নওয়াব ফয়জুনেছার বাড়ি সংরক্ষণের দায়িত্ব পেল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর

উপমহাদেশের একমাত্র নারী নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর মালিকানাধীন ৪ একর ৫৩ শতক জায়গা রক্ষণা-বেক্ষনের দায়িত্ব পেল সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়লের অধীন ‘বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর’।

 

ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর স্মৃতি বিজড়িত এ বাড়িতে ‘উন্মুক্ত যাদুঘর’ নির্মাণ ও আধুনিকায়ন করে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা বলে ধারণা করা হচ্ছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের এমন উদ্যোগে লাকসামের সাধারণ মহল মহাখুশি হলেও দীর্ঘদিন থেকে ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর মালিকানাধীন মোটা অংকের মূল্যের এ সম্পত্তির বেশকিছু অংশ অবৈধ দখলদারদের কবলে থাকায় তারা পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়।

 

 

নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী নারী জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র। বেগম রোকেয়ার জন্মের ৪৬ বছর আগে কুমিল্লার লাকসামের পশ্চিমগাঁও এলাকায় ১৮৩৪ সালে নওয়াব ফয়জুন্নেছা জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমান সময়ে মহিয়সী নারী হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বীকৃত বেগম রোকেয়ার জন্মের সাত বছর আগে অন্ধকার যুগে নারী মুক্তি আন্দোলনের অগ্রনায়ক নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী নারীদের জন্য উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুঃসাহস দেখিয়েছেন। নওয়াব ফয়জুন্নেছা ছিলেন জমিদার আহমদ আলী চৌধুরী ও আরফান্নেছা চৌধুরাণীর প্রথম কণ্যা। রক্ষণশীল সমাজে জমিদার বাড়ির কড়া পর্দাপ্রথার মধ্যে বেড়ে ওঠা ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি বাংলা, আরবী, ফার্সি ও সংস্কৃত ভাষায় বেশ পারদর্শী ছিলেন।

 

জীবনের শেষ ত্রিশ বছর ফয়জুন্নেছার পিত্রালয়ে থেকেই নারী শিক্ষার প্রসারে অনন্য ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশে তিনিই একমাত্র নারী যিনি সর্বপ্রথম চিন্তা করেছিলেন আধুনিক শিক্ষা না পেলে নারীরা সমাজে পিছিয়ে পড়বে। তাই দুঃসাহসিক উদ্যোগ নিয়ে মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার জন্মের সাত বছর আগে ১৮৭৩ সালে কুমিল্লা শহরের বাদুড়তলায় প্রতিষ্ঠা করেন ফয়জুন্নেছা উচ্চ ইংরেজী বালিকা বিদ্যালয়। যা বর্তমানে ফয়জুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত। ১৯০১ সালে লাকসামে ফয়জুন্নেছা ডিগ্রি কলেজ ও বিএন হাইস্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। নারী স্বাস্থ্য সেবায় তিনি ১৮৯৩ সালে নওয়াব ফয়জুন্নেছা মহিলা ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নওয়াব ফয়জুন্নেছা ১৮৯৯ সালের দেশের ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের নির্মাণ কাজে তৎকালীন সময়ে ১০ হাজার টাকা অনুদান দেন। শিশুদের শিক্ষা বিস্তারে তিনি নওয়াব ফয়জুন্নেছা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে পশ্চিমগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে চালু রয়েছে। এছাড়া দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র, পুল, ব্রীজ, কালভার্ট ও মসজিদ নির্মাণ করে একজন দক্ষ নারী নেত্রীর ভূমিকা রাখেন। বাংলার নারী ইতিহাসে নওয়াব ফয়জুন্নেছার দৃষ্টান্ত অতি বিরল।

 

শুধু শিক্ষা বিস্তারেই নয়। নওয়াব ফয়জুন্নেছা ছিলেন একজন সাহিত্যনুরাগী। তিনি ছিলেন বৃটিশ ভারতের প্রথম কবি। তাঁর রচিত রূপজালাল কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালে। এ কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও ফয়জুন্নেছার সঙ্গীতসার ও সঙ্গীত লহরী নামে দু’টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ছিলেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত সুধাকর ও মুসলমান বন্ধু পত্রিকার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। অসাধারণ উদ্যমী ফয়জুন্নেছাকে বৃটেনের রাণী ভিক্টোরিয়া ‘বেগম’ উপাধি দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ‘বেগম’ স্ত্রীলিঙ্গ বলেই তিনি তা গ্রহণ করেননি। পরে রাণী ভিক্টোরিয়া ১৮৮৯ সালে ফয়জুন্নেছাকে ‘নওয়াব’ উপাধি দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতবর্ষে খেতাব পাওয়া প্রথম মুসলিম মহিলা জমিদার। নারী শিক্ষার প্রসারে অনন্য ভূমিকার পরও নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মর্যাদা দেয়া হয়নি। বিগত ২০০৪ সালে একরকম অবহেলা ও অসম্মান করেই ফয়জুন্নেছাকে যৌথভাবে একুশে পদক দেয়া হয়। ২০০৮ সালে জাতীয় জাদুঘরে বেগম রোকেয়া ও বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের পাশে করা স্থাপন করা হয় ফয়জুন্নেছা কর্নার। স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন নির্বাচিত সরকারের আমলেও নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী তাঁর কর্মের স্বীকৃতি পাননি। আন্তর্জাতিক নারী দিবসেও অবহেলিত থাকেন ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী।

 

কুমিল্লা জেলার লাকসাম শহর থেকে আধা কিলোমিটার দূরে পশ্চিমগাঁও-এ ডাকাতিয়া নদীর তীর ঘেঁষে অপূর্ব সৌন্দর্যের লীলাভূমি নওয়াব ফয়জুন্নেছার ঐতিহাসিক বাড়ির (নবাব বাড়ির) অবস্থান। ঐতিহ্যের ধারক বাড়িটির নির্মাণ সাল নিয়ে মতান্তর রয়েছে। উপমহাদেশের একমাত্র মহিলা নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী ১৮৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পশ্চিমগাঁও এলাকায় সাড়ে ৩ একর জমির উপর বাড়ি নির্মাণ করেন। বাড়িটি নির্মাণ করতে প্রায় ৩ বছর সময় লেগে যায়। সিমেন্ট, রড ছাড়াও ব্রিটিশ আমলের চুন ও শুরকী দিয়ে বাড়িটি তৈরী করা হয়। বাড়িটির চতুর্দিকেও তাঁর মালিকানাধীন আরো কিছু সম্পদ ছিল।

 

নবাব ফয়জুন্নেছা অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। তিনি পর্দার আঁড়াল থেকে এ বাড়িটিতে বসে উপমহাদেশের সকল বিচার কার্য সম্পাদন, রাস্তা-ঘাট, পুল-ব্রিজ, স্কুল-মাদ্রাসা সহ যাবতীয় জন কল্যাণমূলক কার্য পরিচালনা করতেন। কালের বিবর্তনে বাড়িটি ঐতিহাসিক বাড়ি হিসেবে দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

 

নবাব ফয়জুন্নেছা মৃত্যুর পূর্বে বাড়িটি সরকারের নিকট ওয়াকফ্ করে যান। কিন্তু ঐতিহ্যমন্ডিত এ বাড়িটির যথাযথ রক্ষণা-বেক্ষণ না হওয়ায় তা বিলীনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে। ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর মালিকানাধীন বিশাল অংকের মূল্যের এ সম্পত্তির বড় একটি অংশ কৌশলে একটি স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের দখলে নিয়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর স্মৃতি বিজড়িত বাড়ির চতুর্দিকের সম্পত্তি অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে রক্ষা করে তা আকষর্ণীয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত করতে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বারোপ করে অসংখ্য সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওইসব সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে সংস্কৃতি
মন্ত্রণালয় ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর মালিকানাধীন সর্বমোট ৪ একর ৫৩ শতক সম্পত্তি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে সংরক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করে। যা পরবর্তীতে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

 

সাম্প্রতিক সময়ের দর্পণ এর কাছে আসা গেটেজ নং ৪৩,০০,০০০০, ১১৪,০১৬,১৩৮,১৫,৩৫৮-১৯৬৮ইং সালের (১৪নং আইন) (১৯৭৬ইং সালে সংশোধিত) প্রত্নসম্পদ আইনের ১০নং ধারার (১) উপধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার কর্তৃক নওয়াব ফয়জুন্নেছা জমিদার বাড়ি, অবস্থান: কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলা পৌরসভাস্থিত পন্ডিমগাঁও মৌজায় খতিয়ান নং ৯০, দাগ নং ২২২৫-এ ২.৭৬; খতিয়ান নং ৯০, দাগ নং ২২১৫-এ ০.৬৪; খতিয়ান নং ৯০, দাগ নং ২২২৭-এ ০.১০; খতিয়ান নং ৯০, দাগ নং ২২২৯-এ ০.০৭; খতিয়ান নং ৯০, দাগ নং ২২৩৫-এ ০.০৯; খতিয়ান নং ৬৩০, দাগ নং ২২১৯-এ ০.১৭; খতিয়ান নং ৬৩০, দাগ নং ২২২২-এ ০.৭১ সম্পত্তিতে চৌহর্দি: উত্তর- ছায়েদ আলী গং, দক্ষিণ- ডাকাতিয়া নদী, পন্ডিম- মস্ত দিঘী, পূর্ব- রাস্তা, এসএ ৯০ ও ৬৩০নং খতিয়ানের রেকডীয় মালিক, ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষণের সুপারিশ সংক্রান্ত গেজেট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। নওয়াব ফয়জুনেছা চৌধুরাণীর সাড়ে ৪.৫৩ একর সম্পত্তি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে যাওয়ার সংবাদে লাকসামের সাধারণ মহল আনন্দে উদ্বেলিত। অপরদিকে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অবৈধ দখলদার ও তাদের কাছে বিক্রয় করা ভূয়া মালিকরা। ঐতিহাসিক বাড়িটিতে উন্মুক্ত যাদুঘর চালুসহ আধুনিকায়নের মাধ্যমে আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে জানা গেছে।

নওয়াব ফয়জুন্নেছা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক আজাদ সরকার লিটন বলেন- ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর স্মৃতি রক্ষায় দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল হিসেবে ঐতিহ্যমন্ডিত ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে যাওয়ায় আমরা আনন্দিত। আশা রাখি সারাদেশের পর্যটন কেন্দ্র সমূহের অন্যতম একটি হবে ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর বাড়িটি।

লাকসাম পৌরসভার মেয়র অধ্যাপক আবুল খায়ের বলেন- নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী নারী জাগরণের অগ্রদূত। তিনি আমাদের লাকসামের গৌরব। তাঁর স্মৃতি বিজড়িত পশ্চিমগাঁও নওয়াব বাড়িটি দীর্ঘদিন থেকে সংরক্ষণের অভাবে অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনের উন্নয়নের রূপকার জনাব মোঃ তাজুল ইসলাম এর আন্তরিক প্রচেষ্টায় ও বর্তমান উন্নয়নবান্ধব সরকারের সারাদেশের ঐতিহ্যমন্ডিত স্থান সমুহকে আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে লাকসাম নওয়াব বাড়িকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ফয়জুন্নেছা কমপ্লেক্স নির্মাণ সহ লাকসাম নওয়াব বাড়িকে দৃষ্টিনন্দিত পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত করবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি। আর এর মধ্য দিয়ে লাকসাম পৌরশহরকে সুন্দর ও আধুনিক শহরে রূপান্তরে প্রিয় নেতা জনাব মোঃ তাজুল ইসলাম এর দীর্ঘদিনের যে স্বপ্ন ও পরিকল্পনা তা বাস্তবায়নে এক ধাপ এগিয়ে যাবে। লাকসাম হবে আগামীর সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দিত শহর।

 

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোঃ আতাউর রহমান জানান- নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী কুমিল্লারবাসীর অহংকার। তাঁর স্মৃতি রক্ষায় লাকসাম নওয়াব বাড়িকে পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে আমরা সহসা বাড়িটি সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে একটি উন্মুক্ত যাদুঘর চালু করবো। ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে দৃষ্টিনন্দন জায়গায় বাড়িটির অবস্থান হওয়ায় এটি আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর সম্পত্তি অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে উদ্ধারে সহসা প্রশাসনের সহযোগিতায় অভিযান চালানো হবে বলেও তিনি জানান।