সরকারের বিপক্ষে মামলার রায় বাড়ছে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে, লিখিত জবাব পাঠাচ্ছেন না কর্মকর্তারা

অনলাইন ডেক্স: হারুন অর রশিদ হাওলাদার রাজধানীর ডেমরার ১৪ শতাংশ জমি নিয়ে মামলা করেন , ওই মামলায়  বিবাদী করা হয়ঢাকার জেলা প্রশাসককে। কিন্তু জেলা প্রশাসন মামলার জবাব না দেয়ায় এবং সরকার পরে আইনজীবী কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় মামলাটিতে হেরে যায় সরকার। হেরে যাওয়ার পর প্রকৃত সময়ে আপিল না করায় মামলাটি ইতিমধ্যে তামাদিও হয়ে গেছে। একইভাবে ভাওয়ালের রাজার (কোর্ট অব ওয়ার্ডস ভাওয়াল রাজ) সম্পত্তির মামলায় আবদুল মজিদ নামের এক ব্যক্তি কাফরুল থানার সাহারা মৌজায় ১৪ শতাংশ জমি রের্কড সংশোধন চেয়ে মামলা করেন। এ মামলায় সরকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও বাদীর বিপক্ষে যথেষ্ট তথ্য উপস্থাপন করতে না পারায় এবং জবাব না দিতে পারায় হেরে গেছে সরকার।
সরকারের পক্ষে যথেষ্ট কারণ ও যুক্তি থাকা সত্বেও কেবল জবাব উপস্থাপনের অভাবে এ মামলার রায় বিপক্ষে গিয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, জেলা প্রশাসন ও সরকার পরে আইনজীবীদের (কৌঁসুলি, জিপি, এজিপি) অবহেলা ও গাফিলতির কারনে ভূমি সংশ্লিষ্ট মামলায় হেরে যাচ্ছে সরকার। সরকারকে বিবাদী করে করা বিভিন্ন মামলায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ ও কর্মকর্তারা ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে লিখিত জবাব পাঠাচ্ছে না। ফলে সরকারের বিপে মামলার রায় হচ্ছে। এতে জাতি সরকার ও করদাতাদের ক্ষতি হচ্ছে।

দায়ী মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও: সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ভূমিসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে সরকারপক্ষ মামলায় হারার কারণ হিসেবে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও দায়ী বলা হয়েছে। সরকারকে পক্ষ করে করা মামলায় প্রয়োজনীয় তথ্য, উপাত্ত, প্রমাণসহ লিখিত জবাব যথাসময়ে সলিসিটর অফিস এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে পাঠানো নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কৌঁসুলি যথাসময়ে উপযুক্ত আদালতে উপস্থাপন করে সরকারের পক্ষে প্রতিদ্বন্দিতা করতে সক্ষম হবেন। এ বিষয়ে সরকারের সচিবদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়, বিভাগের সব কর্মকর্তা এবং তাদের আওতাধীন সব অধিদপ্তর, পরিদপ্তর সংস্থার প্রধানদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারের বিপক্ষে দায়ের করা মামলার জবাব তৈরি, মামলার বিষয়ে সরকারি কৌঁসুলির সঙ্গে যোগাযোগ, শুনানির দিন কৌঁসুলিসহ আদালতে উপস্থিতি এবং মামলার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিবীক্ষণ, সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ও তাদের আওতাধীন সব অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এসব পদক্ষেপ সঠিক সময়ে ও যথাযথভাবে গ্রহণ করা হলে সরকারের স্বার্থ রক্ষা এবং মামলা থেকে উদ্ভূত বিভিন্ন সমস্যা নিরসন করা সম্ভব। সরকারের বিরুদ্ধে রুজুকৃত মামলা বিষয়ে অ্যার্টনি জেনারেল, সলিসিটর, জিপি ও পিপি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং তাদের মামলার প্রয়োজনীয় তথ্য যথাসময়ে সরবরাহ করা উচিত বলেও চিঠিতে মন্তব্য করা হয়।

জানতে চাইলে ভূমি প্রতিমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “কার অবহেলা ও গাফিলতির কারণে ভূমি সংশ্লিষ্ট মামলায় সরকার হেরে যাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া মামলার রায় হওয়ার পরও কেন সঠিক সময়ে আপিল করা হয় না সে বিষয়টি আমরা খোজঁ নিচ্ছি।”

বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ৫০ হাজার রিট মামলার মধ্যে ভূমি সম্পর্কিত ২৫ হাজার মামলা উচ্চ আদালতে অনিষ্পন্ন অবস্থায় আছে। ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ে যেকোনো মামলার রায় হওয়ার পরও কোনো কাগজপত্র, মামলার রের্কড বা কোনো প্রকার রেজিস্ট্রার আদালতে দাখিল করে না। এ কারণে মামলায় সরকার হেরে যায়।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা ফরিদপুরের এক মামলার উদাহরণ দিয়ে বলেন, “সরকারের ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানার নুরুল্লাগঞ্জ শেওজার দশমিক ৬০ একর জমি নিয়ে মোশাররফ হোসেন গং ও ফরিদপুরের সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন। জেলা প্রশাসন থেকে রায়ের সাড়ে ২২ বছর পর করণীয় সম্পর্কে ভূমি সংস্কার বোর্ডে চিঠি লেখা হয়। ভূমি সংস্কার বোর্ড তারও অনেকদিন পর ভূমি মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবহিত করে। দেশের প্রায় সব জেলায় ভূমি সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রেই এ ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে।”

এ প্রসঙ্গে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জনেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, সরকারি জিপি, এজিপিরা আন্তরিক না হওয়ায় সরকার ভূমি সংক্রান্ত মামলায় হেরে যায়।”

তিনি বলেন, “সরকারি কৌঁসুলিরা মামলার আইনগত দিকগুলো উপস্থাপন করে না। অন্যদিকে, এসি ল্যান্ড বা মামলা সংশ্লিষ্টরা মামলার সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না বলেও সরকার ভূমি সংক্রান্ত মামলায় হেরে যায়।”

জানতে চাইলে সরকারি কৌঁসুলি ফকির দেলোয়ার হেসেন বলেন, “সরকার মামলায় হেরে যাচ্ছে দেখেই বুঝতে হবে আইনের শাসন ঠিকমতো কায়েম হচ্ছে।”

জিপি, এজিপি আন্তরিক নয়- এমন অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, “মামলা ত্রুটিযুক্ত হলে জেতা সম্ভব নয়।”

তিনি বলেন, “আমাদেরকে নিয়ে সমালোচনা হওয়া ভালো, সমালোচনা না থাকলে কাজ ভাল হয় না।”

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠি: মামলার রায় হওয়ার পরও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকৃত সময়ে আপিল না করায় বেশিরভাগ মামলাই তামাদি হয়ে যাচ্ছে। এসব মামলা ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত পড়ে থাকার পর ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও এগুলো নিয়ে উচ্চতর আদালতে আপিল নির্দিষ্ট সময়ে আপিল করা হচ্ছে না। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারি সম্পত্তি বেহাত হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মামলার রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিল করার সুযোগ থাকার পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে না। মামলার রায় ঘোষণার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রায়ের নকলের জন্য আবেদন করার প্রয়োজন। রায়ের নকলের জন্য আবেদন করার তারিখ থেকে রায়ের নকল পাওয়ার তারিখ পর্যন্ত ব্যয়িত সময় আপিল করার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গণনা করা হয় না।

এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, রায়ের নকল পাওয়ার পর আপিলের যৌক্তিকতা তথ্য, উপাত্ত, প্রমাণসহ রায়ের নকল এবং মামলা দায়ের বিলম্ব হলে বা তামাদি আইন দ্বারা রক্ষিত হওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্বের যথাযথ কারণ এবং বিলম্বের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

এছাড়া যে শাস্তি দেয়া হবে তার বর্ণনাসহ সলিসিটর অফিসে আপিলের জন্য পাঠাতে হবে। সরকারের পক্ষে যথেষ্ট কারণ ও যুক্তি থাকা সত্ত্বেও কেবল জবাব উপস্থাপনের অভাবে অনেক মামলার রায় বিপক্ষে যায়।

চিঠিতে বলা হয়, আদালতে সরকার পক্ষে কৌঁসুলি উপস্থিত না থাকায় কোনো কোনো সময় একতরফা রায় হয়। সে কারণে মামলার কার্যক্রম বিভিন্ন স্তরে পরিবীক্ষণের জন্য মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া উচিত।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুক্তি: ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, সরকারের বিপক্ষে
রায় হওয়ার প্রধান কারণ হলো মামলার আনুষঙ্গিক কাগজপত্র সরবরাহ করতে না পারা। এছাড়া যথাসময়ে আপিল করার ব্যবস্থা না করা এবং দীর্ঘদিনের তামাদি হওয়া সিএস, এসএ, আরএস জরিপের সরকারি খতিয়াস যথাযথভাবে সংরন না করা।

এছাড়া ডিসি অফিস, জিপি অফিস ও সলিসিটর উইংয়ের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় না থাকা জেলা পর্যায়ে মামলার দূর্বল তদারকি।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রশাসন) আবদুর রউফ বলেন, জিপি, এজিপির উপর ভূমি মন্ত্রণালয়ের কোনো নিযন্ত্রণ না থাকায় এবং তাদের কোনো জবাবদিহিতা থাকে না। এ কারণে সরকারি কৌঁ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।