গুম ২৪, রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৬৯

সদ্য গত হয়ে যাওয়া বছর ২০১২ সালজুড়েই দেশবাসী অসংখ্য গুম, গুপ্তহত্যা, ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যার খবরে আতকে উঠতে হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ প্রকাশিত ২০১২ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গোটা বছরে ২৪ জন গুম হয়েছেন। আর রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ দিতে হয়েছে ১৬৯ জনকে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুম হওয়া ২৪ জন সম্পর্কে বলা হয়েছে- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আর তাদের খোঁজ পায়নি পরিবার।

এছাড়া ২০১২ সালে ৭০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যদিও এ সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম। তবে এর বিকল্প হিসেবে গুম আবার ফিরে এসেছে এবং গুমের শিকার নিহত ব্যক্তিরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে মনে করছে অধিকার।

২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক আনসারকে রাজধানীর বনানী এলাকার রাস্তা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উঠিয়ে নিয়ে যায় বলে তার পরিবার অভিযোগ করে।

ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর দাবি, সরকারের কোনো বাহিনীই তার স্বামীকে ধরে নিয়ে গেছে।

গত বছরের ৪ এপ্রিল গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির সংগঠক আমিনুল ইসলামকে (৪১) আশুলিয়া থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা ধরে অজ্ঞাত জায়গায় নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডে ৫৩ জন ক্রসফায়ারে, ৭ নির্যাতনে, ৮ জন গুলিতে নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আর গত বছর র‌্যাবের ক্রসফায়ারে মারা গেছে ৪০ জন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের বৈঠকে বাংলাদেশে সব ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের অঙ্গিকার করলেও এরপর থেকে প্রতি বছরই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলেই আসছে।

ফলে মানবাধিকার সমুন্নত রাখা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের প্রশ্নে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মানবাধিকার কর্মীদের কাছে দেয়া তার নিজের অঙ্গীকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে নিহত ৭০ জনের মধ্যে ১ জন বিএনপিকর্মী, ১ জন নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, ৩ জন গণমুক্তি ফৌজের সদস্য, ২ জন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (লাল পতাকা) সদস্য।

অধিকারের ওই প্রতিবেদন তথ্যানুযায়ী ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭২ ব্যক্তি বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে নিহত হয়েছেন ৭ জন, যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছেন এবং ৬৫ জন নির্যাতনের শিকার হয়ে বেঁচে আছেন।

সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা পরিস্থিতি নিয়ে ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০১২ সালে ৫ জন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ১৬১ জন। এছাড়াও মৃত্যুহুমকি আর আক্রমণের শিকার হওয়ার ঘটনাতো রয়েছেই।

গত ৩ বছরের মধ্যে ২০১২ সালেই সর্বাধিক সংখ্যক সাংবাদিক নিহতের ঘটনা ঘটেছে। এই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিকে নৃসংশভাবে হত্যা করা হলেও আজ পর্যন্ত তার কোনো সুরাহা হয়নি।

১৩ ডিসেম্বর এ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিজামুল হক নাসিমের সঙ্গে বেলজিয়াম প্রবাসী একজন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞের মধ্যে স্কাইপি কথোপকথন প্রকাশের জন্য দৈনিক আমার দেশ এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও প্রকাশক হাশমত আলীর বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করা হয়।

অন্যদিকে ২০১২ সালে নারীর প্রতি সহিংসতা চরম আকার ধারণ করে। অধিকারের প্রতিবেদনে ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮০৫ জন নারী ও মেয়ে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এদের ৪৭৩ জনই শিশু বলে জানা গেছে। এই সময়কালে ১০ জন শিশু আত্মহত্যা করেছে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের কাছে ধর্ষণের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

অধিকারের তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮২২ জন বিবাহিত নারী যৌতুক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এদের ২৭৩ জনকে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়।

এছাড়া ৫৩৫ জন বিবাহিত নারী বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যাদের মধ্যে দুজন নারী বাল্য বিবাহের শিকার। এই সময়ে ১৪ জন বিবাহিত নারী যৌতুকের কারণে আত্মহত্যা করেছেন।

২০১২ সালে ১০৫ জন এসিডদগ্ধ হয়েছেন বলেও জানানো হয়েছে।

গত বছর শেষ হয়েছে বহুল আলোচিত বিডিআর হত্যা মামলার বিচার। ২০০৯ সালের ২৫ এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় ঢাকাসহ সারা দেশে বিভিন্ন ইউনিটের জওয়ানদের বিরুদ্ধে দায়ের ২২টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।

২০১২ সালে ধর্মীয় ও ক্ষুদ্রজাতিসত্ত্বার অধিকারী সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে বলেও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতায় বছরটিতে মারা গেছে ১৬৯ জন। সভা-সমাবেশের অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়েছে অনেক রাজনৈতিক গোষ্ঠী।

বছরটিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতার অভাব দেখা গেছে আগের তুলনায় বেশি। সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ এর সংশোধনী বিল ২০১২ সংসদে পাশ হলেও এর প্রয়োগে দেখা যায়নি বিশেষ কোনো তৎপরতা।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।