পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের ১৩৩ একর (৩শ ৯৯ বিঘা) ভূসম্পত্তি বেদখল হয়ে যাচ্ছে

পাবনা, ডিসেম্বর ২০ (খবর তরঙ্গ ডটকম)- পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের প্রায় শত কোটি টাকা মূল্যের ১৩৩ একর (৩শ ৯৯ বিঘা) ভূসম্পত্তি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। কোটি কোটি টাকার প্লট বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বেড়া পৌর কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের বৃশালিখা কোলঘাট এলাকায় বাণিজ্যিক ও ফসলী জমিতে মাটি ভরাট করছে। এই মাটি ভরাট কাজে বেড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে মাটি ভরাট অব্যাহত আছে। উক্ত ১শ’৩৩ একর ভূসম্পত্তির মধ্যে শালিকা পাঠক মৌজার আর,এস ১৬৬, ৫৫২, ১৫১, ১৫২, ১৪৯ ও ৯২ খতিয়ানের ১৯টি আর,এস দাগে ১২ দশমিক ৭৬ একর জমির মালিকানা দাবি করে বৃশালিখা গ্রামের মোঃ আব্দূল হামিদ দিং বাদি হয়ে চলতি বছরের ১৫ নভেম্বর বেড়া পৌর মেয়র আব্দুল বাতেনের বিরুদ্ধে পাবনার উপজেলা বেড়া সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে নং ৯৫/১১ মামলা দায়ের করেন। বিজ্ঞ বিচারক শুনানি শেষে ওই দিনই স্থিতাবস্থার নির্দেশ দেন। কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নালিশি সম্পত্তিতে মাটি ভরাট অব্যাহত রেখেছে। অভিযোগে জানা যায়, বেড়া পৌরসভা কর্তৃপক্ষ শালিকা পাঠক মৌজার বৃশালিখা গ্রামে পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের জায়গা দখল করে আমদানী রফতানি ঘাট ও বারকী হাট স্থাপনের জন্য পাঁচটি ড্রেজারের সাহায্যে মাটি ভরাট করছে। সেখানে ব্যবসায়ীদের প্লট বরাদ্দ দেয়ার জন্য এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে। বিভিন্ন ক্যাটাগরির প্লটের জন্য ব্যবসায়ীদের কাছে একশ, পাঁচশ ও এক হাজার টাকা দামের আবেদন ফরম বিক্রি করা হচ্ছে। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মানের জন্য ১৯৭১-৭২ সালে জমি অধিগ্রহন করে। বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মানের পর ১শ’৩৩ একর জমি অব্যবহৃত থাকে। সাবেক মালিকরা এই জমি ভোগদখল করে আসছেন। জমি অধিগ্রহণের পর ক্ষতিপুরনের শতকরা ৯০ ভাগ টাকা জমির মালিকদের প্রদান করা হয়। অবশিষ্ট ক্ষতিপুরনের টাকা গত ৪০ বছরে জমির মালিকদের পরিশোধ করা হয়নি । আরওজানা গেছে, মোঃ আব্দুল হামিদ দিংদের মালিকানা দাবিকৃত ১২ দশমিক ৭৬ একর জমি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯৭১-৭২ সালে অধিগ্রহণ করে। পরবর্তীতে পানি উন্নয়ন বোর্ড জমি খারিজ না করায় আর এস রেকর্ড সাবেক মালিক ও তাদের ওয়ারিশগনের নামে জমি রেকর্ডভূক্ত হয়। বাদি অধিগ্রহণের বিষয়টি গোপন করে রেকর্ড মূলে জমির মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। তবে হুকুম দখলের শর্ত অনুয়ায়ী অব্যবহৃত জমির যদি কোন প্রয়োজন না হয় সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ উপযুক্তমূল্যে সাবেক মালিকদের জমি ফেরত দেয়ার বিধান রয়েছে। আবার লিজ দেয়া হলে সে ক্ষেত্রেও জমির সাবেক মালিকেরা অগ্রধিকার ভিত্তিতে লিজ পাবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে কোন নিয়মই মানা হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন। প্রাপ্ত নথিপত্র ঘেটে দেখা যায়, “পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার বেড়া পৌর এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়া পাম্পিং ষ্টেশন হতে মোহনগঞ্জ বিকল্প বাঁধ পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের বরপিট বেড়া পৌরসভা কর্তৃক মাটি দ্বারা ভরাট করে উপার্জনমূখী উন্নয়ন মূলক প্রকল্প” গ্রহণের জন্য তিন শত টাকার ষ্ট্যাম্পে ২০০৯ সালের ১১ মার্চ তারিখে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, প্রধান কার্যালয়, ওয়াপদা ভবন, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০ এর পক্ষে তৎকালীন  নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শহিদুল ইসলাম তালুকদার (বর্তমানে মেঘনা ধানাগোদা প্রকল্পে কর্মরত) বেড়া পওর বিভাগ, পাউবো, বেড়া-পাবনা এবং বেড়া পৌরসভার পক্ষে মোঃ আব্দুল বাতেন, মেয়র বেড়া পৌরসভা, বেড়া-পাবনা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন। ২০১২ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত এই সমঝোতা স্মারকের বিষয়টি গোপন রাখা হয়। জানা যায়, তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শহিদুল ইসলাম তালুকদার মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে বেড়া পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে ১শ’৩৩ একর ভূসম্পত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অনুমতি দেন। সমঝোতা স্মারকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়নি। এমনকি এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোন অনুমোদন নেয়া হয়নি। প্রতি বছর সমঝোতা স্মারক নবায়নের বিধান রাখা হয়েছে। মোঃ শহিদুল ইসলাম তালুকদারের বদলী হয়ে যাওয়ার পর মোছাঃ কামরুন নেছা এবং মোঃ আব্দুল আওয়াল মিয়া বেড়া পাউবো বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেন। তারা দু’জন এই সমঝোতা স্মারক নবায়ন করেননি। ফলে তাদের অন্যত্র বদলী হতে হয়েছে। বেড়া পাউবোর বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী কবিবুর রহমান গত নভেম্বর মাসে সমঝোতা স্মারক নবায়ন করেন। এর পর থেকেই বেড়া পৌর কর্তৃপক্ষ বৃশালিখায় মাটি ভরাট শুরু করেছে। সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের শালিখা পাঠক মৌজার আর,এস ৪৯৩ দাগে ১০ একর, বৃশালিখা মৌজায় ৪১৪ দাগে ছয় দশমিক ৫০ একর, উত্তর সম্ভূপুরা মৌজার ২২২ ও ১০১৭ দাগে ২৯ একর, দক্ষিণ সম্ভূপুরা মৌজার ২২৩ ও ২২৬ দাগে সাত একর, শালিখা পাঠক মৌজার ৬১৯ দাগে ১০ একর, বৃশালিখা মৌজার ২৩৮ দাগে ১৫ দশমিক ২৯ একর, চকবাড়াদিয়া মৌজার ৪১৩, ৪২৪ ও ৪২৬ দাগে তিন একর, পেঁচাকোলা মৌজার ১, ২, ৪৫, ৪৭৫, ৪৪, ১০৫১ ও ৪৭৬ দাগে ২৬ একর এবং পাইখন্দ দুদুলিয়া কোল মৌজায় ২০৮ দাগে ১০ একর বাণিজ্যিক, ফসলী জমি ও ইছামতি নদী মাটি দ্বারা ভরাট করে আমদানি রফতানি ঘাট, দোকান পাট ও বিনোদনমূলক স্থাপনা শিশু পার্ক স্থাপনের জন্য উল্লেখিত মৌজাগুলোর ১শ’৩৩ একর ভূমি বেড়া পৌরসভাকে দেয়া হয়েছে। সমঝোতা স্মারকটি প্রতি বছর নবায়ণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সমঝোতা স্মারকের ১৫টি শর্ত রযেছে। কোন পক্ষ একতরফা শর্ত ভঙ্গ করতে পারবেন না। শর্তগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই বিপুল পরিমাণ ভূসম্পত্তি থেকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন রাজস্ব পাবে না। সমঝোতা পত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। হাট-বাজার, ঘাট, পার্ক থেকে যে রাজস্ব আয় হবে তা বেড়া পৌরসভা ফান্ডে জমা হবে। ওই টাকা পৌরসভা নিজস্ব বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করবে। বেড়া পাউবো কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, পৌরসভা কর্তৃপক্ষ সমঝোতা স্মারকের তিন ও চার নম্বর শর্ত লঙ্ঘন করেছে। সমঝোতা স্মারকের তিন নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, যে কোন প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে প্রথম পক্ষের (বেড়া পাউবো) নিকট হতে উক্ত প্রকল্পের সকল ডিজাইন ডাটা সংগ্রহ পূর্বক প্রাক্কলন প্রস্তুত করতে হবে। চার নম্বর শর্তে উল্লেখ আছে যে, কোন প্রকল্প শুরু করার পূর্বে উভয় পক্ষের প্রকৌশলী সরেজমিনে উপস্থিত থাকিয়া লে-আউট প্রদান করিবে। কিন্তু বেড়া পৌর কর্তৃপক্ষ ক্ষমতার দাপটে পাউবো কর্তৃপক্ষের কোন অনুমোদন না নিয়েই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মাটি ভরাট করছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোডর্, ঢাকা, প্রধান কার্যালয় এর ল্যান্ড বিভাগের উপ-পরিচালক মোঃ সালে আহম্মেদ এর সাথে মোবাইল ফোনে (০১৭১১-১১৭৮২০) যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বেড়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন না। তিনি শুধুমাত্র অস্থায়ী ভিত্তিতে লিজ প্রদান করতে পারেন। স্থায়ী লিজ প্রদান অথবা ভূমির কাঠামো পরিবর্তনের জন্য অবশ্যই যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন নিতে হবে বলে তিনি জানান। বেড়া পাউবোর বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কবিবুর রহমান মাটি ভরাটে মদদে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নবায়ন করে সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়েছে। তবে বেড়া পৌর কর্তৃপক্ষকে বৃশালিখায় আমদানি রফতানি ঘাট ও বারকী হাট স্থাপনের জন্য মাটি ভরাটের কোন ছাড়পত্র দেয়া হয়নি। মাটি ভরাট বন্ধের ব্যাপারে তিনি প্রশাসনিক কোন ব্যবস্থা নেননি বলেও জানান। তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শহিদুল ইসলাম তালুদারের সাথে মোবাইল ফোনে (০১৭৫৯-১৮৫৮৩৭) যোগাযোগ করা হলে তিনি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা স্বীকার করে বলেন, আইনত এই সমঝোতা স্মারকের কোন বৈধতা নেই। বেড়া পৌর মেয়র মোঃ আব্দুল বাতেন পৌরসভা কার্যালয়ে তাকে ডেকে নিয়ে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেছিল বলে তিনি জানান। এ ব্যাপারে বেড়া পৌরসভার মেয়র আব্দূল বাতেনের সাথে মোবাইল ফোনে (০১৭১৫-০৩০৫৫০) যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। তবে এ ব্যাপারে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী শাহ খন্দকার ফিরোজুল আলম বলেন, বেড়া পাউবোর সাথে পৌরসভার স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে বৃশালিকায় আমদানী রফতানি ঘাট ও বারকী হাট স্থাপনের জন্য মাটি ভরাট করা হচ্ছে। এতে এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে তিনি জানান।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।