কক্সবাজারের উপকূলে পানিবন্দি মানুষের আহাজারী

শাহপরীরদ্বীপ, সেন্টমার্টিনদ্বীপ ও সাবরাংসহ টেকনাফের উপকূলীয় এলাকার পানিবন্ধী হাজার হাজার মানুষের আহাজারীতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ১১.৪০০ মেঃ টন চাল বরাদ্ধ করলেও এখনো দূর্গত মানুষেরা ত্রাণ পায়নি।
এসব এলাকার প্রায় ৬ হাজার পরিবারের গত এক সপ্তাহ ধরে চুলায় আগুন জ্বলছেনা। মাঝারী ও ভারী বর্ষন এখনও অব্যাহত রয়েছে। টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ শফিক মিয়া জানান, তিগ্রস্থদের তালিকা জমা না দেয়ায় ত্রাণ বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছেনা। সাবরাং ইউপি চেয়ারম্যান হামিদুর রহমান জানান, তিগ্রস্থদের তালিকা প্রস্তুতির কাজ চলছে।

টেকনাফ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার (পিআইও) জহিরুল ইসলাম জানান, তিগ্রস্থদের ১০ কেজি করে চাল দেয়ার নির্দেশনা থাকলেও তালিকা না আসায় তা বিতরণ করা যাচ্ছেনা। এদিকে টেকনাফের সর্বত্র মাঝারি ও হালকা বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পাহাড় ধ্বসের আশংকায় টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বসবাসরতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে যেতে ২৯ মে মাইকিং করেছে বলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহ মোজাহিদ উদ্দিন জানিয়েছেন। সাবরাং ইউপি চেয়ারম্যান হামিদুর রহমান জানান, বিধ্বস্থ বেড়ীবাঁধ দিয়ে সাগরের লোনা পানি ঢুকে শাহপরীরদ্বীপ ও সাবরাংয়ের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্ধি হয়ে পড়েছে। তম্মধ্যে অনেকে বসত বাড়ী ছেড়ে টেকনাফসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি ছাড়াও রবি শষ্য, পুকুর ও চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতি হয়েছে।

বিগত প্রায় ১০ বছর ধরে টেকনাফ উপজেলার উপকূলীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৪ টি ফোল্ডারের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ক না হওয়ায় বাঁধের বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন ভাঙ্গন ধরেছে। এদিকে সেন্টমার্টিদ্বীপের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মাওঃ ফিরোজ আহমদ জানান, দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের চতুর্দিকে হঠাৎ করে ভয়াবহ ভাঙ্গনে দ্বীপের বাসিন্দাগণ আতংকিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে ৫ দিনের টানা বর্ষণের সাথে পূর্ণিমার ‘জো’ মিলে প্রবল জোয়ারে সাগরের ঢেউয়ের আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে শাহপরীরদ্বীপ ও সাবরাং এর বেড়িবাঁধ। এতে উপকূলীয় এলাকার নিম্মাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ৩৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ইউএনও’র নির্দেশে পিআইও গত ২৮মে সরেজমিন তিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শন করেছেন। বাঁধের বিভিন্ন অংশে নতুন করে ভাঙ্গন ধরেছে। সাগরের ঢেউয়ের আঘাতে ভাঙ্গন এবং প্লাবিত হয়ে ২ শতাধিক পানের বরজ, শত শত একর রবি শস্য, ১৫টি চিংড়ি ঘের এবং প্রায় ১ হাজার বসত বাড়ির ব্যাপক তি হয়েছে। টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোঃ শফিক মিয়া ২৮ মে দুপুরে উক্ত তথ্য নিশ্চিত করে জরুরী ভিত্তিতে এলাকাবাসীর জানমাল রার্থে “ ইমার্জেন্সী ওয়ার্ক ”এর ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপরে প্রতি দাবী জানিয়েছেন।

তিনি আরও জানান- ২৫, ২৬, ২৭, ২৮ ও ২৯ মে টানা বর্ষণের সাথে পূর্ণিমার ‘জো’ মিলে সাগরের প্রবল জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৬/৭ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে । এতে গত ৮/১০ বছর ধরে ‘ইমার্জেন্সী ওয়ার্ক’ না করা য়প্রাপ্ত ও তিগ্রস্থ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৬৮নং ফোল্ডারের বেড়িবাঁধ ডুবে গিয়ে সাবরাং এর উপকুলবর্তী গ্রাম কচুবনিয়া, হারিয়াখালী, লাফারঘোনা, পুর্ব নয়াপাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় সাগরের জোয়ারের পানি ঢুকে বসতঘর,পানবরজ, রবিশষ্যের ব্যাপক তি সাধিত হয়েছে । তাছাড়া চিংড়ি ঘের ও পুকুর ডুবে গিয়ে কোটি কোটি টাকার মাছ ভেসে গিয়েছে । সাবরাং ৩নং স্লুইচ এবং টেকনাফ বিজিবি ক্যাম্পের পাশে নতুন করে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গিয়ে ব্যাপক তি হয়েছে । ইমার্জেন্সী ওয়ার্কের মাধ্যমে জরুরী ভিত্তিতে টেকনাফের উপকুলীয় বেড়িবাঁধ সংস্কার মেরামত করা সা হলে তা যেকোন সময়ে সম্পুর্ণ বিধ্বস্থ হয়ে জানমালের অপুরণীয় তি হওয়ার আশংকা প্রকাশ করেছেন । উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ শফিক মিয়া অতীতের সর্বকালের রেকর্ড অতিক্রম করে টেকনাফের উপকূলে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৭-৮ ফুট উচু  জলোচ্ছ্বাস হয়েছে । তার মতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতির খেয়ালে এমন হচ্ছে দাবী করে তিনি আরো বলেন- প্রকৃতির এ আচরণের উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চলের মানুষ আতংকিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে টেকনাফ উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শাহ মোজাহিদ উদ্দীনের নির্দেশে টেকনাফ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার (পিআইও) মোঃ জহিরুল ইসলাম গত ২৮ মে দুপুরে সরেজমিন শাহপরীরদ্বীপ ও সাবরাং তিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। বিকালে টেকনাফ ফিরে হাজার হাজার মানুষের পানিবন্দী এবং ভয়াবহ য়তির বর্ণনা দেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছেÑ শুধু শাহপরীরদ্বীপ ও সাবরাং নয়, টেকনাফ পৌর এলাকা, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নে তিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ডুবে গিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে ব্যাপক তি হয়েছে। গতকাল  সন্ধ্যায় এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত প্রবল বর্ষণ ও দমকা বাতাস অব্যাহত থাকায় জলোচ্ছ্বাস, প্লাবিত, পানিবন্দীসহ সেন্টমার্টিনদ্বীপের পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।