ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে



অনলাইন ডেস্ক, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

এবার ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেশি। জ্বরের মাত্রা কম, দৃশ্যমান র‌্যাশ বা দাগ না হওয়া এমনকি শরীরে পর্যাপ্ত ব্যথা না হওয়ায় অনেকেই বুঝতে পারছেন না যে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কি না। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া অনেক রোগীর লক্ষণের সঙ্গে পূর্বের লক্ষণের মিল না থাকায় চিকিৎসকদের মধ্যেও সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে।

এবার সংক্রমণের হার যেমন বেশি মৃতের হারও বেশি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসলে এবার ডেঙ্গু পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তাই শরীরে জ্বর অনুভূত হলেই অবহেলা না করে হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের জনসংখ্যার ৫০ ভাগ সাধারণ ও মারাত্মক ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এখন বছরে মারাত্মক ডেঙ্গুজ্বরে কমপক্ষে ৫ লাখ মানুষ আক্রান্ত হন। প্রতি মিনিটেই বিশ্বের কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তাদের অধিকাংশই শিশু।

বছরে ২২ হাজার ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, গত জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৬ হাজার, মৃত্যু ৭৪ জন। একই সময়ে ফিলিপাইনে আক্রান্ত ৭২ হাজার, মৃত্যু ৩০৩ জন, সিঙ্গাপুরে আক্রান্ত ৩ হাজার ২৩৩ জন, ভিয়েতনামে আক্রান্ত ৬০ হাজার, মৃত্যু ৪ জন।

ভারতে আক্রান্ত ৬ হাজার ৮০৭, মৃত্যু ৭ জন, মিয়ানমারে আক্রান্ত ৪ হাজার, মৃত্যু ১৪ জন, থাইল্যান্ডে আক্রান্ত ২৬ হাজার, মৃত্যু ৪১ জন। ফিলিপাইনে ইতিমধ্যেই বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

এদিকে ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্যে দেখা যাচ্ছে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গত ১৭ দিনে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৮১ জন, মৃত্যু ৫ জন।

তবে মৃতের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত নয় সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া অধিদফতর থেকে শক সিনড্রোম বা হেমোরেজিক ফিবারে আক্রান্তের কোনো তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। কথা হয় বরেণ্য মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহর সঙ্গে।

তিনি বলেন, একজন রোগী দ্বিতীয়বারের মতো ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হলে তার ঝুঁকি এমনিতেই বেড়ে যায়। চলতি বছর ডেঙ্গু সেরোটাইপ-৩-এ সংক্রমণ হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে এবারের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। যে অবস্থানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এটি ডেঙ্গুর মোডিফায়েড ফর্ম। লক্ষণ আগের মতো নয়। তাপমাত্রাও তুলনামূলক কম থাকে ১০১-১০২ ডিগ্রি। হাড়ে বা শরীরের সংযোগস্থলে ব্যথাও হয় না। ফলে অনেকেই বুঝতে পারেন না। থেমে থেমে বৃষ্টিপাত দেশব্যাপী ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই প্রকোপ আগামী শীত পর্যন্ত চলতেই থাকবে। তাই যে কেউ শরীরে যে কোনো ধরনের জ্বর অনুভব করলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করবেন। যাতে করে অন্তত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় ডেঙ্গুর আক্রমণ হয়েছে কি না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার জানান, গত ১ জুনায়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ১৬৬ জন। এর মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৪ হাজার ৪৫ জন এবং ভর্তি আছেন ১ হাজার ১১৬ জন। গত ১৭ দিনেই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩ হাজার ৮১ জন। জুন মাসে এই সংখ্যা ছিল ১৭৬১ জন। মৃত ৫ রোগীর মধ্যে ২ দুজন এপ্রিলে, দুজন জুনে এবং একজন জুলাইয়ে। তবে এ সংখ্যা কেবল রাজধানীর ১২টি সরকারি এবং ৩৫টি বেসরকারি হাসপাতালে আসা ডেঙ্গু রোগীর। প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে গেছে।

তারা মনে করছেন, এবার ডেঙ্গু যেভাবে ছড়াচ্ছে তাতে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী গত বছর সর্বোচ্চ ১০ হাজার ১৮৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। তার মধ্যে ২৬ জন মারা যান। ২০০২ সালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ২৩২ জন। তবে চলতি জুলাই মাসের প্রথম ১৭ দিনের চিত্র দেখে মনে হচ্ছে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে শক সিনড্রোম বেশি, ফলে শরীরে পানির পরিমাণ হ্রাস পায়। তাপমাত্রার বৃদ্ধি ঘটে, হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ ক্রমশ হ্রাস পায়। এছাড়া ফুসফুস এবং পেটে পানি জমতে পারে, এমনকি জ্ঞান হারাতে পারে। হালকা জ্বর হলেও তা কমার পরে প্লাটিলেট ভাঙতে শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে রোগীর মৃত্যু হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ডেঙ্গু কোনো সেরোটাইপ দিয়ে হচ্ছে বা লক্ষণ পরিবর্তন হলো কিনা এটা বিষয় না। বরং ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ‘ন্যাশনাল ডেঙ্গু ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন’ অনুসরণ করা। কারণ সঠিক চিকিৎসা বা সেবা দিতে না পারলে এ রোগে মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে।

তারা বলেন, ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। জ্বর হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যে কোনো ভাইরাস জ্বরের সঙ্গে ডেঙ্গুজ্বর হতে পারে। এমনকি ডেঙ্গুর সঙ্গে টাইফয়েড, জন্ডিস, হেপাটাইটিসের মতো রোগ হতে পারে। তখন রোগীর চিকিৎসা করা বেশ জটিল হয়ে পড়ে। কারণ ডেঙ্গু রোগীকে এন্টিবায়োটিক দেয়া যায় না অথচ টাইফয়েড চিকিৎসায় এন্টিবায়োটিক অপরিহার্য। তাই চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালই শ্রেয়।

হাইকোর্টের অসন্তোষ-মশা মারার ওষুধ কেনায় দুর্নীতি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন : ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা নিধনে অকার্যকর ওষুধ আমদানি, সরবরাহ ও বিপণনে জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। কার্যকর ওষুধ আমদানি করে তা দ্রুত ছিটানোর ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

এ আদেশের অগ্রগতি প্রতিবেদন দুই সিটি কর্পোরেশনকে ২০ আগস্ট আদালতে উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে। বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ বুধবার এ আদেশ দেন।

শুনানিতে সিটি কর্পোরেশনের আইনজীবীকে উদ্দেশ করে আদালত তীব্র উষ্মা প্রকাশ করেন। আদালত বলেন, ডেঙ্গু মহামারী হতে আর বাকি নেই। মশার জন্য আমরা পদক্ষেপ নিতে বলেছিলাম, কিন্তু আপনারা নেননি। আমরা কথা বললে তো বলেন বড় বড় কথা বলছি। ডেঙ্গুতে ২২ জন মানুষ মারা গেছেন।

এরপরও সিটি কর্পোরেশন বলছে কিছুই না। মেয়র বলেন কিছুই হয়নি। কয়েক হাজার মানুষ অসুস্থ, আপনারা আচরণ পরিবর্তন করেন। আদালত বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলাম। তখন থেকে ব্যবস্থা নিলে আজ এমনটা হতো না। যার সন্তান মারা গেছেন সেই বোঝেন কষ্টটা কী। ছোট ছোট বাচ্চারা আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিদিন খবরে দেখছি, মানুষ মারা যাচ্ছে। এ সময় সিটি কর্পোরেশনের আইনজীবী নুরুন্নাহার নূপুর বলেন, এগুলো দেখলে-পড়লে খারাপ লাগে।

তখন আদালত বলেন, দুর্নীতিবাজদের খারাপ লাগে না। কারণ তাদের বাড়িঘর দেশের বাইরে করে। তাদের ছেলেমেয়েরা দেশের বইরে থাকে, ওইখানে পড়ালেখা করে। বিচারক বলেন, জরুরি ব্যবস্থা নেন। মশা মারার ওষুধে কাজ না করলে তার মানে কী অকার্যকর ওষুধ কেনা হয়েছে। ওখানে দুর্নীতি হয়েছে! দুর্নীতি হয়ে থাকলে কারা এর জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।

আদালতে দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রতিবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী নুরুন্নাহার নূপুর। রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবিএম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার।

আদেশের পর মনজিল মোরসেদ বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনের ব্যবস্থা অকার্যকর। ব্যবহৃত ওষুধগুলোর কোনো কার্যকারিতা নেই বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এরপরও সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। ওষুধ কেনার সঙ্গে ২০-২২ কোটি টাকার সংশ্লিষ্টতা আছে। দুর্নীতির মাধ্যমে এসব করা হচ্ছে। যারা এ কাজগুলো করছে তাদের বিরুদ্ধে সিটি কর্পোরেশন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- সিটি কর্পোরেশন বলছে নতুন ওষুধ এনে তা কার্যকরী করতে ৬ মাস লাগবে। জনগণের প্রয়োজনে টেন্ডার ও আইনকানুনের বাইরে দ্রুত ওষুধগুলো এনে ব্যবহার করার কথা বলেছি।

তিনি আরও বলেন, এরপর আদালত দুটি নির্দেশনা দিয়েছেন। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ২ জুলাইও উষ্মা প্রকাশ করেন হাইকোর্ট। সেদিন আদালত বলেন, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব অনেক বেড়ে গেছে। এমনকি অর্থমন্ত্রীও ডেঙ্গুর কারণে বাজেট উপস্থাপন করতে পারেননি।

এছাড়া আরও অনেক মন্ত্রী-এমপি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। বিচার বিভাগেরও অনেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। শত শত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। এটা তো মহামারী আকার ধারণ করছে! ঢাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দুই সিটি কর্পোরেশনকে নির্দেশ দেন আদালত।

একই সঙ্গে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে দুই সিটি কর্পোরেশন কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সেসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা কী সেসব বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের দুই মেয়র ও দুই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বাস্তবায়ন প্রতিবেদন দিতে আদালত নির্দেশ দেন। সেই প্রতিবেদন বুধবার আদালতে হাজির করা হয়।



এ সম্পর্কিত আরো খবর

আন্তর্জাতিক এর অন্যান্য খবরসমূহ