পোশাক কারখানায় ক্রেতা সেজে মার্কিন টিভির গোপন ক্যামেরা

মার্কিন টেলিভিশন সিবিএস নিউজ গোপনে বাংলাদেশের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় ঘুরে গিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করেছে। ওই চ্যানেলটির একটি প্রতিনিধি দল সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর ঢাকায় আসে এবং একটি কারখানায় ক্রেতা সেজে ভেতরের পরিবেশ গোপন ক্যামেরায় ধারণ করে এই নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করে। এমনিতেই নাজুক অবস্থায় থাকা দেশের পোশাক শিল্পকে আরো জটিল অবস্থায় পড়তে হতে পারে এই প্রতিবেদনের ফলে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেলিভিশনটির ওই প্রতিনিধি দল মন্ডে অ্যাপারেলস নামে একটি কারখানায় যান ক্রেতার ছদ্মবেশে। এই কারখানায় এক হাজার ৪শ’ কর্মী কাজ করেন।

কারখানাটিতে র‌্যাংলার নামে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য শার্ট এবং অ্যাসিক্স নামক অপর একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য খেলাধূলার পোশাক তৈরি করা হচ্ছিল।

এই ছদ্মবেশী সাংবাদিকরা কথা বলেন কারখানার ব্যবস্থাপক ও কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে। ব্যবস্থাপক তাদের জানান, তাদের কারখানায় ওয়ালামার্টের অনুমতি নেই। তবে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা ওয়ালমার্টের জন্য ১০ লাখ বক্সার শর্টস তৈরি করছেন।

সিবিএস’র প্রতিবেদনে বলা হয়, এ কারখানার প্রধান মাসুদুল হক চৌধুরী তাদের ভবনে ১৩টি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র আছে বলে জানান। তবে কোনোটিই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

কারখানাটির একটি ফ্লোরে কয়েকশ’ শ্রমিক কাজ করছিলেন। ম্যানেজার তাদের বলেন, ‘এর আয়তন প্রায় ১ লাখ বর্গ ফুট।’ কিন্তু এত বড় একটি ফ্লোরে মাত্র দুটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দেখতে পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

অন্যদিকে দুর্ঘটনার জন্য একটি জরুরি বের হওয়ার পথ থাকলেও সেখানে বেশ কিছু কার্টুন রেখে পথটি আটকানো আছে।

এছাড়া মাসুদুল হক চৌধুরী গর্বভরে বলছিলেন যে, তারা শিশু শ্রম অনুমোদন করেন না। ১৮ বছরের কমবয়সী কাউকে কাজে নিয়োগ দেন না।

কিন্তু ওই সাংবাদিক দলের প্রধান হলি উইলিয়াম তার প্রতিবেদনে বলেন, অথচ তারা সেখানে এমন কিছু কর্মীকে কাজ করতে দেখেছেন, যারা ১৮ বছরের নিচে বলে তাদের কাছে মনে হয়েছে।

কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের সঙ্গে মুক্তভাবে কথা বলতে না পেরে কাজের শেষে তারা এক ঘনবসতিপূর্ণ বস্তিতে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন বলেও প্রতিবেদনে প্রচার করা হয়।

এই সাংবাদিক বলেন, মন্ডে কারখানায় কাজ করেন এমন একজন মা ও তার মেয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন। তবে তারা ক্যামেরার সামনে আসেনি চাকরি হারোনোর ভয়ে। তারা তাকে বলছেন, প্রতিমাসে তারা মাত্র ৫০ ডলার (প্রায় চার হাজার টাকা) করে বেতন পায়।

মেয়েটি জানায়, তার বয়স মাত্র ১২ বছর এবং একটি ভুয়া জন্ম সনদে ১৮ বছর বয়স দেখিয়ে কারখানায় কাজ নেয় সে। কারণ তার পরিবার গরীব এবং তাদের টাকা দরকার।

কারখানার বসরা তার বয়স নিয়ে সন্দেহ করে কিনা প্রশ্ন করা হলে মেয়েটির মা বলেন, কারখানার বসরা তার মেয়ের বয়স কত হতে পারে তা ভালো করেই জানেন।

মেয়েটির মা আরো জানান, মন্ডে অ্যাপারেলস শ্রমিকদের পাওনা ঠিকঠাক আদায় করে না। তিনি বলেন, ‘গত মাসে আমি ২০ দিন কাজ করি কিন্তু তারা আমাকে মাত্র ১১ দিনের টাকা দেয়। এর কারণ জানতে চাইলে তারা আমাকে ধমক দেয়।’

তবে এতকিছুর পরও একটি চাকরি থাকায় তিনি সুখী। গত ছয় মাস ধরে কারখানায় কিছু পরিবর্তনও হয়েছে বলে জানান ওই মা। যেমন আগে কাজে ভুল করলে প্রহার করা হত। কিন্তু এখন তাদের প্রহার করা হয় না।

এ সপ্তাহের শুরুতে তারা তাদের এ তদন্তের কথা অ্যাক্সিস, র‌্যাংলার এবং ওয়ালমার্টের কাছে তুলে ধরে। এরপর এ তিনটি কোম্পানি বলে, এসব তথ্য যদি সত্য হয়, তাহলে তারা মন্ডে অ্যাপারেলসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে।

সিবিএস’র এই প্রতিবেদনে সাভারের রানা প্লাজা ধসে এবং তার আগে তাজরীন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যুর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়।

তারা বলে, বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা অহরহই ঘটে এবং এতে প্রাণহানিও হয় প্রচুর।

তবে অনেকের ধারণা, আমেরিকান ক্রেতারা যেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর পরিবেশ উন্নত করার ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে তাদের দেশের খুচরা বিক্রেতাদের উপর চাপ প্রয়োগ করে। সেজন্যই এ প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।