লাকসামে খালগুলোতে স্থাপনা নির্মাণে মরা খালে পরিণত

লাকসাম উপজেলা খালগুলোতে স্থাপনা নির্মাণে এখন মরা খালে পরিনত। খাল দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন কতিপয় প্রভাবশালী ও ভুমি দস্যুরা। এলাকায় সরকারী চড়া খাল গুলো দখলের ফলে বর্তমানে ছোটনালায় পরিনত হয়েছে। অবৈধ ভাবে দখল করে দু’পাড়ে আধাপাকা ভবন নির্মাণ করে সরকারী জায়গা দখল করেছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যাক্তিরা। খাল দখল করে দু’পাড়ে আধাপাকা ঘর নির্মাণ করার ফলে ধীরে ধীরে সংকচিত হয়ে আসছে খালের গতিপথ। পাশাপাশি আবাসিক ভবন থেকে যথাযথ ময়লা আবর্জনা ফেলা এবং মলমূত্র ত্যাগ করায় দূষিত হচ্ছে খালের পানি এতে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। খালগুলো দখল করায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ভোগান্তিতে ভুগছে এসব অঞ্চলের লোকজন।

 

সরকারী এ সব খাল দখল করে যে যার মত ঘরবাড়ী, দোকানপাট ইত্যাদি নির্মাণ করে এমনকি ঘর নির্মানের কেটাগড়ির উপর নির্ভর করে দখলকৃত জায়গা বিক্রি করা হচ্ছে। এসব সরকারী জায়গায় মার্কেট তৈরি বা খালি জায়গা বিক্রি করছে ২০-৫০ হাজার টাকা দরে অন্য দখলকারীদের কাছে। সরকারী জায়গাগুলো রদবদল করে ভূমি দস্যুরা বিক্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। শূকনো মৌসুমে এলে দেখা যায় উপজেলা খালগুলো দখলে মহোৎসব। স্ব স্ব এলাকায় প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে কিছু পরিবেশ অচেতন লোক সরকারী খালগুলো দখল করছে। প্রতিবাদ বা প্রতিরোধে এগিয়ে আসছেনা সচেতন মহল। খালের পাড়ে যে ভাবে দখল প্রতিযোগিতা চলছে তাতে অনতিবিলম্বে এ খালগুলো বিলুপ্তির পথে।

 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, লাকসাম পৌর শহরসহ উপজেলা মুদাফরগঞ্জ, মাওলানা বাজার, বিজরা, শান্তিরবাজার, নরপাটি বাজার, ইছাপুরা বাজার, সালেপুর বাজার, কান্দিরপাড় আমুদা, খিলা বাজার এলাকায় এসব দখলের প্রতিযোগিতায় চলে আসছে। দিন দিন বাড়ছে দখলের মাত্রা। খালের মধ্যে আরসিসি ঢালাই তৈরী করে চলছে মার্কেট ভবন নির্মান। খাল দখলের ফলে এক দিকে যেমন পানির প্রভাব পড়ছে তেমনি বাড়ছে ভূমি দস্যুদের আগ্রাসন। পানির প্রভাব কমে যাওয়ার কারনে সেচ প্রকল্পেও দেখা দিয়েছে চরম বিপর্যয়।

 

পৌরশহরে কুচাইতলি,চালিতাতলি খালটি দু’পাড়ে দখলের প্রতিযোগিতা ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে আসছে। খাল দখল করে বহুতল ভবনসহ অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। বাজার অংশে খালের পশ্চিমপার্শ্বে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবনএবং তার পূর্ব পাশে আবাসিক বাড়ী একই ভাবে দক্ষিন দিকে এসে ফতেপুর এলাকায় দেখা যায় খালের বড় বড় অংশ দখল করে দু’পাশে ঘর বাড়ী তৈরি করা হয়েছে। হাসপাতাল এলাকায় দেখা যায় খাল দখলের প্রতিযোগিতার মাত্রা আরও বেশি। ওই এলাকার খালটি অধিকাংশই দখল করে বাড়ী ঘর নির্মান করে বসবাস করছে। উপজেলার বিজরা বাজার,খিলা বাজার, মাওলানা বাজার ও নরপাটি বাজারের সরকারী খালগুলো দেখার মত কোন চিহ্ন নেই। কিন্তু কালের বিবর্তনে এসব খাল মরে গিয়ে কোথাও কোথাও কবলে পড়ে কোথাও বিলীন হয়ে গেছে এতে হুমকির মুখে পরিবেশ। এসব খালের মাধ্যমে একসময় বর্ষা পাহাড়ি ঢলে পানি সমুদ্রে পরিনত হতো। অপরদিকে শুকনো মৌসুমে মজুদ থাকা জলে ফসলি জমিতে সেচ দিতো কৃষক। আর এসব খাল এখন মৃত প্রায়। খালের দুইপাড়ে দখলদারদের দৌরত্ব হাট বাজার এলাকাগুলোতে তো আর কথাই নেই। চলে দখলের প্রতিযোগিতা। খালগুলো দখলমুক্ত করার জন্য বিভিন্ন মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধন হলেও কাজের কাজ হচ্ছে না।

উপজেলা খালগুলোর মধ্যে চালিতাতলি, কার্জন, বেরুলা, ঘাগৈর, মেল্লা, ফতেপুর-সোনাইমুড়ি, ছিলনিয়া, কুচাইতলিসহ প্রায় ৪৬টি খালের অস্তিত্ব এখন বিলুপ্তির পথে। খালসহ অগনিত খাল এর আয়তন ছিল এসময় অর্ধ শতাধিক ফুট প্রস্থের এসব খাল সংকীণ হতে হতে এখন কোথাও কোথাও ৫ ফুট নালার মত হয়ে গেছে। অথচ ভূমি বিভাগের কাগজপত্রের এসব খালের প্রস্থ্য কয়েকগুন বেশি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যাক্তি অভিযোগ করে বলেন দখলদাররা স্থানীয় ভূমি অফিস থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্নস্তরে মোটা অংকের সুবিধা দিয়ে সরকারী এ খালগুলি অবৈধ ভাবে গ্রাস করছে। ফলে এলাকা কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। সাবেক ইউপি সদস্য ইমান আলী বলেন, মুদাফরগঞ্জ বাজারের যে খালটি রয়েছে বর্তমানে খালের দু’পাশে দোকানপাট বাড়ী নির্মাণ করে এ চড়া খালটি এখন প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন দলের লোকজন কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে খালের গতিপথ বন্ধ করে দিয়েছে। এ দিকে খালগুলো দখলের কারনে বিভিন্ন দিক দিয়ে পানিগুলো হয়ে দ্রুত চলে যেতে পারে সমুদ্রে। হাটবাজারগুলো বিভিন্ন অংশে খালের উপর দোকানপাট, কোথাও ঘরবাড়ী, কোথাও মার্কেট নির্মাণ করে রেখেছে স্বার্থান্বেষী দখলদাররা। এদিকে লাকসাম পৌরসভা,উপজেলার মুদাফরগঞ্জ, বাকই, কান্দিরপাড়, গোবিন্দপুর, উত্তরদা, আজগরা ও লাকসাম পূর্ব ইউনিয়নে প্রতিবছর জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে হাজার হাজার পরিবার এর দূর্ভোগের অন্ত থাকেনা। ফলে ফসলি জমি তলিয়ে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়।

সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব এডভোকেট রফিকুল ইসলাম হিরা যুগান্তরকে বলেন, পানি নিস্কাশনের বাহন হলো এ খালগুলো। এ খালগুলো ডাকাতিয়া নদীর সাথে সংযোগ হয়েছে। এগুলো দেখা শুনার জন্য পৌর মেয়র,কাউন্সিলারগণ ও উপজেলা প্রশাসনের ক্ষমতা রয়েছে। খালের উপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে পারে। অচিরেই খালগুলো থেকে উদ্ধার না করলে মানুষ পানিতে নিমর্জ্জিত হবে। পৌরসভা যতই ড্রেন করুক খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন না হলে এসব ড্রেন করে কোন লাভ নেই। এ ব্যাপারে বিশেষ করে স্থানীয় এমপি প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদেরকে বিভিন্ন সভা সেমিনারে বলে থাকেন।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, যে সমস্ত সরকারী খালগুলো দখল করেছে ওইসব খালগুলো ভূমি দস্যুদের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রফিকুল হক জানান, সরকারী খালগুলো দখলের কবলে পড়ে আছে ইতিমধ্যে কিছু সরকারী খালগুলো দখলের কাজে বন্ধ করে দিয়েছি। তবে যেসব খালগুলোর দখলের কবলে রয়েছে সে গুলো উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাবো।