বিশ্ব ভালবাসা দিবস বনাম ইসলাম - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

বিশ্ব ভালবাসা দিবস বনাম ইসলাম



সরওয়ার কামাল, মহেশখালী (ককসবাজার), (খবর তরঙ্গ ডটকম)

ভালবাসা শব্দটি কর্ণের কুহুরে প্রবেশ করলে আমরা অনেকই চমকিয়ে উঠি। অথচ ভালবাসা শব্দটি ইতিবাচক। সোজা কথায় বলতে হয় মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি ও বান্দাদের হতে তার প্রিয় নবী (দঃ) কে ভালবাসায় বিভোর হয়ে সৃষ্টি করলেন, আরো সৃষ্টি করলেন এই বিশ্ব বসুধা। তাই মহান পবিত্র কোরআনে খোদা প্রাপ্তির পূর্ব শর্ত হিসাবে নবী (দঃ) প্রতি ভালবাসাকে উল্লেখ করেছেন। আর ভালবাসা সুনিপুন মার্জিত রূপ হল প্রেমিক প্রেমাসপদের মন জয়ে তারই অনুসরণ করা। তাই আমরা আল্লাহ ও রাসূলের মনোসন্তোষ্টির জন্য নবী তরিকাকে সুন্নাত হিসাবে পালন করে থাকি। উদাহরণ হিসাবে- হযরত বেলাল (রাঃ), হযরত হুবাইব (রাঃ) সহ অসংখ্যকা সাহাবী নবী প্রেমে আতœহারা হয়ে হাসিমুখে যুদ্ধের ময়দানে শাহাদত বরন করলেন, হযরত হানজালা (রাঃ) নব বিবাহিতা স্ত্রীকে পরকালের সাক্ষাতের বানী শুনিয়ে এবং হযরত সুমাইয়া (রাঃ) নবী (দঃ) প্রতি ভালবাসা সিক্ত হয় প্রাচীরের মত অটল থেকে পাহাড়সম মছিবত মোকাবেলা করে শাহাদ্দতের পেয়ালা পান করে ভালবাসার চুড়ান্ত পরীক্ষায় কৃতিত্ব প্রদর্শন করে আল্লাহর দিদারে চলে যায়।

আল্লাহ ও রাসূলের কর্তৃক ভালবাসার নির্দেশ:
পরস্পর ভালবাসার ও সন্তুষ্টি মানদন্ড হল শুধু মাত্র আল্লাহর রাসূল (দঃ) এর সন্তুষ্টি। এ ব্যাপারে হযরত নবী করিম (দঃ) বলেন যে, আমার বান্দাদের মধ্যে শুধুমাত্র আমার জন্য পরস্পর ভালবাসা স্থাপনকারীরা আজ তাদেরকে আমি স্বয়ং আল্লাহ আমার কুদরতী ছায়ার নিচে তাদেরকে জায়গা দেব। হযরত রাসূল করিম (দঃ) আরও বলেন যে, আমার বান্দাদের মধ্যে নবী , রাসূল ও শহীদ নহেন এমন কিছু বান্দা আছে। কিন্তু তাদেরকে কিয়ামতের দিন বিশেষ সমমানের আসনে দেখে তাদের ইর্ষা হবে। তখন উপস্থিত সাহাবীগণ বলেন যে, হে রাসূল (দঃ) সে সমস্ত লোকদের পরিচয় জানিয়ে দিন উত্তরে মহা নবী (দঃ) বলেন যে তারা সে সকল লোক যারা আমার জন্য পরস্পরকে ভালবেসে ছিল।

তরুন যে ছেলে মেয়েরা বিবাহ পূর্ব শারীরিক সম্পর্কে স্থাপনকে হারাম মনে করে না। কিন্তু হযরত ইউসুফ (আঃ) কে মিশরের তৎকালীন সম্রাজ্ঞী তার সাথে প্রেমালাপে আহবান করলেও তিনি তাতে সাড়া না দিয়ে কারাবন্দী হয়েছিলেন। হযরত নবী করিম (দঃ) থেকে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এরশাদ করেন যে, ওই জাতে পাকের কসম, যার হাতে আমার প্রান রয়েছে তোমাদের মধ্যে কেউ সে পর্যন্ত ঈমানদার হবে না। যতক্ষন পর্যন্ত তোমাদের নিকট আমার ভালবাসা অধিক না হবে।

হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণিত হযরত নবী করিম (দঃ) এরশাদ করেন যে, তোমাদের কেউ পুর্নাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষন পর্যন্ত আমি তাদের সন্তান পিতা মাতা ও সর্বাধিক ভালবাসার পাত্র না হব।

হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত নবী করিম (দঃ) এরশাদ করেন যে, যে সম্প্রদায়ের মধ্যে লজ্জাহীনতা প্রকাশ্যমান পরে তারাই তা প্রচার ও প্রকাশের ব্যবস্থা করে। তার অবশ্যক পরিনতি হচ্ছে মহামারীর ন্যায় সংক্রামগ রোগ এবং ক্ষুধা-দুর্ভিক্ষ এত প্রকট হবে যে যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ভালোবাসা দিবস:
ভালবাসার নামে জঘন্য নোংরা প্রতারনা প্রবঞ্চনা ও নিষ্ঠুর স্মৃতিচারনের নাম ভালবাসা দিবস। এ দিবসের উৎস, ঘটনা ও বিকাশ সম্পর্কে দু ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। প্রথমতঃ এ দিবসের বয়স প্রায় ১৭৩৮ বছর। কিন্তু তার নাম ভালবাসা দিবস ছিল না। চলমান কালেই এ নামে নামকরণ করা হয়। ১৪ই ফ্রেব্রুয়ারী ২৭০ সাল। তৎকালে কড়িয়াস নামক এক রোমান সম্রাট ছিল। তারই রাজত্ব কালে ভ্যাললেন্টাই নামক এক খ্রিষ্টান ধর্ম যাজক বয়সে নবীন ও তরুণ প্রেমিক প্রেমিকাদের ভালবাসার গোপন পরিনয় সম্পর্কে মন্ত্রে শিক্ষা দিত। এ সংবাদ সম্রাট কড়িয়াস জ্ঞাত হলে যাজক ভ্যালেন্টাইকে হত্যা করা হয় এবং তারই নামে ১৪ ফেব্রুয়ারী ভ্যালেন্টাইনডে পালন করা হয়।

অন্য বর্ণনা মতে:
তখনও হযরত ইসা (অঃ) জন্ম লাভ করেনি। তারও আগে খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ শতকে নানা রকম পৌত্তলিক মুর্তিপুজারীরা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে দেবতাকে অর্ঘ প্রদান করত। পশু পাখি ও জমির উর্ব্বরতা,বিদ্যা সম্পদের জন্য বিভিন্ন দেবতাকে পুজা করত। তার মধ্যে একজন দেবতার নাম ছিল লুপার কালিয়া। এই দেবতার মনোরঞ্জনের জন্য নানা রকমের অনুষ্ঠানাদি যুবক যুবতীদের মধ্যে ইস্যু করা ছিল। তার মধ্যে একটি ল্যাটারীর আয়োজন করেন। ল্যাটারী দেওয়া হত যুবক যুবতীদের মধ্যে যে যুবকের নামে যে যুবতীর নাম উঠে আসত। তারা একসাথে ১৪ ফেব্রুয়ারী হতে আগামী ১৪ ই ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত বসবাস করত। ১৪ ফেব্রুয়ারী আসলে তারা লুপার কালিয়া দেবতার নামে পশু জবাই করত। উক্ত পশুর চামড়া নিয়ে যুবতীর গায়ে পরিয়ে দিত এবং জবাইকৃত পশুর রক্ত ও কুকুরের রক্ত মিশ্রণ করে চাবুকে লাগিয়ে যুবক যুবতীদেরকে বেত্রাঘাত করত। অনুষ্ঠান পালন করা হত ১৪ ফেব্রুয়ারী তারা ১ বছর পাদ্রীর সাথে কলংক মুক্ত হতে ১৪ ফেব্রুয়ারী সোহবত শুরু ও শেষ হত। পরবর্তী সময়ে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচার হলে এ প্রথা কুসংস্কার ঘোষনা দিলেও দিবস পালন বন্ধ হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে পাদ্রীরা উক্ত দিবসকে বৈধতা দেওয়ার প্রসায় চালায় এবং ঘোষনা করে যে আগে দেবতার নামে হলেও এখন পাদ্রীর নামে হবে। ৪৭৬ সালে রোমান সম্রাট জোলিয়াস দেবতা লুপার কালিয়া নামের পরিবর্তে ভ্যালেন্টাইন যাজকের নামে পরিবর্তন করে। ভ্যালেন্টাইনের নামে নামকরণের কারণ হল যাজক ভ্যালেন্টাইন যখন কারাবন্ধী হয় তখন কারারক্ষীর মেয়ের সাথে দিন রাত অনেকক্ষন গল্পে লিপ্ত থাকত। মৃত্যুর পূর্বে উক্ত যাজক প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করে একটি প্রেম পত্র লিখে যায় এবং তিনি প্রেমের যাজক হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। ১৪ ফেব্রুয়ারী তার মৃত্যু দিনকে তারই নাম অনুসারে ভ্যালেন্টাইন ডে নামে অবহিত করা হয়। তখন থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারী উদযাপন শুরু।

কখন ঘোষিত হয়ঃ
যদিও বা ২৭০ সালে এই দিবসের সূচনা হলেও অবশেষে ৭৯৬ সালে রোমান সম্রাট পপ জেনসিয়াস ১৪ ফেব্রুয়ারীকে ভ্যালেন্টাইন ডে হিসেবে ঘোষনা করেন। প্রশ্ন হতে পারে? কে এ ভ্যালেন্টাইন? ক্যাথলিক খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের এনসাই কোপিড়িয়া অনুসারে ৩ জন ভ্যালেন্টাইন দে’র খোজ পাওয়া যায়। তারা সবাই ১৪ ফেব্রুয়ারী মৃত্যু বরণ করে। তাই এই দিবস ভ্যালেন্টাইন দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে। তবে সাধারণের মধ্যে ব্যাপক প্রসার ও প্রচার লাভ করে ১৯ শতকে। এক গবেষণায় দেখা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র সহ ইউরোপিয় ইউনিয়নের রাষ্ট্র গুলিতে প্রতি ৪ জনের ৩ জন এই দিবস পালন করে। এই দিবসে শুধু মাত্র আমেরিকার ১৩ কোটি কার্ড ও ১৬ কোটি গোলাপ বিনিময় হয়। হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের উল্কাও আলপনা অংকন করা হয়।

আমেরিকার ন্যাশনাল ক্রাইমবিকটিনাইজেশন সার্ভে ব্যুরো অব জাষ্টিস এর আর এক জরিপের প্রতিবেদনে দেখা যায় যে ১৯৯৬ সালে প্রতিদিন গড়ে ২৭১৩ টি ধর্ষনের মত অপরাধ সংঘটিত হয়। অতীব দুঃখের বিষয় হল- উক্ত প রিসংখ্যাণ অনুযায়ী শতকরা ৮% তাদের নিষিদ্ধ আতœীয়দের সাথে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া যায়। যার মধ্যে জন্মদাতা পিতাও রয়েছে।

বাংলাদেশে কখন চালু হয়-
এই দিবস পালন শুরু হয় ৯০ দশকের শুরুতে ১৯৯৩ সালে। তখন ক্ষমতায় ছিল ইসলামী মূল্যবোধের সরকার। ১৪ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, একটি গোলাপ বিক্রি হয়েছে ২০ হাজার টাকায়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা সউল্লাসে বেলল্লাপনা ও বেহায়াপনা। উম্মাদের মত এই অনুষ্টান আযোজন করতে থাকে। ফলে কারো বোন কিংবা কারো মেয়ে তার সাথে কোথায় যাচ্ছে যে বা রাত্রি যাপন কার সাথে করতেছে তার কোন হিসাব নেই। এই দিন যুবক যুবতীরা যা করে তা ইসলামের দৃষ্টিতে নয় আবহমান কাল হতে বাংলাদেশে সংস্কৃতির সাথে সমর্থন যোগ্য নয়। ফলে আমাদের সমাজের শেকড় থেকে শিখরে পর্যন্ত কলোসিত হচ্ছে।

এই দিবসের আমাদের নিজ ও দেশীয় চরিত্রে যে ক্ষতি সাধিত হচ্ছে তার কিছু আলোচনা করবঃ
০১। এই দিবসের তরুণ তরুনী সংস্থা যৌন আবেগকে সুড়সুড়ি দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও পচাত সৃষ্টি করা হচ্ছে।
০২। মুসলমানের নৈতিক চরিত্রঅবক্ষয়ে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ছে।
০৩। নিলজ্জতা ও বেহায়াপনা জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করছে।
০৪। তরুণ-তরুনীরা বিবাহ পূর্ব সম্পর্ক গড়তে কোন কুষ্ঠিতবোধ করছে না।
০৫। শরীরে উলকা আকাতে গিয়ে নিজ ইজ্জত ও আবরো বাদ দিয়ে পরপুরুষকে দেখানো হচ্ছে।
০৬। ভালবাসা দিনের নামে লজ্জাহীনতা বৃদ্ধির কারণে জেনা, বেবিচার, ধর্ষণ ও খুন বৃহত্তর পরিষরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
০৭। এ দিবসের কারণে মানুষের অন্তর হতে তাকওয়া ও আল্লাহর ভয় উঠে যাচ্ছে।
০৮। উক্ত দিবসে ইমান বিধ্বংসি কর্মকান্ডের ফলে আমাদের মুসলমান যুবক-যুবতী ইমানী চেতনা হারিয়ে ফেলছি।
আল্লাহ মাবুদ আমাদের সন্তান, সন্ততি ও যুবক-যুবতীসহ ফেব্রুয়ারী কাজ হতে আমাদেরকে হেফাজত করুন।
০৯। অনেক ক্ষেত্রে সাজানো পরিবার বিচ্ছেদের মুখে পড়েছে
১০। তাদের জন্মের জীরব অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে
১১। বিকৃত যৌন লালসার শিকার হয়ে এইড নামক মরনভ্রাধির সম্মুখিন হচ্ছে

মাওলানা মোহাম্মদ আবু সৈয়দ
সহকারী অধ্যাপক
পুটিবিলা ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রী) মাদরাসা
মহেশখালী, ককস বাজার।