তুরস্কের অর্থনীতি ভয়াবহ সঙ্কটে - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :
ট্রাম্প-এরদোগানের বিবাদে

তুরস্কের অর্থনীতি ভয়াবহ সঙ্কটে



অনলাইন ডেস্ক, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

বিশ্বের ব্যস্ততম মুক্ত বাণিজ্যের এই সময়ে ইস্তাম্বুলের কাদিকোই জেলার বাজারে রবিবার অর্ধেকেরও কম জনসমাগম হয়েছে। গত দুই সপ্তাহের চাইতেও দোকানিরা তাদের পণ্যের ২৫ শতাংশ বেশি দাম বাড়িয়েছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে ডিমের প্যাকেটের উপর ৫০শতাংশ দাম বেড়েছে। ল্যাতিন আমেরিকা থেকে আমদানি করা কলার মূল্য দ্বিগুণ হয়েছে। আইনুর কেশকিন নামের একজন গৃহিনী যার বিদ্যালয় পড়ুয়া দুইজন সন্তান রয়েছে তিনি কিছু সামগ্রী কিনেছেন এবং এত বেশি মূল্যের কারণে তার মাথা ব্যথার কারণ হয়েছে। ‘আমি চিন্তা করেছিলাম বিদেশে অবসর কাটানোর জন্য ভ্রমণে যাব, কিন্তু এখন তা শুধু আমার স্বপ্ন হয়েই থাকবে।’-তিনি এমনটি বলেন।

মেসুট টাসকিরান নামের একজন মুদি দোকানি জানান, তিনি এখন থেকে টাকা জমানো শুরু করে দিয়েছেন এবং তার ব্যক্তিগত খরচ কমানো শুরু করেছেন। ‘যদি এই অবস্থা চলতে থাকে তবে আমাদেরকে হয়ত ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে।’-তিনি তার দোকানের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে এমনটি জানান।

কয়েক বছর ধরে তুরস্কের অর্থনীতি নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এরদোগান এবং ট্রাম্পের মধ্যে চলমান বিবাদের জের ধরে তুর্কি লিরার মান অত্যন্ত নিচু অবস্থানে রয়েছে এবং সোমবার তা ডলারের বিপরীতে ৭.২৪ শতাংশ মান হারিয়ে একটি রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল। তবে বুধবার লিরার মানের কিছুটা উন্নতি হয়েছে এর পরেও বিনিয়োগ কারী, ব্যবসায়ী নেতা এবং তুরস্কের সরকারী কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, অর্থনীতি আবারো ধ্বসে পড়তে পারে।

গত দশকে তুরস্কের আকর্ষণীয় অর্থনীতির কারণে দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগের বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু সম্প্রতি তুরস্ক এবং পশ্চিমাদের সাথে দেশটির কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং জুনের নির্বাচনে এরদোগানের সুলতানের মতোই ক্ষমতা লাভের ফলে অনেক বিনিয়োগকারীই তাদের বিনিয়োগ উঠিয়ে নিয়েছেন এবং এতে করে দেশটির অর্থনীতিতে একটি ধীর গতি এসে যায়।

এরদোগান এবং ট্রাম্প একে অপরকে জনসম্মুখেই বিদ্রুপাত্নক মন্তব্য করা শুরু করেন। মার্কিন ধর্মযাজক এন্ড্রু ব্রানসনের গ্রেপ্তারের(যাকে ২০১৬ সালে সরকার উৎখাতের এক ব্যর্থ সেনা উভ্যুত্থানে মদত দেয়ার অভিযোগে আটক করা হয়) জের ধরে দেশটির উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন ট্রাম্প। ব্রানসনকে হয়তো ৩৫ বছরের মত কারাদণ্ড দেয়া হতে পারে। তবে তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

২৫ জুলাইতে তুরস্ক ব্রানসনকে কারাগার থেকে গৃহবন্দি করে রাখার জন্য তার বাসভবনে পাঠায়। তবে তুরস্কের এ রকম উদ্যোগ ট্রাম্পের দৃষ্টিতে যথাপযুক্ত হয়নি। ট্রাম্প সে সময় এক টুইটে জানান, ‘যাজক ব্রানসনকে দীর্ঘ সময় ধরে আটক রাখা হলে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের উপর বৃহৎ আকারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে।’ এর এক সপ্তাহ পরেই তিনি তুরস্কের দুইজন মন্ত্রীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর পরের সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের ধাতু আমদানির ওপর দ্বিগুণ শুল্ক আরোপ করে।

এরদোগান বিদেশে নিয়োজিত তুর্কি কূটনৈতিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘বিশ্ব ব্যবস্থা যেভাবে অবহেলা এবং নির্লজ্বভাবে আমাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সমৃদ্ধি সম্পর্কে মন্তব্য করতেছে তা বেশীদিন এভাবে চলতে পারে না।’ মঙ্গলবার এরদোগান তুরস্কের ‍উপর ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে তুর্কি জনগণের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইলেক্ট্রনিক্স পন্য বয়কট এবং আইফোন কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

সম্প্রতি রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী তুরস্ক সফর করেন এবং তিনি তুরস্ক, রাশিয়া এবং ইরানের প্রতি ‘নিষেধাজ্ঞা, হুমকি এবং স্বৈরাচারী’ মনোভাবের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করেন।

টাইমের এক সাময়িকীতে এরদোগান লিখেন, ‘ওয়াশিংটনের উচিত আঙ্কারার উপর ভুল পদক্ষেপ থেকে সরে আশা না হয় আঙ্কারা দুই দেশের মিত্রতাকে পুনরর্বিবেচনা করতে বাধ্য হবে এবং আঙ্কারার বিকল্প মিত্র রয়েছে।’ তিনি রাশিয়ার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যাপারে ব্যর্থতার ফলে আমরা নতুন বন্ধু খুঁজে নিতে বাধ্য হবো।’

যাজক ব্রানসন তুরস্কে দুই দশকেরও বেশী সময় ধরে বসবাস করে আসছেন, তিনি মিসনারী কাজ করেন এবং তুরস্কের উপকূলীয় অঞ্চল ইজমীরে একটি চার্চ পরিচালনা করেন। তাকে সরকার উৎখাতে জড়িত মাস্টারমাইন্ড যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রিত ফেতুল্লাহ গুলেনের সাথে যোগাযোগ এবং কুর্দিস্থান ওয়ার্কার্স পার্টি(পিকেকে) এর সাথে যোগাযোগ রক্ষার দায়ে এরদোগান প্রশাসন আটক করে। এরদোগান বারবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ফেতুল্লাহ গুলেনকে তুরস্কের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানান তবে ট্রাম্প প্রশাসন এরদোগানের আহ্বান প্রত্যাখান করে বলে আসছে যে, ফেতুল্লাহ গুলেনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

ব্রানসনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- তুরস্কের দুইটি অপ্রকাশিত সাক্ষী যাদের সাংকেতিক নাম ‘আগুন’ এবং ‘প্রার্থনা’ দাবী করে যে, ব্রানসন পিকেকে দলের অনেক সদস্যকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করেছেন যাতে তারা কোনো পশ্চিমা দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে বসবাস করতে পারেন। তাকে ফেতুল্লা গুলেনের দলের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করতে দেখা গেছে এবং কানাডায় তার এক বন্ধুর কাছে সরকার উৎখাতের ব্যর্থতা নিয়ে অখুশি হয়ে ক্ষুদে বার্তা দিতে দেখা গেছে। ব্রানসনকে আরো দেখা গেছে দক্ষিণ তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ইসক্রিলিক বিমান ঘাঁটির সৈন্যদের সাথে বৈঠক করতে। তবে ব্রানসন এপ্রিলের ১৬ তারিখে আদালতকে বলেন যে, ‘আমি জিসুর কাজ করি’, ‘আমি তুরস্কের বিরুদ্ধে কখনো কোনো কাজ করিনি’, ‘আমি তুরস্ককে ভালোবাসি, আমি তুরস্কের জন্য গত ২৫ বছর ধরে প্রার্থনা করে আসছি।’ তিনি আরো জানান ‘আমিও চাই সত্য বেরিয়ে আসুক।’

ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ব্রানসনের এত গুরুত্ব দেখে তুরস্কের কর্মকর্তারা অবাক হয়েছেন। কারণ তুরস্কের কারাগারে সেরকান গোলগে নামের নাসার একজন বিজ্ঞানী আটক রয়েছেন যাকে নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন অতটা গুরুত্ব দেখায়নি।

প্রসঙ্গত, এরদোগান তার দেশের নাগরিকদের(তুর্কি লিরার সম্মান রক্ষায়) ব্যাংকে ডলার জমা দিয়ে লিরা নেওয়ার জন্য আহ্বান জানান। তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশী মুদ্রা বিক্রয়ের উপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। তুরস্কের কাড়িকোই শহরের বড় একটি বাজারের একটি ইলেকট্রনিক্স দোকানের ব্যবস্থাপক ৪৮ বছর বয়সী সেরহাত ইয়েলডিজ বলেন, ব্যবসা বাণিজ্য কমে যাওয়ার ফলে গত দুই বছরে এখানকার অন্তত ১৩৮টি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ‘সকল ব্যবসায়ীকে ক্রয় করে ডলারের বিনিময়ে এবং বিক্রি করতে হয় লিরার বিনিময়ে যার ফলে ব্যবসা করা বাধাগ্রস্ত হয়ে উঠে।’ তিনি আরো জানান, ‘অনেকেরই চাকরি হারানোর উপক্রম হয়েছে।’


এ সম্পর্কিত আরো খবর