ভক্তদের ভালবাসার জয়, রংপুরে এই শেষ ঠিকান এরশাদের - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

ভক্তদের ভালবাসার জয়, রংপুরে এই শেষ ঠিকান এরশাদের



অনলাইন ডেস্ক, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

নানা নাটকীয়তার পর নিজের জন্মস্থান রংপুরেই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শেষ ঠিকানা হয়েছে । রংপুরের এরশাদভক্তদের দাবির মুখে ঢাকার সামরিক কবরস্থানে দাফন করার সিদ্ধান্ত বদল করা হয় অবশেষে। পল্লীনিবাসে বাবার কবরের পাশে অন্তিম শয্যায় শায়িত হয়েছেন রাজনীতির আলোচিত ও সমালোচিত এই চরিত্র। রাষ্ট্রীয় ও পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সমাহিত করা হয় তাকে। রংপুরে দাফন ভক্তদের ভালবাসা জয় হল শেষ পর্যন্ত। এই কথাটাই জানিয়ে দিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের ।

সামরিক শাসন জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা এরশাদের নামের সঙ্গে আমৃত্যু স্বৈরাচার তকমা সেঁটে থাকলেও, তাকে শেষ বিদায় জানাতে গতকাল মঙ্গলবার রংপুরের কালেক্টরেট ময়দানে জমায়েত হন লাখো মানুষ। রংপুরের ‘ছাওয়াল’ এরশাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পুরো নগরে ছিল শোকের আবহ। জেলার সব দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল আধাবেলা বন্ধ। অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও ছিল অঘোষিত ছুটি।

গত রোববার সকালে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এরশাদ। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে হেলিকপ্টারে তার মরদেহ রংপুরে আনা হয়। জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতারা জানিয়েছিলেন, জানাজা শেষে তার মরদেহ ঢাকায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু রংপুরের নেতারা আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদকে রংপুরেই দাফন করতে হবে। তার মরদেহ ফিরিয়ে নিতে দেওয়া হবে না।

জানাজার আগে জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের ঘোষণা দেন, নামাজের পর মরদেহ ঢাকায় নেওয়া হবে। সঙ্গে সঙ্গে ময়দানে জমায়েত মুসল্লিরা প্রতিবাদ জানান। তারা এরশাদকে রংপুরের দাফন করার দাবি জানাতে থাকেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত জানাজার নামাজ শুরু করা হয়। জানাজার পর এরশাদের মরদেহবাহী গাড়ি মাঠ থেকে বের করতে চাইলে বাধা দেন এরশাদভক্তরা। জাপার কেন্দ্রীয় নেতাদের ঘিরে বিক্ষোভ দেখান তারা।

লাশবাহী গাড়ি কলেজ রোড দিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, সে পথটিও আটকে দেন এরশাদভক্তরা। সেনানিবাসের দিকে যাওয়ার পথও রুদ্ধ করেন। পরে মরদেহ নেওয়া হয় তার রংপুরের বাসভবন পল্লীনিবাসের দিকে। হাজার হাজার মানুষ গাড়ির পাশে এরশাদের নামে স্লোগান দিতে থাকেন।

পল্লীনিবাসে বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদের মরদেহ নেওয়ার পর জিএম কাদের জানান, এরশাদপত্নী রওশন এরশাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি প্রয়াত স্বামী এরশাদকে রংপুরে দাফনের পক্ষে মত দিয়েছেন। বলেছেন, তাকেও যেন মৃত্যুর পর স্বামীর কবরের পাশে দাফন করা হয়।

বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদের পক্ষ থেকে বিকেলে বিবৃতিতে জানানো হয়, এরশাদের প্রতি রংপুরবাসীর অভূতপূর্ব ভালোবাসা, আবেগ তাকে আজীবন কৃতজ্ঞ ও চিরঋণী করে রাখবে। রংপুরের মানুষের ভালোবাসা ও আবেগের সম্মানার্থে এরশাদকে সেখানে সমাহিত করতে তারা পারিবারিকভাবে সম্মত হয়েছেন।

জানাজার আগে রংপুর মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন এবং জেলা প্রশাসন, পুলিশ, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এরশাদের মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানায়। পুলিশ তাকে বিদায়ী গার্ড অব অনার দেয়। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠন-প্রতিষ্ঠান এরশাদের প্রতি অন্তিম শ্রদ্ধা জানায়।

আমৃত্যু রংপুর-৩ আসনের এমপি ছিলেন এরশাদ। ক্ষমতায় থাকাকালে আর্থিক ও নারী কেলেঙ্কারিতে জড়ালেও বৃহত্তর রংপুরে জাপার জয়জয়কার অবস্থা। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণআন্দোলনের মুখে তার পতন হলেও, তিন মাস পরের নির্বাচনে জাপা রংপুরের ২২টি আসনের ১৮টি জেতে। এরশাদ কারাগার থেকে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবক’টিতে জয়ী হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি রংপুরের ২১টি আসনে জয়ী হয়। সারাদেশে জাপার ভরাডুবি হলেও গত বছর রংপুর সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে বিপুল জয় পায় এরশাদের লাঙল।

রাজনৈতিক বিশ্নেষকদের মতে, নব্বইয়ের পর জাপা ধীরে ধীরে আঞ্চলিক দলে পরিণত হয়। রংপুরের ভোট ব্যাংকই তাকে রাজনীতিতে টিকিয়ে রাখে। এই জনভিত্তির কারণেই সামরিক শাসক হয়েও ক্ষমতা ছাড়ার ২৯ বছর পরও রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক ছিলেন। তাকে কাছে পেতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিযোগিতা ছিল তুঙ্গে।

এরশাদের অন্তিম যাত্রাতেও তার প্রতি রংপুরের মানুষের সেই ভালোবাসাই বারবার দেখা যায়। কালেক্টরেট মাঠে তার জানাজায় আসা মানুষের মাঝে ছিল শোকের মাতম। শুধু রংপুর নয়; গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী থেকেও আসেন হাজারো এরশাদভক্ত। তার মরদেহ একনজর দেখার জন্য ছিল মানুষের দীর্ঘ সারি। শেষবারের মতো এরশাদকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে।

এরশাদের মরদেহ পল্লীনিবাসে নেওয়ার পর তাকে শেষ দেখা দেখতে সেখানে জমায়েত হন বিপুল সংখ্যক নারী। ভিড়ের চাপে তাকে দেখতে না পেরে নগরীর দর্শনার ৭০ বছর বয়সি আঙ্গুরবালা জানালেন, এরশাদ তাকে বুড়িমা ডাকতেন। সংসার চালানোর খরচ দিতেন। এখন তাকে না খেয়ে থাকতে হবে। আঙ্গুরবালার মতো আরও অনেকেই জানালেন, বিপদ-আপদে এরশাদকে জানাতে পারলেই সাহায্য পাওয়া যেত। আরও অনেকে বললেন, এরশাদ ক্ষমতায় ছিলেন বলেই রংপুরের উন্নয়ন হয়েছে। রংপুরে যা কিছু উন্নয়ন সব এরশাদের হাতে।

এরশাদে মরদেহ রংপুরে পৌঁছানোর আগেই পুরো নগরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। জানাজাস্থল কালেক্টরেট মাঠ ঘিরে ফেলা হয় নিরাপত্তার চাদরে। তার মরদেহ ঢাকা ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হলে সংঘর্ষ হতে পারে- এমন আশঙ্কাও ছিল। রংপুরের নেতাদের ঘোষণা ছিল, প্রয়োজনে রক্ত ও জীবন দিয়ে হলেও এরশাদকে তারা রংপুরে কবর দেবেন।

আসরের নামাজের পর সেনাবাহিনীর একটি দল কুচকাওয়াজ করে সাবেক সেনাপ্রধান এরশাদের মরদেহবাহী কফিন পল্লীনিবাস-সংলগ্ন মকবুল হোসেন জেনারেল ও ডায়াবেটিক হাসপাতালের লিচুগাছের তলায় নেয়। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। তার জীবনী পাঠের পর স্যালুট দিয়ে এরশাদকে শেষ শ্রদ্ধা জানান সেনা সদস্যরা। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক তার প্রতি বিদায়ী রাষ্ট্রীয় সম্মান জানান। পরিবারের সদস্য ও জাপার নেতারা এরপর এরশাদের মরদেহ কবরে নামান। এরপর তার কবরে মাটি দিতে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। শেষ হয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ অধ্যায়।


এ সম্পর্কিত আরো খবর