ডেঙ্গুর মহামারী: আক্রান্তের চেয়ে আতঙ্কই বেশি মানুষের - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

ডেঙ্গুর মহামারী: আক্রান্তের চেয়ে আতঙ্কই বেশি মানুষের



অনলাইন ডেস্ক, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

রাজধানীতে বসবাস করা অধিকাংশ মানুষই এখন ডেঙ্গু আতঙ্কে ভুগছেন। বাসাবাড়ি, অফিস, স্কুল, ফুটপাত, চায়ের দোকান- সবখানেই ডেঙ্গু নিয়ে অজানা আতঙ্ক। ফলে বন্ধুদের আড্ডাসহ যেকোনো আলোচনায়ই এখন স্থান করে নিচ্ছে ডেঙ্গু। ডেঙ্গুর আতঙ্কে প্রতিদিন হাজার হাজার সুস্থ মানুষও ছুটছে হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য।

আতঙ্কের মধ্যে চলমান ল্যাব পরীক্ষার বেশিরভাগেরই নেগেটিভ ফলাফল আসলেও পরীক্ষা করাতে ভীড় জমাচ্ছেন সবাই। চলমান অবস্থা চরম কীট সংকটে পড়েছে হাসপাতালগুলো।

এদিকে ডেঙ্গু নিয়ে ডাক্তারদের পরামর্শও কাজে লাগাতে চাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।

আতঙ্কিত ঢাকাবাসী বলছেন, চারিদিকে যে হারে ডেঙ্গুর খবর পাচ্ছি তাতে নিশ্চিত না হয়ে বসে থাকাটাকে বোকামি মনে হচ্ছে। তাই কিছু টাকা খরচ হলেও নিশ্চিত হওয়া দরকার।

ডেঙ্গুর আতঙ্ক নিয়ে হাসপাতাল কর্মী মাসুম বলেন, ‘পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে হাসপাতালে ডিউটি করছি। প্রতিদিন কত মারাত্মক রোগী দেখি, কখনো ভয় পাইনি। কিন্তু এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখে খুব ভয়ে আছি। বিশেষ করে শিশুদের কষ্ট দেখার মতো না। আমারও দুই বছরের একটি সন্তান আছে। ওকে নিয়েই সারাক্ষণ চিন্তায় থাকি। ওর চিন্তায় রাতে আতঙ্কে কয়েকবার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমের ঘোরে বারবার বাবুর গায়ে হাত দিয়ে দেখি।’

তিনি বলেন, ‘আমি আমাকে নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করি না। কিন্তু আমার কিছু হলে বাসার অন্যদের কে দেখবে? আল্লাহ না করুক, বাবুর যদি ডেঙ্গু হয়, এত কষ্ট ও কি করে সহ্য করবে! সারাক্ষণ আতঙ্কে এমন আরও কত চিন্তা মাথায় আসে। সব কথা বলে বোঝানো যাবে না। এ যে কি আতঙ্ক তা বলে বোঝানো মুশকিল। এমন আতঙ্কের মধ্যে আমি কখনো পড়িনি।’

বিএসএমএমইউতে টিকিট কাউন্টারে দায়িত্ব পালন করা একজন বলেন, মানুষের মধ্যে যে কি আতঙ্ক তা এখানে কিছুক্ষণ থাকলেই বুঝতে পারবেন। সুস্থ মানুষও ডেঙ্গুর ভয়ে দৌড়ে হাসপাতালে আসছে। প্রতিদিন যত মানুষ ডেঙ্গুর পরীক্ষা করাতে আসছে এর ১ শতাংশও বাস্তবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত নয়।

বিএসএমএমইউতে ডেঙ্গু সেলে দায়িত্বপালন করা এক চিকিৎসক বলেন, এবার ডেঙ্গুর ধরন একদম আলাদা। জ্বর না থাকলেও ডেঙ্গু হতে পারে। তবে এটাও সত্য ডেঙ্গু নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক একটু বেশিই। অনেকে ডেঙ্গুর আতঙ্কে আমাদের কাছে ছুটে আসছে। দেখে আমরা ধারণা করছি ডেঙ্গু হয়নি, তারপরও আমরা ডেঙ্গুর পরীক্ষা দিচ্ছি। এতে যিনি আমাদের কাছে আসছেন তিনি যেমন আতঙ্কমুক্ত হচ্ছেন, তেমনি আমরাও ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারছি।

ওই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘ডেঙ্গুতে এবার আক্রান্তের সংখ্যাটা অনেক বেশি, এই কথাটা কিন্তু ঠিক। আমার কাছে মনে হচ্ছে যত না মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে তার থেকে আতঙ্কের মাত্রা অনেক বেশি। আতঙ্কিত না হয়ে মানুষকে সচেতন হতে হবে। ডেঙ্গু হলেও যে তা মারাত্মক হবে তা নয়। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে বাসাবাড়িতে থেকেই স্বাভাবিক চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়া সম্ভব। তবে কিছু ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া উচিত।’

এ বিষয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। মানুষ একটা কারণে আতঙ্কিত হয় না। এর পেছনে নানা কারণ থাকে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। অন্য অসুখের ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিয়ে ভালো হওয়া যায়। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারাই যাচ্ছে। এ মারা যাওয়া তো আতঙ্কের কারণ।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবাটা অতটা ভালো নয়। একজন রোগী হাসপাতালে গেলে রিল্যাক্সে থাকে, সব দায়-দায়িত্ব নার্স, চিকিৎসকরা নেন। কিন্তু আমাদের এখানে পদে পদে সমস্যা। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা ঠিকমতো হবে কি না, পরীক্ষা ঠিকমতো হবে কি না, ওষুধে ভেজাল আছে কি না, চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে পারবে কি না সবই ভাবতে থাকে। দেখা যায়, অকারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিল করে বসে আছে। এমন অনেকগুলো কারণে এ আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।’

মানুষ এ রকম আতঙ্কের মধ্যে থাকলে নানা রকম সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানান এ মনোবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, ‘দিনের পর দিন একজন আতঙ্কের মধ্যে থাকলে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। আতঙ্কের কারণে আপনার বডি সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করবে না। ব্লাড প্রেশারের সমস্যা দেখা দেবে। আতঙ্কে থাকলে ঠিকমতো খেতে পারবে না। ঠিকমতো নিজের সেবা-শুশ্রূষা করতে পারবে না। যারা দুর্বলচিত্তের তাদের মধ্যে কোন রোগ তৈরি হয় তারও কোনো ঠিক নেই।