সংলাপ: আয়োজনে সরকারের প্রতি আহ্বান বিএনপির

জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের বিষয় ঐকমত্য গঠনের জন্য বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের আয়োজনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি।
বুধবার রাতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটির স্থায়ী কমিটির সভায় গৃহীত প্রস্তাবে এ আহবান জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামুসজ্জামান দুদু স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়। তবে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের নতুন কোনো কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়নি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বক্তব্য সম্বলিত বিজ্ঞপ্তিটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সহিংসতা, হানাহানি, খুন, নিপীড়ন এবং আক্রমণাত্মক ও অশ্লীল মিথ্যা প্রচারণা বন্ধ করে সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে এনে জনগণের ভোটাধিকার রক্ষা ও শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে সব দলের অংশ গ্রহণভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের বিষয় ঐকমত্য গঠনের জন্য বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের আয়োজনের জন্য আবারো ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।

সভায় দেশের চলমান রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সভার প্রস্তাবে বলা হয়, সর্বক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতা, অপশাসন, দুঃশাসন, কুশাসন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্বশীলদের কাণ্ডজ্ঞানহীন উসকানিমূলক বক্তব্য ও হঠকারী আচরণ দেশকে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে।

সভায় বলা হয়, সর্বগ্রাসী সংকটে জাতি আজ হাবুডুবু খাচ্ছে। এমন সংঘাতপূর্ণ অনিশ্চিত পরিবেশ বাংলাদেশে এর আগে আর কখনো সৃষ্টি হয়নি। জাতীয় সম্পদের এমন নিষ্ঠুর লুণ্ঠন, এমন নির্লজ্জ জঘন্য দলীয়করণ এবং এমন বর্বর পৈশাচিক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কোনো অভিজ্ঞতা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মানুষের আর কখনো হয়নি।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয় স্থায়ী কমিটি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করে যে, সরকারের এই দুঃশাসন ও সর্বব্যাপী ব্যর্থতার প্রতিবাদে সারা দেশের মানুষ যখন ক্ষোভে ফেটে পড়েছে এবং বিরোধী দল যখন দেশবাসীর অধিকার, জাতীয় স্বার্থ ও গণতন্ত্র রক্ষায় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন গড়ে তুলছে সেই সময় গণবিচ্ছিন্ন সরকার আরো অস্থির ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

তারা বলেন, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তারা দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর মতো ব্যবহার করে গণহত্যা চালাচ্ছে, একইসঙ্গে দলীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্যে জনগণের ওপর হামলায় নামিয়ে দেয়া হয়েছে। সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রায় সরাসরি সশস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে। বিরোধী দলের জাতীয় নেতৃবৃন্দের ওপরেও সরাসরি গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে। মিছিল, সমাবেশ থেকে নারীদেরকে পর্যন্ত ধরে নিয়ে তাদের ওপর দৈহিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।

তারা অভিযোগ করেন, জিজ্ঞাসাবাদের নামে দীর্ঘ সময়ের জন্য রিমান্ডে নিয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সম্মানিত নাগরিকদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় এবং বিরোধী দলের বিরুদ্ধে তা অপপ্রচারের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা বর্তমান সরকারের এ জঘন্য কু-অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের সক্রিয় নেতা-কর্মীদের মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে জাতীয় স্থায়ী কমিটি বলেছে, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব থেকে শুরু করে সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে পর্যন্ত হাস্যকর সব মিথ্যা অভিযোগে বারবার গ্রেফতার করা হচ্ছে। দেশের কারাগারগুলোর ধারণ ক্ষমতার তিনগুনেরও বেশি লোক এখন আটক রাখা হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই বিরোধী দলের নেতাকর্মী। বর্তমান সরকার সারা দেশটাকেই আজ কারাগারে পরিণত করেছে।

স্থায়ী কমিটি অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের মিথ্যা মামলায় আটক করে তাদের বিরুদ্ধে সরকারি দলের নেতা ও মন্ত্রীদের পাশাপাশি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা পর্যন্ত প্রকাশ্যে মিডিয়ায় রাজনৈতিক ধাঁচের উসকানিমূলক বক্তব্য রাখছে। সরকার এই শৃঙ্খলা ও আইনভঙ্গ এবং এখতিয়ার বহির্ভূত অপতৎপরতায় মদত দিচ্ছে এবং তাদেরকে নানাভাবে পুরস্কৃত করছে।

বারবার সতর্ক করা সত্বেও প্রজাতন্ত্রের চাকুরিরত কিছু সদস্য জনগণ ও বিরোধী দলের বিরুদ্ধে দলীয় সন্ত্রাসীর মতো আচরণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তাদেরকে চিহ্নিত করে রাখার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসমূহ ও প্রশাসনের আইন মান্যকারী সদস্যদের প্রতি জাতীয় স্থায়ী কমিটি আহবান জানিয়েছেন।

জাতীয় স্থায়ী কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সরকার দেশে অঘোষিত একদলীয় বাকশাল পদ্ধতি প্রবর্তন করে গণতন্ত্রের নাম নিশানাও মুছে দিতে চায়। এই অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তারা এক অস্পষ্ট ও বেআইনি নির্দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সভা-সমাবেশ করার গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে। এমনকি দেশের বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপি’কে দোয়ার মাহফিল পর্যন্ত করতে বাধা দেয়া হয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় বেশির ভাগ সময়ে পুলিশ-র্যা ব দিয়ে কার্যত অবরোধ করে রাখা হচ্ছে। দলের পক্ষ থেকে যে নেতাই মিডিয়ায় কথা বলছেন, তাকেই মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে। বিরোধী দলের প্রতিটি কর্মসূচিতেই সশস্ত্রভাবে বাধা দেয়া হচ্ছে, হামলা চালানো হচ্ছে। জামিনে মুক্ত নেতা-কর্মীদের জেলগেট থেকে ধরে আবারো জেলে ঢোকানো হচ্ছে।

তারা অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের ঘোষিত কমসূচি প্রতিরোধ করতে সরকারি দল পুলিশ, র্যা ব, বিজেবি’র পাশাপাশি দলীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মাঠে নামাচ্ছে। তাদের সশস্ত্র হামলার চিত্র গণমাধ্যমে প্রচারিত হলেও গ্রেফতার করা হচ্ছে না। এমনকি বিরোধী দলের প্রচারপত্র ছাপা ও বিলিতে পর্যন্ত পুলিশ বাধা দিচেছ। এভাবে বিরোধী দলের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা কার্যত অসম্ভব করে তোলা হচ্ছে।

জাতীয় স্থায়ী কমিটি বলেছে, গত ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে অবস্থানরত হেফাজতে ইসলামের লাখ লাখ নেতা কর্মীকে হঠাতে আলো নিভিয়ে গভীর রাতে রক্তক্ষয়ী অভিযান চালাবার পর দেশে বিদেশে সরকার ভয়ঙ্কর চেহারায় আবির্ভুত হয়েছে। আর তা আড়াল করতে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে শাসক দলের বিভিন্ন নেতা বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপি এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এক ঘৃণ্য প্রচারাভিযান শুরু করেছে। গণহত্যাকারী সরকার এখন সন্ত্রাস, ধ্বংস ও হত্যার পথ ছেড়ে বিরোধী দলকে আলোচনা বসার হাওয়াই আহবান জানাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা বলছে, সংবিধান বদল করে ক্ষমতা থেকে নির্বাচন করার যে অসৎ ও গণবিরোধী পদক্ষেপ তারা নিয়েছে তা বহাল থাকবে এবং শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে। অর্থাৎ আলোচনার  কথা বলে আলোচনার সব পথ তারাই রুদ্ধ করছে।

হেফাজতে ইসলামের ৫ মের অবস্থান কর্মসূচি সকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকলে সরকার উৎখাত হয়ে যেত- এই হাস্যকর অজুহাতে তাদের ওপর গভীর রাতে নৃশংস অভিযান পরিচালনাকে জাতীয় স্থায়ী কমিটি কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারে না। ওই কর্মসূচিকে ঘিরে সরকারী দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হামলা, অগ্নিসংযোগ, গাড়ি ভাংচুরের ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ মিডিয়া ও বিরোধী দলের হাতেও রয়েছে।

বিএনপি কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম কিংবা সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে কখনো বিশ্বাস করে না। এগুলো আওয়ামী লীগেরই মজ্জাগত অভ্যাস। তারাই সরকার উৎখাতের জন্য ‘ট্রামকার্ড ষড়যন্ত্র’ করেছিল। তারাই বিগত দিনে লগি-বৈঠা সন্ত্রাসের মাধ্যমে তাদের ‘আন্দোলনের ফসল’ বলে একটি অসাংবিধানিক সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলো।

বিতর্কিত মন্ত্রীদের বাদ দিয়ে ভালোভাবে দেশ চালাবার জন্য দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত ৪ মের ঢাকার জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহবান জানিয়ে বলেছিলেন, জাতীয় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের ব্যাপারে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে আলোচনায় বসুন। এ ব্যাপারে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে চায়ের আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। সরকার সে আহবানে সাড়া না দিয়ে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেছে বলে জাতীয় স্থায়ী কমিটি মনে করে।

তারা অভিযোগ করেন, ইসলামী টিভি ও দিগন্ত টিভ বন্ধ, আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধের উদ্দেশ্যে ছাপাখানায় তালা দেয়া ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদককে গ্রেফতার-এর প্রতিবাদ করায় দৈনিক জাতীয় পত্রিকার ১৫ জন সম্পাদককে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এছাড়া দৈনিক যুগান্তরের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মালিকানার সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, টিভি টক শোতে সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে ভীতি প্রদর্শনমূলক বক্তব্য, ৯০ ভাগ নাগরিক তত্ত্ববধায়ক সরকারের পক্ষে এই জনমত জরিপ প্রকাশের দায়ে পত্রিকার সম্পাদক বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হচ্ছে।

এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্থায়ী কমিটি বলেছে, গণমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সরকার শৃংখলিত করেছে। এভাবে কোনো স্বৈরাচার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এখন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তার পরিবার ও সরকারের নানান অপকীর্তি ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ হয়ে পড়ছে।

বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণে সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জাতীয় স্থায়ী কমিটি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।

আগামী ৩০ মে সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের শাহাদৎবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের আহবান জানিয়ে জাতীয় স্থায়ী কমিটি বলেছে, শাসক দলের ইশতেহারের প্রতিফলনে বিতর্কিত কোনো বিচারকের পর্যালোচনা, ফরমায়েশি লেখকদের ইতিহাসের বিকৃতি ও সরকারি স্থুল অপপ্রচারনায় গণমানুষের হৃদয় থেকে শহীদ জিয়াকে মোছা যাবে না। এই বাংলাদেশই তার অবিনাশী স্মৃতিস্তম্ভ।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।