আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সান্নিধ্যে এ’তেকাফ: মাওলানা মুহাম্মদ রুহুল আমিন - খবর তরঙ্গ
শিরোনাম :

আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সান্নিধ্যে এ’তেকাফ: মাওলানা মুহাম্মদ রুহুল আমিন



অনলাইন ডেস্ক, (খবর তরঙ্গ ডটকম)

এতেকাফ আরবী শব্দ উকুফ ধতু থেকে উৎকলিত। যার শাব্দিক অর্থ অবস্থান করা, কোনো স্থানে থেমে যাওয়া, আবদ্ধ থাকা, কোন জায়গাকে আঁকড়ে ধরা। (নিহায়াহ ফিল গারীবিল হাদীস-১৩৬)
শরীয়াতের পরিভাষায় আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রত্যাশায় ছওয়াবের নিয়তে দুনিয়ার সকল কার্যক্রম থেকে অবসর গ্রহন করে ইবাদতের মানসে নিয়্যতের সাথে মসজিদে অবস্থান করা।(মুফরাদাত ফি গারীবিল কুরআন-১৩৪)।অর্থ্যাৎ জাগতিক সকল কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরিবার থেকে পৃথক থেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে একান্তভাবে ইবাদত করার জন্য মসজিদে অবস্থান করাই হলো এ’তেকাফ।
এ’তেকাফ আল্লাহ প্রেমের বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহর মুহাব্বতে মগ্ন থাকার কার্যকরী গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত হলো এ’তেকাফ। মহান আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার অপার সুযোগ। একজন মুসলিম তার দুনিয়ার যাবতীয় কার্যক্রম, চিন্তা-চেতনা, কামনা-বাসনা, মেধা ও শ্রমের ব্যবহার এবং নিজ যোগ্যতাকে কিছু দিনের জন্য মহান প্রভুর স্মরণে নিয়োজিত করে ঈমান ও আমলকে বৃদ্ধি করবে। এভাবে সে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হবে বিশুদ্ধ নিয়তে যথাযথ আমলের মাধ্যমে। পরম নিবেদন, পুর্ণ আত্মিক প্রশান্তি, স্থির চিত্ততা, চিন্তা ও হৃদয়ের একাগ্রতা, বিনয়ের মন্তক অবনমিত করে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন ও তাঁর রহমতের দরজায় পড়ে থাকার মহা সৌভাগ্য অর্জিত হয় এ’তেকাফের মাধ্যমে। এ’তেকাফের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লামা ইবনুল কায়্যিম বলেন, “এ’তেকাফ গায়রুল্লাহর মোহময় বেড়াজাল থেকে মুক্তি লাভ করে আল্লাহর সাথে গভীর ও প্রেমময় সম্পর্ক স্থান করে” । শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহঃ লিখেছেন, ‘মসজিদে এ’তেকাফ হলো আত্মিক প্রশান্তি, চিন্তার বিশুদ্ধতা, ফিরিস্তাকুলের গুনাবলী অর্জন, শবে কদরের সৌভাগ্য ও কল্যাণ লাভসহ সকল প্রকার ইবাদতের সুযোগ লাভের এক সর্বোত্তম উপায়’।

 

আরো বলা যায় এভাবে যে , এ’তেকাফের মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর সমীপে পরিপুর্ণ সপে দেয়া হয়। জাগতিক চিন্তাধারা ও জাগতিক সকল প্রয়োজনীয়তাকে সাময়িক মুলতবি রেখে পরকাল পানে ছুটে চলার জলন্ত শিক্ষা এ’তেকাফ। ইবাদতের মানন্নোয়ন, আল্লাহর সাথে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন ও নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ থেকে রেজমন্দি হাসিল করা যায়।
সিয়াম পালনকারীদের জন্য পবিত্র মাহে রমজানের শেষ দশক খুবই গুরুত্বপূর্ণ । আল্লাহর হাবীব (সা) শেষ দশককে খুবই গুরুত্ব দিতেন। মাহে রমজানের শেষ দশকে এ’তেকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কেফায়া (সুন্নাত)। (দুররে মুখতার-১২৯) একটি মসজিদের মুসল্লীদের মধ্য থেকে কাউকে না কাউকে এ’তেকাফ করতেই হবে, নয়তো সবাইকে গুনাহগার হতে হবে। এ’তেকাফ ১০ দিন বা ৯ দিন নয়, ইচ্ছে এক বা একাধিক দিনও করা যায়। তবে দশদিনই উত্তম বা এটাই নবীর (সা) সুন্নাত। রমজানের বিশ তারিখ সুর্যাস্তের পুর্ব হতে শাওয়ালের( ঈদুল ফিতরের) চাঁদ দেখা পর্যন্ত এ’তেকাফ করতে হয়।(বুখারী-২০৪০,মুসলিম-১১৬৭)

 

এ’তেকাফের গুরুত্বদিয়ে মহাগ্রন্থ আল কোরআনে আল্লাহপাক বলেন, ‘ওয়ালাতুবাশিরু হুন্না ওয়া-আনতুম আকিফুনা ফিল মাসাজিদ।’ (সূরা বাকারা : ১৮৭) আর যতক্ষন তোমরা এ’তেকাফ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান কর,ততক্ষন পর্যন্ত তোমরা স্ত্রীদের সাথে মিশোনা। এ’তেকাফের ব্যাপারে আল্লাহর হাবীব (সাঃ) কতবেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তা আমরা হাদিস থেকে সহজেই জানতে পারি। হয়রত ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত ’ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিন এ’তেকাফ করতেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে পাক (সা.) বলেন, এ’তেকাফকারী মূলত গোনাহ থেকে দূরে থাকে এবং তাকে এ’তেকাফের বিনিময়ে এত বেশি নেকী দেয়া হবে যেন সে নেককারদের সব নেকী অর্জনকারী।(ইবনু মাজাহ১৭৮১) হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে আরো বর্ণিত, রাসূলে পাক (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের প্রয়োজন মেটাতে হাঁটবে, তা তার জন্য ১০ বছর এ’তেকাফ করার চেয়েও কল্যাণকর হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে এ’তেকাফ করবে, আল্লাহ তা’য়ালা তার এবং জাহান্নামের আগুনের মধ্যে তিনটি পরিখার দূরত্ব সৃষ্টি করবেন, প্রত্যেক পরিখার প্রসস্ততা আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তি ব্যবধানের চেয়েও বেশি। (বায়হাকী,শুয়াবুল ঈমান ৪২৫)। হযরত আয়েশা (রা) বলেছেন, হুজুর পাক (সা) রমজানের শেষ দশকে এ’তেকাফ করতেন। ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত এ নিয়ম তিনি পালন করেছিলেন। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণ এ’তেকাফের এ সিলসিলা জারী রাখেন। (বুখারী-২০২৬,মুসলিম-১১৭১,১১৭২) হযরত আয়েশা রাঃ হতে আরো বর্ণিত, একবছর এতেকাফের ব্যাপারে নবী করিম সাঃ এর স্ত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা দেখা দেয় সে বছর নবীজি সাঃ এতেকাফ করেননি।কিন্তু পরের মাস শাওয়ালের শেষ দশদিনে ঐ এতেকাফ তিনি কাযা করে নেন। (বুখারী ২০৩৩, মুসলিম ১৭৭৩) হযরত আবু হুরায়রা রাঃ বলেন, নবী সাঃ রমজানের শেষ দশদিন এতেকাফ করতেন,কিন্ত ইন্তেকালের পুর্বে রমজানে বিশদিন এতেকাফ করেছেন।(বুখারী-২০৪৪,৪৯৯৮) হযরত উবাই ইবনে কা’ব রাঃ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবীজি সাঃ রমজানের শেষ দশকে প্রত্যেক বছর এ’তেকাফ করতেন। একবছর তিনি ঐ সময়ে সফরে থাকায় এ’তেকাফ করতে পারেননি। তাই পরের বছর বিশদিন এ’তেকাফ করেন।(আবু দাউদ-২৪৬৪) হাসান ইবনে আলী রাঃ রাসুল সাঃ থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যাক্তি রমজানের দশদিন এতেকাফ করল সে যেন দুই হজ ও দুই ওমরা করলো। (শুয়াবুল ঈমান-৪২৫) বিশিষ্ট তাবেয়ী হাসান বসরী রহঃ বলেন, এতেকাফকারীর জন্য প্রত্যেক দিনের বদলে একটি করে হজের সওয়াব রয়েছে।(তাফসীরে দুররে মানসুর ২০২) এ হাদিস গুলো সনদ নিয়ে বেশ কথা রয়েছে তবে হাদিস বিশারদগণের মুলনীতির আলোকে তা ফজিলতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য।

 

ইসলাম বৈরাগ্যবাদকে কখনো সমর্থন করে না। সমাজ-সংসার, লোকালয় ছেড়ে নির্জনে ধ্যানমগ্ন হয়ে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করাকে ইসলাম বাতিল করেছে। তবে রমজান মাসের এই এ’তেকাফ বা মসজিদে অবস্থান আল্লাহ প্রাপ্তির অপূর্ব সুযোগ। এটি অত্যন্ত ফজীলত ও গুরূত্ববহ। এটাকে বৈরাগ্যবাদের সাথে তুলনা জ্ঞানের স্বল্পতা। এ’তেকাফের কারণে মুতাকিফ ব্যক্তির লাইলাতুল কদর প্রাপ্তিও ঘটে যায়। কে হতে পারে এত বড় সৌভাগ্যবান-যার লাইলাতুল কদর প্রাপ্তি হয় এ’তেকাফের বদৌলতে। হাদীসের পাতা থেকে কুরআনের আলোকে যা জানা গেলো তাতে এ’তেকাফ যে কত গুরুত্বপুর্ণ একটি ইবাদাত তা ঈমানদান মুমিনদের কাছে সহজেই অনুমেয়।

 

প্রতিয়মান হলো রমজানের শেষ দশকের এ’তেকাফ আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য অনন্য মাধ্যম। অত্যধিক বৈশিষ্টপুর্ণ রমজানের শেষ দশকের এতেকাফ আল্লাহর একান্ত প্রিয় বানায়। এ সময় দুনিয়ার সকল মুহাব্বত ভুলে গিয়ে একমাত্র দয়ালু দাতা রাজাধিরাজ আল্লাহর রহমতের দরজায় ধ্যানমগ্ন হয় মুতাকিফ। বিশ রমজান সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্ত থেকে পশ্চিমাকাশে ঈদের সুরু চাঁদ উদিত হওয়া পর্যন্ত একনিষ্ট হৃদয়ে প্রভূর ইবাদাতে মশগুল থাকতে মসজিদে এ’তেকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা ওয়ালাল কেফায়া। এ’তেকাফে আল্লাহ সান্নিধ্যে আত্মশুদ্ধির জন্য বসে যা করা জরুরী : আল্লাহর নৈকট্য লাভে একনিষ্ট আত্মনিয়োগ করতে হবে। পরকালের মুক্তির জন্য যাবতীয় নেক কাজের বাস্তব জীবন্ত আমল করতে হবে। দ্বীনি কল্যাণকর কথা ছাড়া কোন শব্দও মুখ থেকে উচ্চারণ না করা। আলস্যের চাদর ঝেড়ে ফেলে বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত, নফল নামাজ, তাসবীহ তাহলীলে নিমজ্জিত থাকা। কুরআনের তাফসীর , হাদীস, ফেকাহ ও ইসলামী সাহিত্য অধ্যায়ন করতে হবে। এ’তেকাফে যা অবশ্যই বর্জন করলে কার্যকরী আত্মশুদ্ধি হয়: মিথ্যা বলা, গীবত করা, কানাকানি,ফিসফিসানি, চোগলখুরি, মেজাজের ভারসাম্যহীনতা, একঘেয়েমী সহ সকল গোনাহর কাজ ত্যাগ করতে হবে। আশ্লীল, অনর্থক পার্থিব কথাবার্তা বর্জন করতে হবে। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ব্যাবহার বন্ধ রাখা, ফেসবুক, টুইটারে ঢু না মারা, । মোবাইল ফোনে গল্পগুজব না করা।

 

হোয়াট্সএপ ও মেসেঞ্জার, চ্যাটিং থেকে বিরত থাকা। এগুলো যথানিয়মে মানতে পারলেই গোনাহ মাফের এ মোক্ষম সুযোগে আল্লাহর ভালবাসার সেতুবন্ধন নির্মাণ করতে মুতাকিফের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

 

আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনে এ’তেকাফের এ গুরুত্বপুর্ণ ইবাদাতের মাধ্যমে আল্লাহর ভালভাসায় সিক্ত হই। আল্লাহ আামাদের কবুল করুন আমীন।

লেখকঃ
চেয়ারম্যান,ইসলামিক দাওয়াহ ফাউন্ডেশন খতিব,উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদ
০১৭১২-৬১২৮৭৬


এ সম্পর্কিত আরো খবর

ঝিনাইদহ এর অন্যান্য খবরসমূহ
ধর্ম এর অন্যান্য খবরসমূহ