স্বজন হারানোর বেদনা ও শোক নতুন মাত্রা যোগ করেছে কক্সবাজারে স্বতস্ফুর্ত হরতালে

গত জুমাবার হাশেমিয়া মাদ্রাসা জামে মসজিদের মুসল্লিদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় সাঈদী মুক্তি পরিষদের ব্যানারে ডাকা শনিবার থেকে টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতালের ২য় দিন অতিবাহিত হয়েছে। প্রচলিত হরতালের বাইরেও স্বজন হারানোর বেদনায় পুরো কক্সবাজার জেলা ছিল যেন শোকে মুহ্যমান। একারণেই পুরো শহর জুড়ে নিরবতা ও নিস্তব্দতা হরতালে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মাঠে কোন পিকেটার ছিলনা বটে তবে কাউকেই দোকানপাট খোলতে দেখা যায়নি। শহরের প্রধান প্রধান সড়কের পাশে যেসব দোকানপাট ও বিপনীবিতান ছিল প্রায় সব দোকানই বন্ধ রাখতে দেখা যায় গতকালও। সবমিলে শনিবারের ন্যায় গতকাল রবিবারও পিকেটারের উপস্থিতি ছাড়াই পালিত হয়েছে হরতাল। তবে সকালের দিকে কক্সবাজার শহরতলীর কয়েকটি জায়গায় গাড়ির কাঁচ ভাঙ্গা দেখতে পাওয়া যায়। রিকশা ও ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক মাঝে মধ্যে চললেও দূরপাল্লার যানবাহন ছাড়েনি। বন্ধ রয়েছে বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সাধারণ জনগন বলাবলি করছে, “একেই বলে হরতাল, পিকেটিং লাগেনা বরং সবার সমর্থনে সব কর্মকান্ড স্তব্দ রাখাই হরতাল।” দুপুরের কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলতে দেখা গেছে। তবে জুমাবারে পুলিশ কর্তৃক মানুষ হত্যার মত ঘটনার আতঙ্ক এখনো কাটেনি। প্রশাসনের কড়া নজরদারীর কারণে সাধারণ লোকজন স্বাভাবিকতই কিছুটা আতঙ্কিত ছিল। ইদগাঁও এলাকায় খোজ নিয়ে জানা যায়, হরতালের দ্বিতীয় দিন রবিবার সকালে গাড়ি পুড়িয়েছে হরতাল সমর্থকরা। ১৭ ফেব্র“য়ারী সকাল ৮টায় ইসলামপুর ইউনিয়নের মহাসড়কের চাকার দোকান নামক স্থানে একটি ম্যাজিক গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় মটর সাইকেল আরোহী ক’জন লোক। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ির নাম্বার (চট্টমেট্টো-চ১১-২২১৫)। গাড়িটি খুটাখালী গর্জনতলীর মনজুর আলমের বলে জানা গেছে। গাড়ির ড্রাইভার মোহাম্মদ ইয়াছিন জানান, সকালে গাড়িতে যাত্রী নিয়ে ঈদগাঁওর উদ্দেশ্যে আসছিলেন। এ সময় নাপিতখালী চাকার দোকান বরাবর পৌঁছলে তিনটি মোটর সাইকেলের ৬ জন আরোহী গাড়িটি গতিরোধ করে। পরে তারা ড্রাইভারকে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয় এবং পেট্টোল ঢেলে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহুর্তেই গাড়িটি আগুনে ভস্মিভূত হয়। পরে তারা সাবেক চেয়ারম্যান অছিয়র রহমানের রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে ঈদগাঁও তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও খোঁজ খবর নেন বলে জানা যায়।
এদিকে সকালে সদরের ঈদগাঁওতে পিকেটাররা মিছিল বের করতে চাইলে পুলিশী বাধায় তা হতে পারেনি। এরপরও ঝনঝনি ব্রিজ এলাকা, ডুলাফকির মাজার সড়ক এলাকা ও নাপিতখালী বটতলী এলাকায় সকাল থেকে পিকেটিং হয়েছে বলে জানান ঈদগাঁও সাংগঠনিক উপজেলা শিবির সভাপতি লায়েক বিন ফাজেল। রবিবার অফিস খোলার দিন হলেও হরতালের কারণে সরকারী বেসরকারী প্রায় অফিসেই লোকজন চোখে পড়ার মতো ছিলনা। তবে চলমান পরীক্ষা হরতালের আওতামুক্ত রাখায় যথাসময়ে পরীা শুরু হয়েছে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বাবুল আকতার জানিয়েছেন, হরতালে রবিবার সকাল থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এরপরও নাশকতা এড়াতে কক্সবাজার শহর জুড়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। মাঠে রয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এদিকে হরতাল চলাকালে তুলকালাম কান্ড ঘটায় চকরিয়া থানা পুলিশ। কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে আল্লামা সাঈদী ভক্ত মুসল্লি নিহত হওয়ার প্রতিবাদে আল্লামা সাঈদী মুক্তি পরিষদ ও ওলামা মাশায়েকের ডাকা ৪৮ঘন্টা হরতালের প্রথম দিনে চকরিয়ায় সাধারণ মুসল্লিরা একটি সিএনজি টেক্সী ভাংচুরের গুজবকে  কেন্দ্র করে গতকাল ১৬ ফেব্র“য়ারী শনিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে পুলিশ-জনতার মুখোমুখি সংঘর্ষের এ ঘটনা ঘটেছে। এসময় পুলিশের গুলিতে অর্ধশতাধিক গ্রামবাসী ও হাফেজ  খানার ছাত্র আহত হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে চকরিয়া পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের জনতা মার্কেট-বাঘগুজারা সড়কের হালকাকারা জালিয়া পাড়া এলাকায়। স্থানীয় জনগন অভিযোগ করেছেন, পুলিশ বিনা উস্কানিতে এলাকাবাসী ও হাফেজ খানার ছাত্রদের উপর এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ করলে পুরো এলাকা রণেক্ষেত্র পরিনত হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসীর মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
প্রত্যদর্শী সুত্রে জানা গেছে, পৌরসভা এলাকার হালকাকারা বিমান বন্দর পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সামনে বেতুয়া বাজার সড়কের উপর  গাড়ী ভাংচুরের  গুজব শুনে চকরিয়া থানার একদল পুলিশ তিনটি জীপ গাড়ী যোগে গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে হালকাকারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে পৌছার পর পরই ব্যাপক ফাঁকা গুলি বর্ষন করলে জালিয়া পাড়ার নারী পুরুষদের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে  পুলিশদল গাড়ী থেকে নেমে  সড়কের পাশে থাকা হজরত ওমর ফারুক এবতেদায়ী মাদ্রাসা এতিমখানা ও হেফজখানায় ঢুকে ছোট ছোট ছাত্রদের উপর  এলোপাড়াড়ি মারধর ও তাদের উপর রাবার বুলেট ছোড়ে। এ সময় ছাত্র-ছাত্রীরা কান্নাকাটি ও চিৎকার শুরু করলে অভিবাবক ও স্থানীয় লোকজন হাফেজ খানার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ল্য করে এলাপাতাড়ি রাবার বুলেট ছোড়ে। এক পর্যায়ে  পুলিশ ঘরে ঘরে তল্লাশিও  ব্যাপক লুটতরাজ চালায়। এসময় পুলিশের মারধরে ৩০ জন গ্রামবাসী ও হেফজ খানার ২০ জন ছাত্র মারাত্বক আহত হয়েছে। আহত গ্রামবাসীরা হচ্ছে, মৃত বাচাঁ মিয়ার পুত্র আবদুল জব্বার (৩৫), দেলোয়ার হোছেনের পুত্র মফিজ (৩০), ছৈয়দ আলমের পুত্র আবদুল হাকিম (৪০), খোরশেদ মাঝির পুত্র  আলাউদ্দীন মাঝি (৪০), নুর মোহাম্মদের পুত্র মোহাম্মদ কাশেম মাঝি(৩৫), মৃত আবদুল মজিদের পুত্র মোসলেম উদ্দিন (৪০) সহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে অনেককে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে হেফজ খানার আহত ছাত্ররা হচ্ছে, জমির উদ্দিন(১০), সাজ্জাদ হোসেন(৮), লাদেন(১২), মামুনুর রশীদ(১০), ইমন(১০), সিরাজুল ইসলাম(১১), নয়ন(১৫), মোঃ হোছাইন(১২), মোঃ সাকিব(৮), মোঃ মোজাহিদ(১৩) বোরহান উদ্দিন(৮), ইয়াছিন(৭), মোঃ রাকিব(১২), মোঃ সাগর (১০), আমজাদ হোসেন(১৪), মোঃ বাপ্পি(১০) সহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে। আহতরা বর্তমানে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। স্থানীয় আবুল কাশেম ও তছলিমা বেগম জানান, সকাল সাড়ে আটটার দিকে পুলিশের গুলির শব্দে আতংকিত স্থানীয় লোকজন ঘটনা আচঁ করতে রাস্তার উপর গেলে কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই পুলিশ জনতার উপর গুলিও রাবার বুলেট ছোড়ে। এ সময় লোকজন আত্মরার্তে দিকবিদিক পালাতে থাকে। এসময় পুলিশ বিনা উস্কানিতে পাশ্ববর্তী হাফেজ খানায় হামলা চালায়। এদিকে পুলিশের এধরনের ন্যাক্কারজনক হামলা সরকারের ভাব মূর্তি ক্ষুন্ন করার অপপ্রয়াস বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চকরিয়া থানার ওসি রনজিত বডুয়া জানান, বেতুয়া বাজার সড়কে শিবির কর্মীরা ব্যারিকেট দিয়ে গাড়ী ভাংচুরের ঘটনা শুনে পুলিশ ওই এলাকায় যায়। এসময় স্থানীয় লোকজনের সাথে পুলিশের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১২রাউন্ড ফাকা রাবার বুলেট বর্ষণ করেছে। এছাড়া হরতাল চলাকালে চকরিয়ার আর কোথাও কোন ধরণের অঘটন ঘটেনি। সকাল থেকে কিছু সিএনজি ও টমটম গাড়ি ব্যতিত দূর পাল্লার যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়নি। হরতালে পূর্ণ সমর্থন জানানো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির ও ইসলামী ঐক্যজোট কক্সবাজার জেলার নেতৃবৃন্দ হরতাল আহ্বানকারী সাঈদী ভক্ত মুসল্লি ও হরতালে সমর্থন দিয়ে হরতালকে সাফল্যমন্ডিত করে তোলায় সাধারণ জনগনকে মোবারকবাদ জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেন, মানুষ হত্যা করে এই জুলুমবাজ সরকার মতা চিরস্থায়ী করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা তা কখনো হতে দিবেন না। আল্লামা সাঈদী মুক্তি আন্দোলন, ইসলাম নির্মুল প্রতিরোধ কমিটি ও সম্মিলিত ওলামা মাশায়েক পরিষদের উদ্যোগে গত জুমাবারের শান্তিপূর্ণ মিছিলে আওয়ামী পুলিশের গুলিতে কক্সবাজার পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের জামায়াত কর্মী আহমদ ছালেহ, ৫নং ওয়ার্ডের শিবির নেতা তোফায়েল, ইসলামপুরের জামায়াত কর্মী নুরুল হক ও মোহাম্মদ ফারুখ নিহত, ২ শতাধিক গুলিবিদ্ধ-আহত এবং ২ শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি স্বতস্ফুর্ত হরতাল পালনকারীদের মোবারকবাদ জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করেছেন জেলা আমীর মুহাম্মদ শাহজাহান, নায়েবে আমীর মাওলানা মোস্তাফিজুর রহমান, সেক্রেটারী জি.এম রহিমুল্লাহ, শহর জামায়াতের আমীর অধ্যাপক আবু তাহের চৌধুরী, এড. জাফর উল্লাহ ইসলামাবাদী ও সাইদুল আলম।

এক সাঈদী ভক্ত শিশু!
কারাগারে আটক জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির দাবীতে বিক্ষোভ কর্মসূচীর আয়োজন করে আল্লামা সাঈদী মুক্তি পরিষদ। জুমাবারের এ বিােভ কর্মসূচীতে অংশ নেয়ার জন্য শহরের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার সাঈদী ভক্ত লোকজন উপস্থিত হন। জুমার নামাজের পর থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এক বিভীষিকাময় অধ্যায় পার করে এসকল সাঈদী ভক্ত লোকজন। পুলিশের নির্বিচার গুলিতে শাহাদাত বরণ করে ৬ সাধারণ মুসল্লি যাদের সবাই ছিল সাঈদীর ওয়াজের ভক্ত এবং আল্লামা সাঈদীর প্রেমে পাগল। এ সময় দেখা গেছে, এক শিশু হাতে ‘মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নিঃশর্ত মুক্তি চাই’ লেখা প্লে-কার্ড ধরে রাস্তায় দাড়িয়ে আছে। আন্দোলনে অবুঝ এ শিশুর সংহতি দেখে বিবেকবান লোকদের নাড়া দিয়েছে। তাইতো পুলিশের মুহুর্মূহু গুলিবর্ষণ সত্ত্বেও এই সাঈদী ভক্ত শিশু মাঝ রাস্তাতেই দাড়িয়ে ছিল তার প্রিয় মানুষটির ছবি নিয়ে। সামনে পিছনে ২ পাল পুলিশ বাঁকা চোখে তাকালেও পাহাড়ের মত অনড় ছিল শিশুটি। একদিকে নিহতদের খবর কানে আসছিল অন্যদিকে প্রিয় মানুষটির মুক্তির অপোয় রাজপথে দাড়িয়ে এভাবেই বিক্ষোভ জানাতে দেখা যায় শিশুটিকে। বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশ চড়াও হলেও শিশুটিকে তার প্রতিবাদে অনড় থাকতে দেখা গেছে। পুলিশের বুলেট টিয়ার শেলও তাকে ভীত করতে পারে নি। একে বলে সাঈদী ভক্তের প্রমাণ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।