আজ জিয়াউর রহমানের ৩২তম শাহাদাৎ বার্ষিকী

আজ বৃহস্পতিবার সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমানের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী । ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে তিনি নিহত হন। দিনটি স্মরণে রাজধানীসহ সারাদেশে নানা কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠন। দলের প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাণী দিয়েছে বিএনপি। এতে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামুসজ্জামান দুদু বলেছেন, “জাতির এক চরম দুঃসময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কর্তৃক মহান স্বাধীনতার ঘোষনা, স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা এবং রাষ্ট্র গঠনে তাঁর অনন্য কৃতিত্বের কথা গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।”

কর্মসূচি
জিয়াউর রহমানের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসগুলো ১৪ দিনের কর্মসূচি নিয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টায় নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত ও কালো পতাকা উত্তোলন, একইভাবে সারাদেশে দলীয় কার্যালয়গুলোতে একই কর্মসূচি পালন করা হবে।

সকাল ১০টায় জিয়াউর রহমানের শেরে বাংলা নগর মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা ১৮-দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

একই সময় জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের উদ্যোগে মাজারে ফাতেহা পাঠ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া ড্যাব’র উদ্যোগে মাজার প্রাঙ্গণে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন খালেদা জিয়া।

বেলা ১১টায় নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ড্যাব’র উদ্যোগে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান ও ওষুধ বিতরণ করা হবে।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা মহানগর ও এর বাইরে তিনদিন ব্যাপী দুস্থদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হবে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় মহানগর বিএনপির উদ্যোগে ফার্মগেটের খামার বাড়ি থেকে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধনের মাধ্যমে এই কর্মসূচি শুরু করবেন খালেদা জিয়া। এরপর তিনি রাজধানীর অনেকগুলো স্পটেও খাবার বিতরণ করবেন।

দেশের অন্যান্য বিভাগীয় জেলা ও উপজেলা সদরে বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে একই ধরনের কর্মসূচি পালন করা হবে বলেও দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সৈনিক থেকে রাষ্ট্রপতি
শহীদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সপ্তম রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান ও একজন বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম। যিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ করেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন।

শহীদ জিয়ার জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলায়। তিনি করাচি একাডেমি থেকে ১৯৫২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৯৫৩ সালে করাচিতে ডি. জে. কলেজে ভর্তি হন।

১৯৫৩ সালে তিনি কাকুল পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশনপ্রাপ্ত হন। সেখানে দুই বছর চাকরি করে ১৯৫৭ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেছেন তিনি।

১৯৬০ সালে তিনি বেগম খালেদার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে খেমকারান সেক্টরে অসীম বীরত্বের পরিচয় দেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। বীরত্বের জন্য পাকিস্তান সরকার তাকে হিলাল-ই-জুরাত খেতাবে ভূষিত করে।

১৯৬৬ সালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে পেশাদার ইনস্ট্রাক্টর পদে নিয়োগ লাভ করেন। সেই বছরই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটার স্টাফ কলেজে কমান্ড কোর্সে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হয়ে জয়দেবপুরে সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদের দায়িত্ব লাভ করেন। উচ্চ প্রশিক্ষণের জন্য তিনি পশ্চিম জার্মানিতে যান।

১৯৭০ সালে একজন মেজর হিসেবে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদের দায়িত্ব লাভ করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে রাজধানী ঢাকায় পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর আক্রমণের পর জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে বিদ্রোহ করেন এবং ২৬ মার্চ তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।

জিয়াউর রহমান এবং তার বাহিনী সামনের সারি থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। তারা বেশ কয়েকদিন চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন।

তিনি সেনা সদস্যদের সংগঠিত করে পরবর্তীতে তিনটি সেক্টরের সমন্বয়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধপরিচালনা করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান, যুদ্ধ পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত এক নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও তারপর জেড-ফোর্সের প্রধান হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন। স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান যুদ্ধ পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ও তারপর জেড-ফোর্সের প্রধান হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমানকে কুমিল্লায় সেনাবাহিনীর ব্রিগেড কমান্ডার নিয়োগ করা হয় এবং ১৯৭২ সালের জুন মাসে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ-অব-স্টাফ নিযুক্ত হন। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিগেডিয়ার পদে এবং বছরের শেষের দিকে তিনি মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট জিয়াউর রহমান চিফ অফ আর্মি স্টাফ নিযুক্ত হন। ওই বছরের ৩ নভেম্বর বীর বিক্রম শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বাধীন ঢাকা ব্রিগেডের সহায়তায় বীর উত্তম মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান। ফলে ৬ নভেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং আবু সাদাত সায়েম বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হন। এরপর জিয়াউর রহমানকে চিফ-অব-আর্মি স্টাফ হিসেবে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় এবং গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমান ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে মুক্ত হন।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পর তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। ১৯ নভেম্বর ১৯৭৬ সালে তাকে পুনরায় সেনাবাহিনীর চিফ অফ আর্মি স্টাফ পদে দায়িত্বে প্রত্যাবর্তন করা হয় এবং উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব দেয়া হয়।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ৮ মার্চ মহিলা পুলিশ গঠন করেন, ১৯৭৬ সালে কলম্বোতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন সম্মেলনে যোগদান করেন এবং বাংলাদেশ সাত জাতি গ্রুপের চেয়ারম্যান পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

১৯৭৬ সালেই তিনি উলশি যদুনাথপুর থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন উদ্বোধন করেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৭৬ সালে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করেন, ১৯৭৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি একুশের পদক প্রবর্তন করেন। ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন জিয়া দেশে আবার গণতন্ত্রায়ণের উদ্যোগ নেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র চালুর সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জয়লাভ করেন। এরপর জিয়াউর রহমান মে মাসে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা এবং আস্থা যাচাইয়ের জন্য ৩০ মে গণভোট অনুষ্ঠান ও হ্যাঁ-সূচক ভোটে বিপুল জনসমর্থন লাভ করেন।

১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে প্রধান করে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠা করেন। ছয়টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বনিদ্বতা করেন। এই নির্বাচনে তিনি ৭৬ দশমিক ৬৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন এবং রাষ্ট্রপতির পদে নিয়োজিত থাকেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।