ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে লিলিয়াম ফুল চাষে চাষীদের আগ্রহ বেড়েছে - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে লিলিয়াম ফুল চাষে চাষীদের আগ্রহ বেড়েছে



রুহুল আমিন সৌরভ, স্টাফ রিপোর্টার,ঝিনাইদহ, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

ঝিনাইদহে ফুল চাষের সুনাম রয়েছে দেশব্যাপি। ফুল চাষীদের এ চাষে আগ্রহ আছে বেশ। বিভিন্ন ফুল চাষের পর এবার ভিনদেশী সুগন্ধি ফুল লিলিয়াম চাষে ফুলচাষীদের আগ্রহ বেড়েছে। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ছোটঘিঘাটি-ত্রিলোচনপুরে ৪ বিঘা জমিতে এবারই প্রথম বানিজ্যিকভাবে এই ফুলের চাষ করা হয়েছে। তবে অনেক উদ্দিপনা নিয়েই ফুল চাষীরা লিলিয়াম চাষ করছে। কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর গ্রামের ফুল চাষী টিপু সুলতান এবং নুর মোহাম্মদ সহ চারজন চাষী যৌথভাবে এই বিদেশী জাতের ফুল চাষ করেছেন। গাজিপুর জেলা সদরের মাওনাতে আরো ২ বিঘা জমিতে তাদের এই লিলিয়াম ফুলের চাষ রয়েছে। তবে প্রথমবারেই আশানুরুপ লাভ হবে বলে আশা করছে এই ফুল চাষীরা।

 

২০০৮ সালে আব্দুর রহিম নামের এক ফুলচাষী যশোরের ফুল বাজার খ্যাত গদখালীতে ১০ কাঠা জমিতে চাষ করেছিলেন। তখন সঠিক চাষ পদ্ধতি জানা না থাকায় এই ফুলের চাষ আর করা হয়নি বলে ঐ চাষী জানান।

 

কালীগঞ্জে ফুল চাষী টিপু সুলতান গেল বছরের নভেম্বরে ইউরোপের দেশ নেদাল্যান্ড থেকে বীজ সংগ্রহ করেন। এবং ডিসেম্বরের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে রোপন করেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
চাষীরা জানান, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রবিবার বিকালে কালীগঞ্জ থেকে ৫০০ ফুলের ষ্টিক সংগহ করা হয়েছে। এর এক সপ্তাহ আগে গাজিপুর থেকে ৯০০ ফুলের ষ্টিক তোলা হয়। এ পর্যন্ত বাজারে এই লিলিয়াম ফুলের প্রতিটি ষ্টিক বিক্রি হয়েছে ১১০ থেকে ১৩০ টাকা। তবে চাহিদা অনুযায়ি এই ফুলের দাম বাড়তে বা কমতে পারে বলে তাদের ধারনা। বাংলাদেশে চাষ হওয়া এই ফুলে সাদা, গোলাপি, হালকা গোলাপী রঙের লিলিয়াম ফোটে।

 

চাষীদের সাথে কথা বলে আরো জানা গেছে, প্রতিটি গাছে ৩ থেকে ৫টি ফুল হয়। আর এই প্রতিটি গাছকেই একটি ষ্টিক বলা হয়। গাছে কড়ি থেকে ফুল ফোটার আগেই সংগ্রহ করা হয়। এরপর বাজারে সরবরাহ করা হয়। বাজারে নেওয়ার পর ফুল ফোটে। জমি থেকে তোলার পর একটি ফুল ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত তাজা থাকে।

 

লিলিয়াম ফুলের আদি নিবাস নেদারল্যান্ড। এ ফুল সাদা, গোলাপি, হালকা গোলাপী কমলা, হলুদ, এবং লালসহ ৮ টি রঙের হয়ে থাকে। লিলিয়াম ফুলের গাছ ২ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এই ফুল শীত প্রধান দেশে হয়ে থাকে। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে হাতেগোনা কয়েকটি জেলাতে এই ফুলের চাষ শুরু হয়েছে। তবে বীজ সংরক্ষণের সমস্যার কারণে সেখানেও এই ফুল চাষের সম্প্রসারণ তেমনটা হয়নি।

 

ফুলচাষী টিপু সুলতান জানান, গেল বছরের নভেম্বরে ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ড থেকে ৬৩ হাজার বীজ সংগ্রহ করা হয়। শুধু বীজ আনতে খরচ হয় প্রায় ৪২ লাখ টাকা। এরপর ডিসেম্বরে প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ৪ বিঘা এবং গাজিপুরে ২ বিঘা জমি এই বীজ বপন করি। রোপনের প্রায় দুই মাস পর ফুল আসা শুরু করেছে। জমির ছাউনিতে ব্যবহার করা হয়েছে বেলজিয়াম থেকে আনা বিশেষ ধরনে নেট। ইতিমধ্যে নেদারল্যান্ড থেকে একজন কৃষক এসে লিলিয়াম চাষের বিভিন্ন কলা-কৌশল দেখিয়ে দিয়ে গেছেন।
তিনি আরো জানান, বীজ রোপন, ক্ষেতের চারপাশে বাশেঁর বেড়া স্থাপন, উপরের ছাউনি, সার ওষুধ ও শ্রমিক খরচসহ এ পর্যন্ত ৪৪ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এই ফুল পরিচর্যা করার জন্য নিয়মিত চারজন শ্রমিক কাজ করে।

 

তিনি আরো জানান, আমরা অনেকটা ঝুকি নিয়েই এই ফুলের চাষ শুরু করেছি। আবহাওয়া ভালো থাকলে প্রথমবারেই আশানুরুপ লাভ হবে।
লিলিয়াম ফুলের বীজ সংগ্রহ করে এই চাষ সম্প্রসারণ করা যায় কিনা এমন প্রশ্নে ফুলচাষী টিপু সুলতান জানান, তাপমাত্রা যদি ২৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নীচে থাকে তাহলে বীজ ভালো থাকবে। তবে আমাদের দেশের গরম আবহাওয়ায় এই ফুলের বীজ সংগ্রহ করা বেশ কঠিন। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ যদি এগিয়ে আসে তাহলে সম্ভব।
বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, ২০০৮ সালে আমি নিজে যশোরের গদখালীতে ১০ কাঠা জমিতে চাষ করেছিলাম। সে সময় প্রতিবেশি দেশ ভারত থেকে বীজ সংগ্রহ করেছিলাম। ভারতের কৃষি বিভাগ লিলিয়ামের বীজগুলো এনেছিল নেদারল্যান্ড থেকে। বাংলাদেশে প্রথম আমার হাত দিয়েই লিলিয়াম ফুলের চাষ শুরু হয়। তবে জমি থেকে বীজ সংগ্রহের পদ্ধতি জানা না থাকায় পরবর্তিতে আর এই ফুলের চাষ করা সম্ভব হয়নি।

ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জিএম আব্দুর রউফ জানান, আমি শুনেছি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে নতুন জাতের বিদেশি ফুল লিলিয়াম চাষ হয়েছে। তবে দেশে এই ফুলের চাষ আগে কখনো হয়েছে কি না আমার জানা নেই।

 

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হার্টি কালচার উইং এর অতিরিক্ত পরিচালক শাহ মোহাম্মদ আকরামুল হক জানান, লিলিয়াম ফুলের চাষ দেশে এর আগেও হয়েছে। তবে সেটা ছিল পরীক্ষামূলক চাষ। এবারই প্রথম বানিজ্যিকভাবে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ ও গাজিপুরের কয়েকজন কৃষক চাষ করেছেন। তিনি আরো জানান, বিদেশী জাতের এই ফুল লিলিয়ামের বীজ সংগ্রহের দুঃপ্রাপ্যতা এবং গরম আবহাওয়ার কারণে এই ফুলের চাষ সম্প্রাসরণ করা সম্ভব হচ্ছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর