আমি এবং I LOVE YOU ভাইরাস - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

আমি এবং I LOVE YOU ভাইরাস



নিউজ ডেস্ক, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

২০০০ সালের ৫ ই মে I LOVE YOU ভাইরাস দ্বারা লক্ষাধিক কম্পিউটার আক্রান্ত হয় যা কিনা একটা টেক্সট মেসেজ-এ লাভ লেটার হিসেবে মেইল আকারে এসে কম্পিউটার কে আক্রান্ত করতো। অনেক পণ্ডিত, এমনকি আমি মনে করতাম যে কম্পিউটার এর সামনে I LOVE YOU বললেই ভাইরাস এসে কম্পিউটার এ হানা দিবে অথবা ঘুমন্ত ভাইরাস জেগে উঠবে। খবরটা বহুত মান্ধাতার আমলের। আমার বয়স তখন মাত্র ৯ বছর। কিন্তু ঘটনা ২০০৬ সালের। অনেকটাই বুঝতে শিখেছি। কিন্তু কম্পিউটার সম্পর্কে মেধা তখন ০০ এর মাথায়। আর ভাইরাস বলতে বুঝতাম যে একধরনের পোকা যেটা কম্পিউটার এর ভিতর ঢুকলে কম্পিউটার মারা যায়। ( খবরদার, কেও হাসবেন না ); কিন্তু আমি যখন আমার বন্ধুদের বলতাম জানিস, ভাইরাস কি? ওরা জানতো না। আর আমার কথা শুনে আমাকে বস বস বলে ডাকতো। সেই সুবাদে ছোটবেলাতেই “হাতুড়ে কম্পিউটার জ্ঞানী” নামক উপাধি পেয়েছিলাম এলাকার হালকা পাতলা CSE পড়ুয়া ভাইদের কাছ থেকে।

২য় সাময়িক পরিক্ষার পর এক সন্ধ্যাতে খবর পেলাম যে আমাদের মামাতো ভাইয়েরা ৫০ হাজার টাকা দিয়ে একটা কম্পিউটার কিনেছে। শুনে আমার তো আর ঘুম নাই। বাপের কাছে ঘ্যান ঘ্যান। আব্বা কম্পিউটার দেখুম। আমারে নিয়া যাও। আমার ভাইদের বাসা ছিল সুদূর নারাঙ্গঞ্জ। বাবা স্বভাবতই আপত্তি করলেও আমার চাপাচাপিতে ওইখানে নিতে এবং ৪ দিন ওইখানে অবস্থান করার অনুমতি দিল। পরদিন সকালে রওয়ানা দিয়ে দুপুরে গিয়ে উঠলাম। গিয়ে দেখি সব সাদা। মনিটর ও সাদা। কিন্তু কালারফুল। আমি আর আমার ভাই তো নেমে পড়লাম গেমস খেলতে। ভার্চুয়াল কোপ ( কোপ না Cop ঠিক মনে আসচে না 😀 ) এর জগতে সারাদিন আমি আর আমার ভাই বিচরন করলাম। তারপর আমি একটু বাথরুমে লম্বা সময় বের করে আসার পর দেখি আমার ভাই কম্পিউটার বন্ধ করে দিয়েছে। আমি তাকে আবার চালু করার অনুরধ করলে সে বলল যে একটানা ৩ ঘন্টার বেশি চালু রাখলে নাকি কম্পিউটার এ সমস্যা করে। আমার ভাই অবশ্য বেশ ভালই জানতো কম্পিউটার সম্পর্কে, তাই আমি এককথায় মেনে নিলাম।

এইবার একটু ইংলিশ মুভির মত রোলব্যাক করি। আমার আব্বা কম্পিউটার না বুঝলেও প্রথম আলোর টেকনোলোজি পাতার কল্যাণে I LOVE YOU ভাইরাস সম্পর্কে ওয়াকবিহাল ছিলেন। বাসে নারাঙ্গঞ্জ যাবার সময় আমাকে তিনি এ ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন, বাবা যাই কর না কর, ভাইরাস ফাইরাস দিও না। আর ভুলেও কম্পিউটার এর সামনে উল্টা পাল্টা কিছু বলবা না। আর I LOVE YOU কথাটা কম্পিউটার এর সামনে বলা আমার জন্য কঠোরভাবে নিষেধ করে দিলেন। আমি সুবোধ বালকের মত মাথা নাড়লাম।

আসেন এইবার কাহিনিতে ফিরে যাই। গেমস খেলা শেষ করার পর ওই রাত্রে আমি ও আমার ভাই ভয়ংকর একটা অপারেশন এর সিদ্ধান্ত নিলাম। সেটা হচ্ছে ঠিক রাত ১২:০১ মিনিটে আমরা কম্পিউটার এর সামনে I LOVE YOU বলবো। দেখব কি হয় আসলে। যেই কথা সেই কাজ। রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে, আমরা চুপে চুপে রুমে গেলাম ও আমি খালি I LOVE YOU বললাম। ও চুপ থাকলো। কিছুই হল না। আমি আরও কয়েকবার বললাম। এইবার ও কিছু হলনা। ফিরে এসে আমরা হাসতে লাগলাম আর বলতে লাগলাম শালা আবুল। কিন্তু কে যে আবুল সেটা সকালে টের পেলাম।

সকালে যথারীতি আমার মামা ( উনি এখন দুনিয়াতে নাই, আল্লাহ উনাকে জান্নাতবাসী করুন, আমিন ) এসে কম্পিউটার ছাড়লেন। ছেড়ে দেখলেন যে সম্পূর্ণ মনিটর উল্টা দেখাচ্ছে। উনি তো সাংঘাতিক ভয় পেলেন। বারকয়েক কম্পিউটার অফ অন করা হল কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। শেষে বিকালে বাসায় একজন কম্পিউটার মেকানিক ডেকে আনলেন। আমরা তো ভয়ে চুপ। আর নফল নামাজ পড়া শুরু করে দিয়েছি।

বিকালে যথারীতি মেকানিক এসে বললেন আপনারা কি কেও কম্পিউটার এর সামনে কিছু বলেছে। সাথে সাথে আমার ভাই বলল ” তানভীর রাত ১২.০১ এ I LOVE YOU বলেছে, কিন্তু ও ইচ্ছা করে বলেনি ভুলে বলেছে “; ব্যাস, আর পায় কে, দুইটা চটকানা আমার উপর, তিনটা আমার ভাই এর উপর। আমরা দিলাম কান্না করে। মেকানিক বলল তারাতারি ঠিক না করলে সমস্যা হবে এবং এটা চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে। তাই মামা সেটা মেকানিকের দোকানে সাথে সাথে পাঠিয়ে দিলেন। আমার চলে যাবার দিনে কম্পিউটার ঠিক মত ফেরত আসলো এবং বিল আসলো ২০০০টাকা। আমার আব্বা আমাকে নিতে এসে ঘটনা শুনে আরও ২ টা চটকানা মারলেন। তারপর বিদাই পালা এবং আমার কম্পিউটার ভীতি শুরু।

২০০৮ সালে যখন ম্যাট্রিক পাস করলাম তখন আমি ও আমার ভাই আবার দেখা পেলাম। ২ বছর পর। সে আমাদের বাসায় আসলো। সে ততদিনে পুরদস্তুর কম্পিউটার জিনিয়াস। অনেকের বাসার কম্পিউটার সে ঠিক করে দেয়। সে আমাকে বলল যে ওইদিন আমি যখন বাথরুমে যাই, সে পত্রিকায় একটা লেখা দেখে কম্পিউটার এর ওয়ালপেপার পরিবর্তন করতে গিয়ে উল্টাপাল্টা করে মনিটর উল্টা করে ফেলে। তারপর ভয়ে সে দিশেহারা হয়ে যায় ও আমাকে বোকা বানাবার প্ল্যান করে আমাকে ফাসিয়ে দেয়। কিন্তু আমাকে থাপ্পড় খেতে দেখে সে আর সহ্য করতে পারেনি। কিন্তু ভয়ে আসল কথা বলেও নি যে ওই আমাকে এই আকামের বুদ্ধিটা দিয়েছিল। কিন্তু সে এখন বুঝতে পেরেছে সে ভাল করেনি। তাই সে কম্পিউটার সম্পর্কে সঠিকভাবে জানার চেষ্টা থেকেই এখন অনেক কিছু জানতে পেরেছে। আর আগের মত ভয় লাগেনা তার। সে আমাকে জড়িয়ে ধয়ে কান্না করে দিল। এক মুহূর্তের ব্যাবধানে যেন আবার সেই ভাইটিকে আমি ফিরে পেলাম।

২০১০ সালের শেষের দিকে আমি কম্পিউটার সম্পর্কে ভালভাবে জানতে থাকি। সবটাই আমার ভাই এর মেসের থেকে তার সেই বিখ্যাত I LOVE YOU কম্পিউটার চালিয়ে। কেননা ওই ঘটনার পর আব্বা আমাকে কম্পিউটার কিনে না দিতে ১৪৪ ধারা জারি করেছিল। তখন আমরা বুঝি যে সেই মেকানিক আমাদের বোকা বানিয়ে খালি সেটিংস চেঞ্জ করেই ১০ মিনিটে ২০০০টাকা কামিয়ে নিয়েছিল। 😀

এখন আমার ভাই সুদূর কানাডায় কম্পিউটার ইঙ্গিনিয়ারিং পড়ছে। আর ওডেস্ক এ সুনামের সাথে টিম লিডার হিসেবে গ্রাফিক্স ডিজাইন এর কাজ করছে। আর আমি এখন ও শিখেই যাচ্ছি। তবে ভয় কিন্তু এখন ও পাই। যদি আবার I LOVE YOU ফিরে আসে। তাই ২০১১ সালে কম্পিউটার কিনার পর থেকেই Norton এর সাথে আছি। এবং বলতে পারি আর যাই থাকি, নরটন এর দোয়ায় ভয়মুক্ত আছি।