শুক্রবার, অক্টোবর 29, 2021
শুক্রবার, অক্টোবর 29, 2021
শুক্রবার, অক্টোবর 29, 2021
spot_img
Homeবিনোদনবেবী নাজনীন সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছেন

বেবী নাজনীন সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছেন

পেশাদার শিল্পী হিসেবে প্রায় ৩৫ বছর পার করলেন বেবী নাজনীন। দীর্ঘ এই শিল্পীজীবনে রয়েছে অসংখ্য অর্জন। কোটি বাঙালির ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে গেয়ে চলেছেন এখনো। ব্ল্যাক ডায়মন্ডের সেসব না জানা গল্প শোনাচ্ছেন সোহেল অটল ১৩ সংখ্যাকে অপয়া মনে করা হয়। তেরোকে গেরো মনে করার অনেক কারণ আছে? এই ‘আনলাকি থার্টিন’ ব্যাপারটির প্রচলন ক্রিকেটে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। আমাদের যাপিত জীবনেও ‘আনলাকি থার্টিন’ এর প্রভাব কম নয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো বেবী নাজনীনের জীবনে ১৩ মানেই আনলাকি নয়; বরং উল্টোটা।

বেবীর বয়স যখন ১৩ বছর, তখন শিশুশিল্পী হিসেবে জিতে নেন তিনটি জাতীয় পুরস্কার। একই সময়ে তিনি শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশ বেতার ঢাকার তালিকাভুক্ত হন। আর তার জীবনের টার্নিং পয়েন্টের সাথে যে স্বপ্নপুরুষের অবদান জড়িয়ে আছে, সেই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কল্যাণে বেবী পরিবারসহ ঢাকায় স্থানান্তর হন ওই ১৩ বছর বয়সেই। এখানেই তার তেরোর কারিশমা শেষ নয়। আজকের বেবী নাজনীন হয়ে ওঠার পেছনে বেবী নাজনীনের ১৩ বছর বয়স এক বিশাল ক্যানভাস। বেবী নাজনীন থেকে ব্ল্যাক ডায়মন্ড হয়ে ওঠার গল্পের পরতে পরতে ওই ১৩টা তাই ভীষণ রকম ‘পয়া’ হয়ে আছে।

প্রকৃতি সবার মধ্যেই মেধা সঞ্চার করে থাকে। তবে সবাই সঠিক চর্চা করতে পারে না। বেবীর প্রতিভার সঠিক চর্চা সম্ভব হয়েছিল বাবা মনসুর সরকারের কারণে। ১৯৬৫ সালের ২৩ আগস্ট সীমান্ত শহর সৈয়দপুরে জন্ম নেন বেবী নাজনীন। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। বাবা মনসুর সরকার একজন যন্ত্রশিল্পী। বাঁশি বাজাতেন, গানেরও শিক তিনি। রংপুর ও পরে ঢাকা বেতারের নিজস্ব শিল্পী হিসেবে দীর্ঘ দিন কাজ করে গেছেন। তার অনেক ছাত্রছাত্রী ছিল। তারা গান শিখতে এলে বেবীকেও বাবা হারমোনিয়াম নিয়ে বসাতেন। মেয়ের গায়কী গুণের বিষয়টি বুঝেছিলেন তিনি। সিদ্ধান্ত নেন তাকে তৈরি করবেন শিল্পীরূপে। তাই স্কুলে যাওয়ার আগেই বেবী নাজনীনের সঙ্গীতচর্চা শুরু। পড়া আর নিয়মিত গান চর্চা না করলে বেবীর খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলা বন্ধ করার নিয়ম ছিল তার জন্য।

নিয়ম না মানায় মাঝে মধ্যে বাবার মারও খেতে হতো; কারণ বেবী ছিলেন দুরন্ত। দল বেঁধে ছুটে বেড়ান, আড্ডা দেয়া তার প্রতিদিনের রুটিনে পড়ত। যার মাত্রা ছিল লেখাপড়া ও গানচর্চার চেয়েও বেশি; যে কারণে তার জন্য পরিবারে আইন প্রবর্তন করেন তার বাবা। অবশেষে সঙ্গীতের দীায় বেবী নিজেকে নিয়োজিত করতে বাধ্য হন।

উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের দখল তাকে সব ধরনের গান গাইতে শিখিয়ে দেয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় বেবী নাজনীন হয়ে ওঠেন রংপুর শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশুশিল্পী। পল্লীগীতি, লালনগীতি, নজরুল সঙ্গীতে অসাধারণ প্রতিভাদৃপ্ত শিশুশিল্পী ‘বেবী’ রংপুর বেতারের নিজস্ব শিল্পী হয়ে গেলেন শুধু স্বকীয় গুণেই। রংপুর ছেড়ে তার নাম তখন অনেক দূর ছড়িয়েছে। জাতীয় শিশুশিল্পী প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য ঢাকায় ডাক পড়ে তার। সারা দেশ থেকে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে কয়েক হাজার শিশুশিল্পী। বাবার হাত ধরে ঢাকায় এলো প্রতিযোগিতা করতে। সঙ্গীতের তিনটি বিভাগÑ পল্লীগীতি, লালনগীতি ও নজরুল সঙ্গীতে অর্জন করলেন শ্রেষ্ঠ জাতীয় শিশুশিল্পীর পুরস্কার। তখন বেবীর বয়স ১৩ বছর।

এখানে আরেকবার উল্লেখ করতে হয়, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম। দূরদর্শী এই রাষ্ট্রনায়ক সেই দিন ছোট্ট বেবীর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন ভবিষ্যৎ সম্পদ। ছোট্ট বেবীর সঙ্গীতে সেই দিন মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। বুঝেছিলেন সুযোগ পেলে এই মেয়ে অনেক দূর যাবে। বেবী নাজনীনকে মেয়ে বলে সম্বোধন করলেন তিনি। বিশেষ ব্যবস্থায় বেবীর পরিবারকে ঢাকায় নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। সপরিবারে রংপুর ছেড়ে ওই বছরই ঢাকায় চলে এলেন তারা। বাবা যোগ দিলেন ঢাকা বেতারে। রংপুর গার্লস স্কুল থেকে বেবী নাজনীনকে ভর্তি করা হলো ঢাকার ধানমন্ডি গার্লস স্কুলে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বা সময়ও হয়নি বেবীর। ঢাকা বেতার-বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী হয়ে বেবী নাজনীনের ক্যারিয়ার শুরু তখনই। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে গেলেন বেবী নাজনীন। তিনি বললেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি বুঝেছিলেন আমার সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তিনি তাই কার্পণ্য করেননি। তার ঋণ শোধ হওয়ার নয়।’

অপয়া তেরোর গল্প ঘুরেফিরেই আসে। ওই বয়সেই ১৯৭৮ সালে এহতেশামের লাগাম ছবিতে প্রথম গাইলেন বেবী নাজনীন। চলচ্চিত্রের গানে শক্তিমান পদযাত্রা শুরু হলো তার। প্রাণবন্ত পারফরম্যান্স ও বহুমুখী সঙ্গীত প্রতিভায় বেবী নাজনীন অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলেন। চলচ্চিত্র, বেতার, টেলিভিশন, স্টেজ মাধ্যমে বেবীকে তখন একযোগে গাইতে হতো। এসব সাফল্যে তার সমসাময়িক শিল্পীদের বদলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলেন তার চেয়ে সিনিয়র শিল্পীরা। বেবী এসব নিয়ে মাথা ঘামাননি। নিরলস গতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠার পেছনেই নজর রেখেছেন তিনি।

১৯৮০ সালে অডিও মাধ্যমে গাইতে শুরু করেন তিনি। গীতালি রেকর্ড থেকে বেবীর কিছু মিশ্র অ্যালবাম প্রকাশিত হতে থাকে নিয়মিত। ওই সময় কয়েক হাজার বিজ্ঞাপন সঙ্গীতেও কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। ১৯৮৭ সালে কবি ও ব্যবসায়ী সোহেল অমিতাভের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন বেবী নাজনীন। তাদের একমাত্র ছেলে মহারাজ অমিতাভ। ১৯৮০ সালে লন্ডন যাত্রার মাধ্যমে বিদেশের মঞ্চে সঙ্গীতে প্রথমবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন বেবী নাজনীন। ১৯৮৮ সালে সারগামের প্রযোজনায় মকসুদ জামিল মিন্টুর সুর ও সঙ্গীতে বেবী নাজনীনের প্রথম সেলফ টাইটেল অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। এই অ্যালবামই বেবী নাজনীনকে জাতীয়ভাবে আরেকবার আবিষ্কার করে। বাম্পারহিট হয় অ্যালবামটি। দেশ-বিদেশে তার খ্যাতি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বেবী নাজনীন দখল করে নেন গানের ভুবনের একটি শক্তিশালী অবস্থান। এর মধ্যে ৩৫ বছরেরও বেশি বেবী নাজনীন তার স্বকীয়তার মাধ্যমেই এ অবস্থানকে দিনে দিনে আরো প্রসারিত করে গেছেন অবাক করা মাত্রায়। এ মাত্রাই তাকে বাংলাদেশের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সঙ্গীত তারকারূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে আজ।

জাতীয় প্রেস কাব বেবী নাজনীনের একক গজল সন্ধ্যার আয়োজন করে। এই গজল সন্ধ্যা বেবী নাজনীনকে মিডিয়ার সামনে নিয়ে আসে ব্যাপকভাবে। বেবী নাজনীনের সঙ্গীত জীবনের ২৫ বছরপূর্তিতে ১৯৯৭ সালে জাতীয় প্রেস কাব আবার বেবী নাজনীনের ওপেন এয়ার কনসার্টের আয়োজন করে।

বেবীর গানের সাফল্য আজ পর্যন্ত অব্যাহত আছে। এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন বেবী। ১৯৮৮ থেকে ২০১০ পর্যন্ত বিভিন্ন অডিও প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে বেবী নাজনীনের একক গানের অ্যালবাম ও সিডি প্রকাশিত হয়েছে ৪৯টি। দ্বৈত ও মিক্সড মিলিয়ে ৫০০ অডিও অ্যালবাম ও সিডি-ভিসিডি প্রকাশিত হয়েছে তার।

বেবী নাজনীন এখানেও অপ্রতিদ্বন্দ্বী; কারণ তার সিনিয়র ও সমসাময়িক শিল্পীদের অনেকেই এ সময়ে অডিও, চলচ্চিত্র ও স্টেজ মাধ্যম থেকে বিদায় নিয়েছেন নীরবে।

দেশের শীর্ষ সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে বেবী নাজনীন জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন অনেকবার। ১৯৯৫ ও ২০০৪ সালে বাংলাদেশের সেরা সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তিনি সর্বশেষ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া বিগত এ সময়ে বেবী নাজনীন দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন।

তবে পুরস্কারই শিল্পীর জীবনের চরম আরাধ্য হতে পারে না। এ কথা বিশ্বাস করেন বেবী নাজনীন নিজেও। তিনি বলেন, ‘ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কার পাওয়া অবশ্যই গর্বের। কিন্তু দেশ-বিদেশে অবস্থানরত আপামর বাঙালির যে ভালোবাসা আমি পেয়েছি, এর চেয়ে বড় পুরস্কার কিছু হতে পারে না। মানুষ ভালোবেসে আমাকে ব্ল্যাক ডায়মন্ড নাম দিয়েছে, এর চেয়ে বড় অর্জন আমি কোনটাকে বলব?’

ইদানীং চার দিকে গুঞ্জন বেবী নাজনীন সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মনে করি দেশের সঙ্কটময় মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা উচিত শিল্পীদের। তাই একজন শিল্পীও সমাজ বা রাজনীতির বাইরে নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি একটি রাজনৈতিক দলকে ছোটবেলা থেকেই পছন্দও করি। যদি কখনো প্রয়োজন হয় তাদের সাথে কাজ করতে কোনো আপত্তি নেই আমার।

তার এ উত্তরই বলে দেয় মঞ্চের রানী বেবী নাজনীনকে এবার হয়তো রাজপথের মিছিলেও খুঁজে পাওয়া যাবে দুর্দান্ত দাপটে।

 

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments