তুরস্কের চলমান বিক্ষোভের নেপথ্যে

তুরস্কের কেউই ভাবেনি যে একটি পার্কের গাছ রক্ষার আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এক নজিরবিহীন সরকার বিরোধী আন্দোলনে ও দাঙ্গায় পরিণত হবে।  শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের বল প্রয়োগ এবং প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তায়িপ এরদোগানের কড়া মন্তব্য জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’র (একেপি) নীতির ব্যাপারে অনেক তুর্কিকেই হতাশ এবং আতঙ্কিত করে তোলে।

পার্কের গাছ কাটার বিরুদ্ধে বিক্ষোভটি শুরু হওয়ার ৯ দিন পর তুরস্কের অন্তত ৪৮টি শহরে এ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত এক পুলিশসহ অন্তত তিনজন নিহত এবং কয়েকশ’ আহত হয়।

বিক্ষোভের সূচনাটি  হয়েছিল কিভাবে? গত ২৮ মে প্রায় ১০০ জন একটিভিস্ট গাজি পার্কে তাবু টানিয়ে অবস্থান ধর্মঘটের মধ্যদিয়ে এ বিক্ষোভটির সূচনা করে। একটি নগর উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে এই সবুজ পার্কটি ধ্বংসে সরকারি এক পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই তাদের শান্তিপূর্ণ এই অবস্থান।

কিন্তু ৩০ মে সকালে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে আচমকা টিয়ার গ্যাস এবং জলকামান ব্যবহার শুরু করে। এমনকি পুলিশ তাদের তাবু এবং জিনিসপত্র সব আগুনে পুড়িয়ে দেয়।

বিক্ষোভকারীদের অধিকাংশই ছিল স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী। পুলিশের হামলার পর তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের আরো কয়েকশ’ বন্ধু-বান্ধবদেরও ডেকে আনে এবং পুনরায় পার্কটির দখল নেয়। পর দিন পুলিশ আবারো অভিযান চালালে তার প্রতিবাদে এবার হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।

৩০ মে, শুক্রবার সকাল থেকে শুরু করে শনিবার বিকেল পর্যন্ত পুলিশ বিক্ষোভকারীদের তাকিসম চত্বরে ঢুকতে দেয়নি। এ সময় উভয়পক্ষে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলতে থাকে। শনিবার বিকেলে পুলিশ শেষ পর্যন্ত তাদেরকে তাকসিম স্কয়ার ছেড়ে দেয়।

বিক্ষোভকারীদের বেশিরভাগই ছিল তুরস্কে সেক্যুলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোক। এদর মধ্যে কতিপয় বামপন্থী দল এবং জাতীয়তাবাদীরাও ছিল। বিক্ষোভকারীরা টিয়ারগ্যাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য হেলমেট, শক্ত চশমা এবং চিকিৎসা উপকরণ নিয়ে রাস্তায় নামে।

কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত বল প্রয়োগের বিষয়ে বলতে গিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একজন জ্যেষ্ঠ তুর্কি গবেষক এমা সিনক্লেয়ার বলেন, ‘সহিংসতার দিক থেকে তুরস্কের পুলিশ নিজেরাই নিজেদেরকে ছাড়িয়ে গেছে’। অবশ্য সরকার এজন্য অবশ্য ক্ষমা প্রার্থনাও করেছে।

সরকার ঘেষা এক থিঙ্ক ট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর পলিটিক্যাল, ইকোনোমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ’র হাতেম ইতে বলেন, তুরস্কের বিরোধী দলগুলো দুর্বল হয়ে পড়ার কারণেই এ বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, গত ১০ বছরের ঘটনা প্রবাহে তুর্কি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে আতঙ্কি হয়ে পড়ে। এ সময়টাতে কতিপয় সামরিক, বিচারিক, মিডিয়া এবং ব্যবসায়ী চক্রের পায়ের নিচের মাটি সরে যায়।

‘একে পার্টির কিছু নীতিকেও তারা তাদের জীবন যাপনের ধরনের জন্য হুমকি মনে করে। এর ফলে একটি বিরোধী চেতনা গড়ে ওঠে। তবে বিরোধীরা তাদের এসব সামাজিক উদ্বিগ্নতার বিষয়কে রাজনৈতিক ময়দানের ইস্যুতে পরিণত করতে না পারলেও এবং তারা কোনভাবেই একে পার্টির সমকক্ষ না হলেও সমাজের এ শ্রেণীর উদ্বেগ দিনদিন বেড়েই চলেছে’ যোগ করেন হাতেম।

১৯৮০ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে তুরস্কের তরুণদের একটা ক্রমাগত বিরাজনীতিকরণ ঘটে। সেই তরুণদেরই একটি অংশ এবারের এই বিক্ষোভে রাস্তায় নেমে এসে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। কিন্তু কিসে তাদেরকে রাস্তায় নেমে আসতে অনুপ্রেরণা যোগালো?

২৮ বছর বয়সী কেরেম গেনকে নামক মার্কেটিংয়ের চাকরি করা এক তরুণ বলেন, ‘এই প্রথম কোনো বিক্ষোভে যোগ দিয়েছি আমি, তবে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নই।’

‘শুক্রবার গাজি পার্কে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের হামলার পরই আমি রাস্তায় নেমে আসি। বিক্ষোভ এখন যে রূপ ধারণ করেছে তাতে আমি খুবই খুশি। কারণ সরকার জনগণের লাইফ স্টাইলে হস্তক্ষেপ করতে চাচ্ছিলো’ যোগ করেন তিনি।

২৬ বছর বয়সী নিহান ডিঙ্ক নামে আরেক তরুণ নারী গণমাধ্যমকর্মী জানান, একে পার্টির অধীনে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে এসেছি আমাদের স্বাধীনতার জন্য। শ্বাস ফেলার একটা জায়গা খুঁজে নেয়ার জন্য। আমরা এখানে এসেছি প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া, মদ খাওয়া এবং কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই যে কোনো কিছু করতে পারার অধিকারের জন্য।’

অনেকের মতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন প্রধানমন্ত্রী স্বৈরশাসকের মতো আচরণ করছেন বলেই তারা রাস্তায় নেমে এসেছে।

ইয়েসিম পোলাত নামে ২২ বছর বয়সী এক ছাত্র বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এরদোগান নিজেকে একজন সুলতান মনে করছেন। তিনি কারো কথা শুনছেন না এবং কারো সাথে কোনো পরামর্শও করছেন না। তিনি মনে করেছেন- যা খুশি তাই করতে পারেন তিনি।’

তিন হাজার বিক্ষোভকারীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পরিচালিত ইস্তাম্বুলের বিলগি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ প্রধানত ব্যক্তি এরদোগানের প্রতি, তার দল বা তার সহযোগীদের প্রতি নয়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী একটিভিস্টদের ৯২ দশমিক ৪ শতাংশ বলেছেন, এরদোগানের ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ আচরণের কারণে তারা রাস্তায় নেমে এসেছেন।

ইস্তাম্বুলের সাবাঙ্কি বিশ্ব বিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক ফুয়াত কেইমান বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে একে পার্টির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এবারের বিক্ষোভ শুধুমাত্র এরদোগানের বিরুদ্ধে।’

এরদোগানের প্রতি এতো ঘৃণা তাদের মধ্যে জমা হলো কী করে? আসলে গত এক দশক ধরে একে পার্টির শাসনে বিভিন্ন ঘটনায় ভোগবাদী সেক্যুলার তুর্কিরা হতাশ এবং উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এরদোগান বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন, মদ খাওয়ার বিরোধিতা করে বিভিন্ন বক্তব্য দেন এবং নারী-পুরুষের প্রকাশ্যে প্রেম বিনিময়ের বিষয়টিকে নির্মমভাবে ভর্ৎসনা করেন।

সম্প্রতি তিনি যারা মদ খায় তাদেরকে নেশাখোর বলে আখ্যায়িত করেন। আঙ্কারার এক সাবওয়ে স্টেশনে প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের চুমু খাওয়া নিষিদ্ধ করে কর্তৃপক্ষের দেয়া এক সিদ্ধান্তের সমর্থন করে তিনি তরুণ যুগলদের নীতি-নৈতিকতা মেনে চলার আহবান জানান।

সম্প্রতি মদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপে মদের দোকানগুলোকে রাত ১০টার মধ্যেই বেচা-কেনা বন্ধের আদেশ দেয়া হয়। নতুন একটি আইনে মদের বিজ্ঞাপন এবং মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে মদের ব্যবসা নিষিদ্ধ করা হয়। এর আগে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক এবং গর্ভপাত নিষিদ্ধ করেও আইন করার চেষ্টা করে এরদোগান সরকার। কিন্তু গণবিক্ষোভের ভয়ে তা থেকে সরে আসে সরকার।

তবে এরদোগানের একে পার্টির ১১ বছরের সরকারের আমলে তুরস্ক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করে। তার সরকারের আমলেই তুরস্কের সঙ্কটপূর্ণ অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিদেশি বিনিয়োগে ফুলে-ফেঁপে ওঠে।

ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন একে পার্টির সরকারের অন্যান্যরাও কথা বলা শুরু করেছেন। প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ গুল বিক্ষোভকারীদের শান্ত হয়ে ঘরে ফিরে যেতে বলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ম্যাসেজ পেয়েগেছি। গণতন্ত্র শুধু ব্যালট বক্সের বিষয় নয়।’

উপ-প্রধানমন্ত্রীও পুলিশের বল প্রয়োগের জন্য ক্ষমা চান। তবে তিনি এও বলেন, বিক্ষোভকারীদের কাছে সরকারের কোন দেনা নেই।

এদিকে, এরদোগান ২০১১ সালের নির্বাচনে তার দলের ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ তরে তার দলের ক্ষমতার ন্যায্যতার বিষয়টি অনবরত বলেই যাচ্ছেন। তিনি আরো বলেছেন, ৫০ শতাংশ ভোটে নির্বাচিত হলেও তিনি দেশের সবপ্রান্তের মানুষের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রেসিডেন্ট এবং উপ-প্রধানমন্ত্রীর আপোসমূলক বক্তব্য স্বত্ত্বেও এরদোগান তার অবস্থানে অনড় আছেন। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীরাও শান্ত হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তুরস্কের সামাজিক সংকট মনে হচ্ছে আরো বেড়েই চলবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।