‘আমি সম্পর্ক চাই, একনায়ক চাই না’ (আই ওয়ান্ট রিলেশনশিপ, নোট ডিকটেটরশিপ)।  মিয়ানমারের বিক্ষুব্ধ এক তরুণীর হাতে লেখা প্ল্যাকার্ডে এমনটিই শোভা পাচ্ছিল। 

মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে মঙ্গলবার চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বড় জমায়েত হলে সেনাবাহিনীর ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারি উপেক্ষা করে বিক্ষোভকারীরা সান চুয়াং এলাকায় জড়ো হয়েছেন।  

ওই এলাকায় জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তার পরও শিক্ষকরা ওই এলাকার প্রধান সড়কে সমবেত হয়ে মিছিল করেছেন। তারা তিন আঙুল তুলে স্যালুট দেন।

এদিকে অভ্যুত্থানের পর সোমবার প্রথম জনসমক্ষে আসেন জেনারেল মিন অং হ্লাইং। টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি অভ্যুত্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে নতুন করে নির্বাচন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সোমবার টানা তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ হয়েছে। এতে যোগ দেন দেশটির হাজারও মানুষ। বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও এদিনের বিক্ষোভে যোগ দেন। রাজধানীতে পুলিশ মারমুখী হয়ে ওঠে। তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর জলকামান ব্যবহার করে।

গতানুগতিক আন্দোলনের চেয়ে মিয়ানমারে সেনাশাসনবিরোধী আন্দোলন একটু ভিন্ন। সেখানে আন্দোলনে প্রথম দুদিন সহিংসতামুক্ত ছিল। পুলিশ আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা দিত। আর আন্দোলনকারীদের ফুল দিতে দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। তৃতীয় দিন সোমবার থেকে আন্দোলনে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নতুনমাত্রা যোগ করে।  

অবস্থা বেগতিক দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জলকামান ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে আন্দোলনকারীরা সহিংসতার পথে পা বাড়াননি। তারা ভিন্ন ধাঁচে আন্দোলন চালিয়ে যান।

এই আন্দোলনের স্লোগানগুলোও চোখে পড়ার মতো। স্টিকার ও ফেস্টুনগুলোতে বৈচিত্র্যতা দেখা গেছে।  বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক তরুণীর হাতে লেখা স্টিকারে দেখা গেছে– ‘আমার সাবেক প্রেমিক খারাপ ছিল, সেনাবাহিনী তার চেয়েও খারাপ।’  

আরেক তরুণীর হাতে হাতে লেখা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল– ‘আমি একনায়কত্ব চাই না, ছেলে বন্ধু চাই।’

একজনের হাতে লেখা– ‘গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিন’।

সেনাবাহিনীর উদ্দেশে আরেকজনের হাতে লেখা রয়েছে– ‘আপনারা ভুল প্রজন্মের সঙ্গে রয়েছেন।’   

আরেক বিক্ষোভকারীর হাতে শোভা পাচ্ছে– ‘আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার সুযোগ তোমাদের দেওয়া হবে না।’

এসবের মধ্য দিয়ে সামরিক অভ্যুত্থানবিরোধী অহিংস পদক্ষেপ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন বিক্ষোভকারীরা।

১ ফেব্রুয়ারির পর থেকে রোববার মিয়ানমারজুড়ে সামরিক অভ্যুত্থানবিরোধী সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছে। ২০০৭ সালে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নেতৃত্বে ‘গেরুয়া বিপ্লবের’ পর এটিই ছিল সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। ‘গেরুয়া বিপ্লব’ মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সংস্কারের গতি বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল; কিন্তু গত সোমবারের সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে ওই ধারা থমকে গেছে।

গত বছরের ৮ নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে সু চির দল এনএলডি ভূমিধস জয় পায়। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যেখানে ৩২২ আসনই যথেষ্ট, সেখানে এনএলডি পেয়েছে ৩৪৬ আসন।

কিন্তু সেনাবাহিনী সমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) ভোটে প্রতারণার অভিযোগ তুলে ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। দলটি নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের দাবি তোলে। তার পর থেকেই দেশটিতে ফের সামরিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কা করা হচ্ছিল। সেটিই সত্যি হলো ১ ফেব্রুয়ারি।

এদিন ভোররাতে সু চিসহ দেশটির ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের গ্রেফতার করে জান্তা সরকার। ফেসবুক-টুইটার ও ইনস্টাগ্রামসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ করা হয়। এক বছরের জন্য ঘোষণা করা হয় জরুরি অবস্থা। 

মিয়ানমার দীর্ঘদিনের ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল। ২০০৮ সালে দেশটি গণতন্ত্রের পথে ধাবিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর অধীনে ছিল। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক উত্তরণে মূল ভূমিকা রাখেন দেশটির স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা অং সান। পরে তার মেয়ে অং সান সু চি ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি দল গঠন করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মূল ভূমিকা রাখেন। এ কারণে তাকে কয়েক বছর গৃহবন্দিও থাকতে হয়েছে।