ডেনমার্কের রাজনীতিতে মুসলিম বিরোধী মনোভাবের উত্থান - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

ডেনমার্কের রাজনীতিতে মুসলিম বিরোধী মনোভাবের উত্থান



অনলাইন ডেস্ক, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

কোপেনহেগেন: গত বছর ক্রিস্টিয়ান হ্যানসনের ১০ বছর বয়সী সন্তান বিদ্যালয় থেকে এসে রাসমুস প্লাউডান সম্পর্কে জানতে চায়।  ডেনমার্কের একটি সফ্টওয়্যার কোম্পানির মালিক ৪২ বছর বয়সী হ্যানসন বলেন, ‘আমার সন্তান আমাকে বলে যে, বিদ্যালয়ে তারা ‘প্লাউডান গেম’ খেলেছিল।

এর জন্য তারা খ্রিষ্টান, ইহুদি এবং মুসলিম শিক্ষার্থীদেরকে আলাদা আলাদা দলে বিভক্ত করে। খেলার নিয়ম অনুযায়ী খ্রিষ্টান শিক্ষার্থীগণ ইহুদি এবং মুসলিমদেরকে দৌড়িয়ে ধরতে হয় এবং একটি কাল্পনিক খাঁচার মধ্যে বন্দি করতে হয় এবং পরবর্তীতে তাদেরকে অপমান করা হয়।’

হ্যানসন ভয় পেয়েছেন যে, প্লাউডানের বার্তা হয়ত তার সন্তানের নিকট সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এসেছে।

তিনি বলেন, ‘এটি মারাত্মকভাবে ভয়ঙ্কর। কারণ প্লাউডানের ঘৃণামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিশুদের ভেতর প্রবেশ করেছে।’

২০১৭ সালে উগ্র ডান পন্থী ড্যানিশ রাজনীতিবিদ রাসমুস প্লাউডান ডেনমার্কে তার রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে পবিত্র কুরআন পোড়ানোর ঘোষণা দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেন।

প্লাউডান তার সমর্থকদের প্রতি ‘ড্যানিশ জাতীয়তায়’ বিশ্বাস করার আহ্বান জানান এবং তিনি তার দেশের ৩০০,০০০ লক্ষ্য মুসলিম কে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে এবং ইসলাম নিষিদ্ধ করতে চান একই সাথে তিনি গৃহ যুদ্ধ আসন্ন বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

ইতোমধ্যে প্লাউডানের রাজনৈতিক দল ‘Hard Line বা Stram Kurs’ চলতি বছরের জুন মাসের ৫ তারিখে ডেনমার্কের সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে এবং ভোটাভুটি তে অংশ নেয়ার জন্য অন্তত ২০,০০০ হাজার ভোট সংগ্রহ করেছে।

এদিকে ডেনমার্কে প্রধানমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন প্লাউডেনের পবিত্র কুরআন পোড়ানোর ঘোষণার তীব্র নিন্দা করেছেন এবং এর সমালোচনা করে তিনি টুইটারে লিখেছেন, ‘এটি একটি অর্থহীন কাজ যার একমাত্র উদ্দেশ্য বিভেদ তৈরী করা।’

প্লাউডান বলেন, ‘আমাদের রাজপথ সমূহ রক্তে রঞ্জিত হবে এবং বিদেশী শত্রুদের রক্ত সেখানে গিয়ে শেষ হবে যেখান থেকে তারা এসেছে।’
এক ভিডিও বার্তায় প্লাউডান আরো বলেন, ‘সবচেয়ে ভালো হয় যদি পৃথিবীতে আর কোনো মুসলিম না থাকে। আমি আশা করি একদিন এমনটি ঘটবে। তখন আমরা আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছবো।’

তবে প্লাউডানের জনপ্রিয়তা তার ইউটিউব চ্যানেল এবং স্নাপচ্যাট ব্যাবহার কারী তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহ সমূহে তার জনপ্রিয়তা কিছুটা বেড়েছে।

ডেনমার্কের ২৭ বছর বয়সী রাজনৈতিক বিশ্লেষক তারেক গানোউম বলেন, ‘২০০১ সালে ড্যানিশ পিপল’স পার্টির নেতা পিয়া কাজেরসাগার্ড যখন ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল তখন থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে কঠিন নিয়ম নীতি আরোপ করা হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘Hard Line এবং The New Right নামের দল দুটো গঠিত হয়েছে মুসলিমদের প্রতি আক্রমণ করার জন্য। জলবায়ু, অর্থনীতি, উন্নয়ন ইত্যাদি ভুলে তারা শুধুমাত্র সংখ্যালঘুদের পেছনে লেগেছে। তারা মুসলিম অভিবাসী এবং তাদের উত্তরাধিকারদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে।’

উগ্রপন্থী প্লাউডান এর আগে নোরেব্রো শহরে তার সমর্থকদের সামনে পবিত্র কুরআনের একটি কপি শূন্যে নিক্ষেপ করেন এবং এটিকে মাটিতে ফেলে দেন। একই সাথে এই কুলাঙ্গার ইসলাম ধর্মের পবিত্র তম ধর্ম গ্রন্থে আগুন লাগিয়ে দেয়। তার এমন ন্যক্কারজনক কাজের বিরুদ্ধে শহরটির কয়েক ডজন অধিবাসী বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল।

বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় গাড়ির টায়ারে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশের বাধার মুখে একজন বিক্ষোভকারী আহত হয় এবং ২৩ জন কে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ঘটনার পর প্লাউডানের খ্যাতি আরো বেশী করে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইতোমধ্যে প্লাউডান নির্বাচনে প্রতিদন্ধিতা করার জন্য উপযুক্ত সংখ্যক সমর্থন যোগাড় করতে সক্ষম হয়।

Roskilde University এর অধ্যাপক গ্রাভি সেমিডিট বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ২০০১ সালের পর থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে চালানো সকল নেতিবাচক প্রচারণা কে স্বাভাবিক ভাবে দেখা হচ্ছে। ইসলাম এসব নেতিবাচক প্রচারণার লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে এমনকি প্রধান রাজনৈতিক দল সমূহের মধ্যে এমন মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।’

সাম্প্রতিক বছর সমূহে ডেনমার্কের সকল আন্দোলন সমূহে দেশটির ডান পন্থী ড্যানিশ পিপল’স পার্টির প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করতে দেখা গেছে যার ফলে দেশটির ৫.৫ শতাংশ মুসলিম জনগণ ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ডেনমার্ক অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশ সমূহের সাথে তাল মিলিয়ে পুরো মুখমণ্ডল ঢেকে রাখে এমন পর্দা নিষিদ্ধ করেছে।

একই সাথে দেশটির সরকার অভিবাসীদের জন্য ফৌজদারি আইন আরো কঠোর করেছে এবং যেসমস্ত অঞ্চলে অভিবাসীরা বসবাস করে সেখানকার বিদ্যালয় সমূহের শিক্ষার্থীদের কে ড্যানিশ মূল্যবোধ শেখানো হচ্ছে।

গ্রাভি সেমিডিট বলেন, ‘বর্তমানে ড্যানিশ জনগণের মধ্যে বৃহৎ আকারে ডানপন্থী মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশীদের নিয়ে বিতর্ক করে রাজনীতিবিদ গণ সহজে জনপ্রিয়তা অর্জন করছেন। ফলে দেশের স্বাস্থ্য খাত, অসমতা, জনজীবনের উন্নয়ন ইত্যাদির বিষয় বাদ দিয়ে তার সহজ পথে হাঁটতে চাইছেন।’

সাম্প্রতিক এক জরীপ অনুযায়ী, প্লাউডেনর দল আইনসভার নির্বাচনে ৩.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে অন্তত ছয়টি আসনে জয়লাভ করতে পারে আর ‘The New Right’ নামের দলটি অন্তত পাঁচটি আসনে জয়লাভ করতে পারে।

সোফুস এন্ড্রাসন নামের ২০ বছর বয়সী প্লাউডেনর একজন সমর্থক বলেন, ‘সকল অভিবাসীরা খারাপ নয় কিন্তু তাদের সকলকে বহিষ্কার করা উচিত এমন নীতি কে আমি সমর্থন করি।’

অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বয়স্ক ইহুদি ধর্মাবলম্বী বলেন, ‘আমি অনেক বছর যাবত প্লাউডেনের সমর্থক। সে খুবই বুদ্ধিমান একজন তরুণ কিন্তু আমি এ ভয়ে ভীত যে, সে ধীরে ধীরে একজন উগ্রপন্থী হয়ে উঠছে। আর এভাবেই ফ্যাসিজমের শুরু হয়।’

সূত্র: আলজাজিরা ডট কম।


আন্তর্জাতিক এর অন্যান্য খবরসমূহ
ধর্ম এর অন্যান্য খবরসমূহ