কাদের মোল্লার শুনানি মুলতবিতে বাধ্য হলেন প্রধান বিচারপতি:মানিক-রাজ্জাকের বিতর্ক

কবি মেহেরুন্নেসা হত্যাকাণ্ড নিয়ে তথ্যের ভিন্নতা তুলে ধরেন আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। এ নিয়ে তার সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন বিচারক এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিক। এভাবে একাধিকবার রাজ্জাকের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়লে আদালতে উত্তেজনা দেখা দেয়। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন একাধিকবার বিচারক মানিককে থামানোর চেষ্টা করেন।

এক পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও বিচারক মানিককে শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ফের ব্যারিস্টার রাজ্জাকের সঙ্গে তিনি বিতর্ক জড়িয়ে পড়লে প্রধান বিচারপতি শুনানি মুলতবি করতে বাধ্য হন।

বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ছয় সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আপিল শুনানিকালে এসব ঘটনা ঘটে।

তবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের সাজা বিষয়ে আসামিপক্ষের আপিল শুনানি অব্যাহত রয়েছে।

আজ কবি মেহেরুন্নেসা হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ বিষয়ে আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়েছে এবং তিন নং অভিযোগ খন্দকার আবু তালেব হত্যার অভিযোগ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়েছে।

প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের বেঞ্চে আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক যুক্তি পেশ করে বলেন, ‘কবি মেহেরুন্নেসা হত্যার অভিযোগ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ তিনজন সাক্ষী হাজির করেছে। তিনজন সাক্ষী তিন রকম সাক্ষ্য দিয়েছেন।’

তিনি আদালতকে বলেন, ‘২ নং সাক্ষী শহীদুল হক মামলা বলেছেন, তিনি জনতার কাফেলা থেকে এবং পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে শুনেছেন এ ঘটনা। ১০ নং সাক্ষী আব্দুল কাইউম বলেছেন অবাঙালিরা কবি মেহেরুন্নেসাকে হত্যা করেছে। অপরদিকে ৪ নং সাক্ষী কাজী রোজী ট্রাইব্যুনালে এসে আব্দুল কাদের মোল্লাকে জড়িয়ে এ ঘটনায় সাক্ষ্য দিলেও তার নিজের লেখা বইয়ের তথ্যের সঙ্গে ট্রাইব্যুনালে প্রদত্ত বক্তব্যের গরমিল রয়েছে।’

এ সময় রাজ্জাক বলেন, ‘তাহলে কার কোনো বক্তব্য আপনারা গ্রহণ করবেন? কাউকে কোনো অভিযোগে সাজা দিতে হলে সকলের সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে তাদের এভিডেন্স বিষয়ে একটাই উপসংহারে পৌঁছতে হবে। কিন্তু এখানে সবার সাক্ষ্য বিবেচনা করে একটা উপসংহারে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই এ অভিযোগে তাকে (কাদের মোল্লা) সাজা দেয়ারও উপায় নেই।’

এর আগে গত মঙ্গলবার শুনানির সময় ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘কবি মেহেরুন্নেসা হত্যা বিষয়ে সাক্ষী কাজী রোজী তার জবানবন্দির এক স্থানে বলেছেন, তিনি শুনেছেন এবং আরেক স্থানে বলেছেন তিনি দেখেছেন। এভাবে তিনি বিপরীতধর্মী সাক্ষ্য দিয়েছেন।’

আজ বৃহস্পতিবার শুনানির সময় রাজ্জাক আবারো এ বিষয়ের অবতারণা করলে বিচারক এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিক তাকে (রাজ্জাক) বলেন, ‘আপনি বলেছেন সাক্ষী একস্থানে বলেছেন তিনি দেখেছেন; আরেক স্থানে বলেছেন তিনি শুনেছেন। সাক্ষী ঘটনা দেখার কথা কোথায় বলেছেন, তা দেখান। ডিড শি সে শি স’ ইট? শো ইট।’

তখন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক সাক্ষীর জবানবন্দি পড়ে শোনাতে শুরু করেন। তিনি পড়েন, ‘সাক্ষী কাজী রোজী বলেছেন, ‘২৭ মার্চ বিকেলে খবর পেলাম যে, মেহেরুন্নেসা ও তার দুই ভাই ও মাকে কাদের মোল্লা ও তার সহযোগী যারা ছিলেন তাদের অনেকে মাথায় সাদা অথবা লাল পট্টি বেঁধে সকাল ১১টা মেহেরের বাসায় ঢুকে যায় বলে শুনেছি।’

রাজ্জাক পড়তে থাকেন, ‘আরেক জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘কাদের মোল্লার নেতৃত্বে সেদিন ওরা মেহেরুনের বাসায় ঢুকেছিল। কিন্তু কাদের মোল্লা নিজে ওই বাসায় ঢুকেছিল কিনা তা বলতে পারব না।’

সাক্ষীর জবানবন্দি থেকে রেফারেন্স পেশ শেষ করে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘এখানে তিনি ঘটনা এমনভাবে বর্ণনা করছেন, মনে হয় যেন তিনি নিজে ঘটনা দেখেছেন।’

এ সময় বিচারক এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী বলে উঠেন, ‘এখানে তিনি দেখেছেন তা কোথায় আছে? তিনি দেখেছেন একথা কি বলেছেন সাক্ষী?’

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক তখন বলেন, ‘হ্যাঁ বলেছেন। এটা আমার সাবমিশন। আপনি এর সঙ্গে একমত হতেও পারেন, আবার নাও পারেন। সেটা আপনার এখতিয়ার। কিন্তু আমাকে আমার সাবমিশন রাখতে দেন। আমি একজন কাউন্সেল।’

এ পর্যায়ে আদালতে কিছুটা উত্তেজনা দেখা দেয়। তখন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন বিচারক এএইচএম  শামসুদ্দীন চৌধুরীকে থামার ইশারা দেন এবং ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে চালিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘প্লিজ প্রসিড, প্লিজ প্রসিড মিস্টার রাজ্জাক।’

তখন বিচারক এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে লক্ষ্য করে বলেন, ‘প্লিজ ডোন্ট মিস লিড দি কোর্ট। কোর্টকে মিস লিড করবেন না। দিস ইজ দি হাইয়েস্ট কোর্ট অব দি নেশন। কোর্টকে মিস লিড করবেন না।’

এ সময় মানিক আবারো ব্যারিস্টার রাজ্জাকের কাছে জানতে চান সাক্ষী দেখার কথা বলেছেন তা কোথায় আছে, দেখান? তখন আবারো প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিকে দিকে তাকিয়ে তাকে থামার অনুরোধ করে বলেন, ‘মিস্টার জাস্টিস চৌধুরী প্লিজ, প্লিজ। এটা ব্যারিস্টার রাজ্জাক সাহেবের সাবমিশন।’

এরপর প্রধান বিচারপতি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে আবারো বলেন, ‘মিস্টার রাজ্জাক, প্লিজ প্রসিড।’

এ সময় ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বিচারক শামুসুদ্দীন চৌধুরীর প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলে প্রধান বিচারপতি তাকে বলেন, ‘সিঙ্গেল জাস্টিসকে এড্রেস করে সাবমিশন রাখবেন না। কোর্টকে এড্রেস করে সাবমিশন রাখুন, প্লিজ। প্লিজ প্রসিড, প্রসিড মিস্টার রাজ্জাক।’

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা তো শিখেছি কোর্টের কোনো একজন জাজ কোনো প্রশ্ন করলে সেটা কোর্টেরই প্রশ্ন হিসেবেই ধরে নেওয়া হয়। সেজন্য আমি তার জবাব দেয়ার চেষ্টা করছি।’

এ সময় বিচারক এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী আবারো ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের উত্তরের বিরোধিতা করে মন্তব্য করা অব্যাহত রাখেন এবং তার প্রশ্নের জবাব চাওয়ায় প্রধান বিচারপতি তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মিস্টার জাস্টিস চৌধুরী প্লিজ প্লিজ।’

কিন্তু তখনো বিচারক মানিক ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের সাবমিশনের বিরোধিতা করে তার মত প্রকাশ করতে থাকায় এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি কোর্ট মুলতবি ঘোষণা করেন।

এসব ঘটনার পর আদালত যখন মুলতবি করা হয়, তখন ঘড়ির কাটায় ১০টা বেজে ৫৫ মিনিট। সাধারণত সকাল ১১টায় আদালত মুলতবি হয় এবং ১২টায় আবার বসে। আজ বিতর্কের এ পর্যায়ে ১০টা ৫৫ মিনিটে আদালত মুলতবি ঘোষণা করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘১২টা আবার বসবে আদালত। যথারীতি ১২টায় আবার কোর্ট বসে।’

এর আগে বিতর্কের এক পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও একবার দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।

আদালতে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাককে যুক্তি উপস্থাপনে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট শিশির মো. মনির। আরো উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম, ফরিদ উদ্দিন খান, সাজ্জাদ আলী চৌধুরী প্রমুখ।

এদিকে, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগে ছয় সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ থেকে বৃহস্পতিবার বিচারক সিদ্দিকুর রহমান অবসর নিয়েছেন। চাকরির বয়স পূর্ণ হওয়ায় তিনি অবসরে যান।

আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ আজ তাকে বিদায় জানান। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এজে মো. আলী তাকে বিদায় সম্ভাষন জানান।

বিচারক সিদ্দিকুর রহমান ছিলেন আবদুল কাদের মোল্লার আপিল শুনানির জন্য গঠিত বেঞ্চের সদস্য। তার অবসর গ্রহণের ফলে এ বেঞ্চের সদস্য সংখ্যা এখন দাঁড়ালো পাঁচ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।