। কুমিল্লা থেকে তখন সেই ভাষণ শুনতে কাঁচপুর, মেঘনা ও দাউদকান্দি ফেরি পার হয়ে ট্রাকে করে মানুষ ঢাকামুখি হতে থাকে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ৭ মার্চ দুপুর ৩ টায় নিজ বাড়ির বারান্দায় পায়চারি করতে থাকেন। তিনি ধারণা করছিলেন যে, আজকের থেকে বাংলাদেশের সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।

পারিবারিক ভাবেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাঁচতে হলে একসাথে বাঁচব, মরতে হলে সবাই একসাথে মরব––এই মতে স্থির ছিলেন। রেডিওতে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিখ্যাত ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার শুরু হয়, তখন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের চোখ থেকে জল পড়তে থাকে এবং তিনি বঙ্গবন্ধুকে ‘বাপের ব্যাটা’ বলে সম্বোধন করে ওঠেন। কিন্তু পরণেই রেডিও ভাষণ প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। অবশ্য পরের দিন ৮ মার্চ সেই ঐতিহাসিক ভাষণ পুনঃপ্রচার হয়ে থাকে, “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। এই ভাষণ শুনেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এতোটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন যে পরিবারের সবারই উদ্দেশে তিনি যেমনটা বলেছিলেন ও করেছিলেন, এখন আর চিন্তা নেই।

বাংলাদেশের পতাকা রাস্তায় রাস্তায় বিক্রি শুরু হয়ে গেছে। তিনি বাইরে এসে ছোট পুত্র দিলীপ দত্তকে একটা পতাকা আর বাঁশ আনতে নির্দেশ দিলেন। কুমিল্লাার কান্দিরপাড় হতে পতাকা আর বাঁশ আনা হলে পতাকাটি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নিজের হাতে বাঁশের গায়ে লাগালেন এবং বললেন, “স্বাধীনতার এই পতাকা আমি নিজের হাতে উড়িয়ে দিয়ে গেলাম। আমার রক্তের ওপরেই এই দেশ স্বাধীন হবে। আমি হয়তো তখন থাকবো না। যোগ্য লোকের কাছে নেতৃত্ব গেছে, বাংলাদেশের জন্ম হবে, এদেশের বাঙালিরা স্বাধীন হবে। তবে রক্তয় প্রচুর হবে।” তিনি আরো বলেন যে, “শাহনেওয়াজ ভুট্টোর ছেলে জুলফিকার আলী ভুট্টো কী গরীবের হাতে দেশ দিয়ে দিতে পারে? সে তো জোতদারের ছেলে। সে তো কৃষকের হাতে দেবে না অধিকার। এটা কী তারা বোঝে নাই কেউ?”

২৫ মার্চ সন্ধ্যায় পূর্ব পাকিস্তান হতে ইয়াহিয়া খান চলে যাওয়ার পর কুমিল্লার অবস্থার অবনতি ক্রমে চরম পর্যায়ে যেতে থাকে। চারিদিকে থমথমে ভাব। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এক বন্ধু হাবিবুর রহমান ২৫ মার্চ সকালে কুমিল্লার সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নিকট স্থানাভিষিক্তের কথা জানতে চাইলে তিনি তাঁকেও স্পষ্ট ভাষায় জানান, “এখানে থাকবো না কেন? আমি তো এখানেই থাকবো। আমি তো এখানে থাকার জন্যই আছি।” জনাব রহমান কয়েকটা দিন তাঁর বাড়িতে অবস্থান নেওয়ার কথা জানালেও ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জানিয়ে দিলেন যে, তিনি কারো বাড়িতে থাকবেন না। রাতে তিনি পরিবারের সবাইকে বললেন, “দেশে রক্তøান হবে। অনেক লোকের রক্ত। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের রক্তও ঝরবে। কে যায়? কাওয়ার্ডরা যায়।” তাঁর নাতনিও তাঁকে অন্যত্র চলে যেতে যথেষ্ট চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ২৫ মার্চ রাতে পরিস্থিতি থমথমে হয়ে গেলো। সবাই আতঙ্কে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত অন্যদিনের থেকে আজ একটু আগেই বিভিন্ন নিউজ শুনে রাত সাড়ে দশটার পর শুয়ে পড়েন।

২৬ মার্চ সকালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পরিবারের প থেকে কারো সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো ভাবেই তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বিশেষ কথা হলো, তখন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সামনে দিয়ে আর্মি ট্যাংক ও ট্রাকজীপ বেশি রাউন্ড দিতে থাকে। ২৭ মার্চ বহু চেষ্টায় রেডিওতে হঠাৎ করেই দুপুরের পরে তিনি একটি ভয়েস শুনতে পান। ইংরেজি ভাষায় কণ্ঠটি মেজর জিয়াউর রহমানের। এই কণ্ঠস্বর কখনো স্পষ্ট আবার কখনো বা ধূরে সরে যাচ্ছিলো। মেজর জিয়া শেখ মুজিবুর রহমানের প থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে সকলকে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য বলেন এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্তরা গ্রান্ডিক পাওয়ারফুল রেডিও থেকে এই সম্প্রচার শুনেছিলেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর পরিবারের সবার নিকট জানান, এই ঘোষণাই স্বাধীনতার ঘোষণা হয়ে গছে। তিনি আরো জানান, বেঙ্গল রেজিমেন্ট পূর্ববঙ্গের পে আছে এবং তারা বিদ্রোহ করছে। যারা অস্ত্র চালাতে জানে তাদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের পে আছে। মানুষের হাতে এখন অস্ত্র উঠে যাবে। এবং দেশ স্বাধীন হবেই।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এক নিকটাত্মীয় থাকতেন কুমিল্লার তালপুকুরে, নাম বুদ্ধ সিংহ। বুদ্ধ সিংহের বাড়িতে অনেক লোক আশ্রয় নিয়েছে এবং ঘরে চাল নেই, তাঁর ছেলেরা এ বাড়িতে এসে জানাতেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এক বস্তা চাল দিয়ে দেন। এমনি ভাবে পারিবারিক বন্ধু সুধা সেনের স্ত্রী ও অন্যান্যরা এ বাড়িতে ছুটতে ছুটতে এসে এ বাড়ির সবাইকে সাথে নিয়ে গোমতী নদী পার হয়ে ইন্ডিয়াতে যেতে চান। কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর পরিবারের সবাইকে চলে যেতে বলে নিজে বাড়িতে থাকতে ইচ্ছা পোষণ করেন।

ঠিক একই সময়ে কুমিল্লা শহরে রটে যায় যে, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তক পাক আর্মিরা হত্যা করেছে। কিন্তু তিনি তখনো জীবিত ছিলেন। ২৬ মার্চ কুমিল্লায় বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। যেমন সে সময়ের নামকরা উকিল যতীন ভদ্র ও তাঁর দুই পুত্র। কান্দিরপাড়ের বেশ কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীকে পাক আর্মিরা মেরে চৌমুহুনীর রাস্তায় ফেলে যায়।

২৯-৩০ মার্চ রাত দুইটার দিকে ভীষণ জোরে দরজায় ধাক্কা ও বুটের লাথি পড়তে থাকে। চারিদিকে ভীষণ আওয়াজ। ৭/৮ মিনিট পরেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ছোট ছেলে দরজা খুলতেই ১০/১২ জন পাকিস্তানি আর্মি ঘরে ঢুকে পড়ে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িটায় প্রথমে কাছারি ঘরের পরেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঘর। পরিবারের সকল সদস্যদের প্রতি তখন একদিকে আর্মিরা অপারেশন চালাতে থাকে, অন্যদিকে আর্মিরা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর ছেলে দিলীপ দত্তকে গাড়িতে উঠিয়ে নেয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বসার ঘরের মেঝে তখন কাঁচে ভরপুর। তাঁর বসার ঘরে তখন বড় আকারের দুইটি ছবি ছিলো, একটি গান্ধীজীর এবং অন্যটি জিন্নাহর। গান্ধীজীর ছবিটা তারা ভেঙ্গে তছনছ করে ফেলে এবং জিন্নাহর ছবিটি তারা সাথে নিয়ে যায়। ঘরের মধ্যে মেঝেতে রক্তে ভরা। বারান্দায় অনেক রক্ত।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাসার পাশেই সিএন্ডবি কোয়ার্টারে বাস করতেন রহমান সাহেব। তিনি ভোর বেলা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির পেছনের দেওয়াল টপকে ভিতরে ঢুকে পরিবারটিকে জানান যে, তারা ওপরের থেকে দেখেছেন একজনকে লাশের মতো করে আর্মিরা নিয়ে গেছে। আর অন্য একটি জীপে দিলীপ দত্তকে নিয়ে গেছে। অন্ধকারে তখন ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিলো না। রহমান সাহেব গাড়ির হেড লাইটের আলোয় গত রাতে এটুকু আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। তিনি আরো জানালেন, এ বাড়িতে কাউকে আর অবস্থান করা ঠিক হবে না। এ বাড়িটি আর্মিদের নিকট পয়েন্ট আউট হয়ে গেছে। তবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একজন রাজনৈতিক নেতা হওয়ায় বাড়ির অন্য কারো গায়ে তারা হাত দেয়নি বলে ধারণা করা যায়। দ্বিতীয়বার আর্মিরা আসলে তারা আর কোনো বাঁধা না মেনে সবাইকে হত্যা বা তি করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সকলকেই এই বাড়ি থেকে বের হতে হয়। এ বাড়ি থেকে তাঁর নাতনি যেসব দ্রব্যাদি সংগ্রহ করে সাথে নেন তার মধ্যে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের একটি ছোট অ্যাটাচিকেস, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অটোবায়োগ্রাফি লেখার খাতা, চশমা, কলম; দিলীপ দত্তের পছন্দের একটি যীশু খ্রিস্টের ছবি; ঘরে সংরতি সিন্দুকে টাকা।

উল্লেখ্য, তখন কিছু সময়ের জন্য কার্ফু ছাড়লে রহমান সাহেবের সহযোগিতায় আরমা দত্তকে পরিবারের সাথে ইন্ডিয়াতে পালাতে একটা শাড়ির নিচে ছিঁড়ে খারাপ বানিয়ে বোরখা পরে খালি পায়ে বের হতে হয়। শুকনো গোমতী নদী পার হয়ে রিক্সাযোগে ভারতের সীমানায় তাঁরা পৌঁছে যায়। সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছতে পথে পরিবারটিকে দেখতে হয় বাঙালিদের উপর পাক আর্মিদের বীভৎস অত্যাচার চিত্র। সোনামুড়া সীমান্তের বিএসএফ-কে কুমিল্লা থেকে আগত ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পরিবার বলে পরিচয় দেওয়ায় সীমান্ত রীরা তাঁদেরকে সম্মানের সাথে পৌঁছে দেয়। ভারতে পৌঁছে পুরো পরিবারটি সেখানকার সবার সঙ্গে মিলে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে থাকেন। ১ এপ্রিল ইন্ডিয়ার খবর হতে জানা যায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে পাকিস্তানিরা মেরে ফেলেছে এবং দিলীপ দত্তের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভারতের লোকসভায় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীনের পর শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পরিবার কুমিল্লায় ফিরে এসে বাড়িটিকে সম্পূর্ণ শূন্য অবস্থায় পান।

অত্যন্ত প্রচারবিমুখ এই ব্যক্তিটি বাঙালির প্রধান দুই দুইটি আন্দোলনে নিষ্ঠা, কর্তব্য এবং বিশ্বাস থেকেই অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন। সেকালের স্থানীয় মানুষের মুখ থেকে বা প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য থেকেই শুধু নয়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পারিবারিক সূত্র থেকেও এমনটা জানা যায়। খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা, পোষাকাদি সবকিছুতেই তিনি সাধারণ মানুষের মতো থাকতেন। মানুষের মাঝে তিনি কোনো জাতভেদ বিশ্বাস করতেন না এবং পারিবারিক ভাবেও তিনি কখনোই এ জাতীয় বিষয়কে প্রশ্রয় দেননি। পুরোপুরি সেক্যুলার প্রগ্রেসিভ এবং হিউম্যানিস্ট এই ব্যক্তির উদ্দেশ্য ছিলো, তাঁর জীবনবিধি জেনে সাধারণ মানুষেরাও যেন তাঁর সাথে অতি সহজেই মিশতে পারে এবং সেভাবে জীবন-যাপন করতে পারে। প্রত্যেক মানুষের প্রতি তাঁর ছিলো পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আইনজীবী এই ব্যক্তিটির দৃষ্টিতে এটাই ছিলো জীবনের প্রকৃত অর্থ।

(সূত্র : সাাৎকার, আরমা দত্ত, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ নারী, দ্বিতীয় খ-; মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র, ঢাকা, মার্চ ২০০৭।)

ড. জি. এম. মনিরুজ্জামান
বাংলা বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা।
ফোন: (+৮৮) ০১৯১৭-০৭৭৪০১

E-mail: kzlbd@yahoo.com


বাংলাদেশ এর অন্যান্য খবরসমূহ
সম্পাদকীয় এর অন্যান্য খবরসমূহ