বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪২ তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪২ তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ



সেলিম চৌধুরী হীরা, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

‘‘গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই
নহে কিছু মহিয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ,
অভেদ ধর্ম জাতি,
সবদেশে সবকালে
ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’’

জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত বাঙ্গালি জাতির জন্য যিনি অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিলেন সবকিছু- সে মহান ব্যাক্তি আমাদের দুঃখু মিয়া বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আজ ২৭ আগস্ট সেই বিদ্রোহি কবির ৪২ তম মৃত্যু বার্ষিকী।

 

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমা চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ খ্রিঃ (১১ জৈষ্ঠ্য ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) জন্ম গ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহ, পিতা ফরিদ আহমেদ মাতা জাহেদা খাতুন, তার পরিবারের ৬ষ্ঠ সন্তান তিনি। তার বাবা ফরিদ আহমেদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাজারের খাদেম। ১৯০৮ খ্রিঃ পিতার মৃত্যু হয়, তখন তার বয়স ৯ বছর। পিতার মৃত্যুর পর পারিবারিক অভাব অনটনের কারনে জীবিকা অর্জনের জন্য তিনি কাজ করেন। তবে পাশাপাশি শিক্ষায়ও এগিয়ে গিয়ে ধর্মীয় মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়ে উক্ত মক্তব্যই শিক্ষাকতা শুরু করেন। এ কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি ইসলামিক মূলবোধের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে পরিচয় হয়ে উঠেন। যা পরবর্তীতে তিনি বাংলা সাহিত্যে ইসলামী চর্চায় এগিয়ে থাকেন। তিনি ইসলামী সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি হিন্দু ধর্ম গ্রন্থ অধ্যায়ন করেন। এ সুবাদে তিনি কালীদেবীকে নিয়ে প্রচুর শ্যামা সংগীত রচনা করেন।
ছাত্রজীবনে তাঁর প্রথম স্কুল ছিলো বালীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুল। এরপর মাথুরুন উচ্চ ইংরেজী স্কুল (যা পরবর্তীতে নবিনচন্দ্র ইন্সটিটিউট নামে পরিচিতি লাভ করে)। আর্থিক অনটনে তাঁকে বেশিদিন পড়তে দেয়নি। আবার নেমে পড়েন কাজে। প্রথমে বাসুদেবের কবি দলে, তাঁর পরে এক খ্রিষ্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা, সর্বশেষ আসানসোলের চা-রুটি দোকানে। সে দোকানের কাজের সময় আসানসোলের দারোগা রফিজ উল্যাহ তাকে ১৯১৪ খ্রিঃ ময়মনসিংহ জেলা ত্রিশালে দরিরামপুর স্কুলে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। ১ বছর পর তিনি আবারও সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ফিরে যান। ১৯১৭খ্রিঃ মাধ্যমিক পরীক্ষা না দিয়েই তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। আড়াই বছর সৈনিক জীবন শেষে তিনি কলকাতা ফিরে ৩২নং কলেজ ষ্ট্রেটে বসবাস শুরু করেন। এখান থেকেই তার সাহিত্য- সাংবাদিকতা জীবনের মূল কাজ শুরু করেন।

 

সাংবাদিকতা জীবনে তিনি বেশ কিছু পত্রিকায় কাজ করেন।

১৯২১ খ্রিঃ মাঝামাঝি শান্তি নিকেতনে গিয়ে রবিন্দ্র নাথের সাথে সাক্ষাত করেন। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের মধ্যে সু-সম্পর্ক বজায় ছিলো। ১৯২১ খ্রিঃ প্রথম কুমিল্লার বিরাজ সুন্দরীর বাড়ীতে এসে পরিচিত হন প্রমীলা দেবীর সাথে। পরে বিয়ে করেন কুমিল্লার মেয়ে সেই প্রমীলা দেবীকে। নজরুল সাম্যবাদের একজন অগ্রদূত ছিলেন। তিনি মুসলিম হয়েও ৪ সন্তানের নাম রেখেছিলেন হিন্দু-মুসলিম মিলিয়ে যেমন কৃষ্ণ, মোহাম্মদ ও অরিন্দ্রম, খালেদ।

 

তার প্রকাশিত ধুমকেতু পত্রিকার সশস্ত্র বিপ্লববাদের আর্বিভাব ঘটাতে বিশেষ অবদান রেখেছিলো। ১৯২২ খ্রিঃ যুগবানী প্রবন্ধ গ্রন্থ প্রকাশনার পর বাজেয়াপ্ত হয় এবং ২৩ নভেম্বর কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে তাকে কলকাতা নিয়ে যায়। তখন তিনি এক বছর জেলে ছিলেন, জেলে থাকা অবস্থায় তার রচিত কবিতা ‘‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’’ বহু আলোড়ন হয়। কিন্তু তার আগে ১৯২১ খ্রিঃ তার লেখা সক কবিতা গল্প, প্রবন্ধ,গানে বিদ্রোহী ভাব ফুটে উঠে। এ গুলির মধ্যে সব চাইতে উল্লেখ্যযোগ্য।

 

‘‘ বিদ্রোহী’’
‘‘মহা-বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেইদিন হব শান্ত।
অত্যাচারীর খড়–গ কৃপান ভীমরণ
ভূমে রনীবে না
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হক শান্ত।
আমি চীর বিদ্রোহী বীর
বিশ্ব ছাড়াই উঠিয়াছি এক চির
উন্নত শির!’’

 

নবযুগের কাজ করার পাশাপাশি তিনি বেতারেও কাজ করতেন। এ সময় ১৯৪২ খ্রিঃ তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। ২য় বিশ্বযুদ্ধের কারনে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ইউরোপে পাঠানো সম্ভব হয়নি। ১৯৪২ থেকে ১৯৫২ খ্রিঃ নজরুল পরিবার ভারতের নিভৃত সময় কাটান। ১৯৫৩ খ্রিঃ চিকিৎসা জন্য তাঁকে লন্ডনে পাঠানো হয়। কিন্তু দূরাগ্যে রোগের চিকিৎসা হয়নি। ১৯৭২ খ্রিঃ ভারত সরকারের অনুমোতি ক্রমে নজরুল পরিবারকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। কবির বাকী জীবন বাংলাদেশে কাটে। ১৯৭৬ খ্রিঃ নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদানে সরকার অধ্যাদেশ জারি করেন। বাংলাদেশে যথেষ্ট চিকিৎসা সত্তে নজরুলের স্বাস্থ্যের কোন উন্নতি হয়নি। তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলি কাটান ঢাকা পিজি হাসপাতালে। ১৯৭৬ খ্রিঃ ২৯ আগষ্ট তিনি শেষ নিঃস্বাশ ত্যাগ করেণ। কবিকে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। তাঁর রচিত ‘‘চল চল উর্ধ্ব গগণে মাজে মাদল’’ কবিতাটি বাংলাদেশে রণসংগীত হিসেবে গৃহিত হয়েছে।
তাঁর রচিত কবিতা, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, সংগীতের নিম্নে একটি তালিকা দেয়া হলঃ
কবিতা ও সংগীত

 

অগ্নিবীণা (কবিতা) ১৯২২ সঞ্চিতা (কবিতা সংকলন) ১৯২৫ ফনী-মনসা (কবিতা) ১৯২৭ চক্রবাক (কবিতা) ১৯২৯ সাতভাই চম্পা (কবিতা) ১৯৩৩নির্ঝর (কবিতা) ১৯৩৯ নতুন চাঁদ (কবিতা) ১৯৩৯ মরুভাস্কর (কবিতা) ১৯৫১ সঞ্চয়ন (কবিতা সংকলন) ১৯৫৫ নজরুল ইসলাম: ইসলামী কবিতা (কবিতা সংকলন) ১৯৮২ সাম্যবাদী
দোলন-চাঁপা (কবিতা এবং গান) ১৯২৩ বিষের বাঁশি (কবিতা এবং গান) ১৯২৪ ভাঙ্গার গান (কবিতা এবং গান) ১৯২৪ ছায়ানট (কবিতা এবং গান) ১৯২৫ চিত্তনামা (কবিতা এবং গান) ১৯২৫ সাম্যবাদী (কবিতা এবং গান) ১৯২৫ পুবের হাওয়া (কবিতা এবং গান) ১৯২৬ সর্বহারা (কবিতা এবং গান) ১৯২৬ সিন্ধু হিন্দোল (কবিতা এবং গান) ১৯২৭ জিঞ্জীর (কবিতা এবং গান) ১৯২৮ প্রলয় শিখা (কবিতা এবং গান) ১৯৩০ শেষ সওগাত (কবিতা এবং গান) ১৯৫৮
ছোট গল্প
ব্যথার দান (ছোট গল্প) ১৯২২ রিক্তের বেদন (ছোট গল্প) ১৯২৫ শিউলি মালা (গল্প) ১৯৩১
উপন্যাস
বাঁধন হারা (উপন্যাস) ১৯২৭ মৃত্যুক্ষুধা (উপন্যাস) ১৯৩০ কুহেলিকা (উপন্যাস) ১৯৩১
নাটক
ঝিলিমিলি (নাট্যগ্রন্থ) ১৯৩০ আলেয়া (গীতিনাট্য) ১৯৩১ পুতুলের বিয়ে (কিশোর নাটক) ১৯৩৩ মধুমালা (গীতিনাট্য) ১৯৬০ ঝড় (কিশোর কাব্য-নাটক) ১৯৬০ পিলে পটকা পুতুলের বিয়ে (কিশোর কাব্য-নাটক) ১৯৬৪
প্রবন্ধ
যুগবানী (প্রবন্ধ) ১৯২৬ ঝিঙ্গে ফুল (প্রবন্ধ) ১৯২৬ দুর্দিনের যাত্রী (প্রবন্ধ) ১৯২৬ রুদ্র মঙ্গল (প্রবন্ধ) ১৯২৭ ধূমকেতু (প্রবন্ধ) ১৯৬১

 

 

শেষ কথা হলো কাজী নজরুল ইসলাম বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, সংগীতস্রষ্টা, দার্শনিক, যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী এবং অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। ভারতের পশ্চিম বাংলায় জন্ম নেয়া এই কবি বাংলা ভাষার অন্যতম সাহিত্যিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। এখানে কবির সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এ মহান ব্যাক্তির জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন করার মধ্যে দিয়ে বাংঙ্গালী জাতির দায়িত্ব বোধ শেষ হয়ে যায়না। তার জন্য প্রয়োজন কবির বিদ্রোহীত্ব সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা যাতে করে নজরুলের বিদ্রোহী সাহিত্য-সংস্কৃতি ধর্মীয় মূল্যবোধসহ ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সকলে তাঁর সাহিত্য কর্ম চর্চা করতে পারে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর

জাতীয় এর অন্যান্য খবরসমূহ
মতামত এর অন্যান্য খবরসমূহ