কক্সবাজার খাদ্য গুদামে টি.আর’র চাউল নিয়ে নাটকীয়তা

# মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মন্দির, কবরস্থান, পাঠাগারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কার কাজে ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা

কক্সবাজার সদর খাদ্য গুদামে জমা থাকা অতিরিক্ত চাল নিয়ে ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) প্রকল্পের সভাপতিগণ তাদের চাল নিতে ডেলিভারী অর্ডার (ডিও) নিয়ে গুদামে গেলেও তারা চাল পাচ্ছেন না। খাদ্য গুদামে অতিরিক্ত চাল পাওয়ায় তা কিসের চাল শনাক্ত করতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে খাদ্য বিভাগ। যার কারণে ডিও হোল্ডাররা চাল পেতে জটিলতা তৈরী হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় প্রকল্প কমিটির লোকজনের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সংসদ সদস্য লূৎফর রহমান কাজল, নারী আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক এথিন রাখাইন ও কক্সবাজার সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ছলিম উল্লাহ বাহাদুর এর মাধ্যমে কক্সবাজার সদর উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) প্রকল্পের আওতায় মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মন্দির, কবরস্থান, পাঠাগারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারের জন্য টিআর খাতে খাদ্য শস্য বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রকল্প কমিটির লোকজন এসব খাদ্য শস্য বাজারে বিক্রি করে নগদ টাকা নিয়ে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করে থাকেন। টিআর খাতের এসব খাদ্য শস্য বিক্রির জন্য সরকারের সুস্পষ্ট নীতিমালাও রয়েছে। টিআর এর অধিকাংশ খাদ্য শস্য ডেলিভারী নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করা হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল এবং গত ১৩ মে থেকে ঘূর্নিঝড় ‘মহাসেন’ এর কারণে খাদ্য গুদাম থেকে টিআর প্রকল্পের বেশ কিছু খাদ্য শস্য প্রকল্প কমিটির লোকজন ডেলিভারী নিতে পারেনি। ওই সব খাদ্য শস্য কক্সবাজার সদর খাদ্য গুদামে জমা রয়েছে। টিআর প্রকল্প কমিটির লোকজন জানান- রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল এবং গত ১৩ মে থেকে ঘূর্নিঝড় ‘মহাসেন’ এর কারণে খাদ্য গুদাম থেকে টিআর প্রকল্পের খাদ্য শস্য ডেলিভারী নিতে না পেরে তা খাদ্য গুদামে সাময়িক সময়ের জন্য অস্থায়ীভাবে জমা রাখা হয়েছে। দূর্যোগ পরিস্থিতি একটু ভাল হওয়ার পর এসব খাদ্য শস্য ডেলিভারী নেয়ার আগেই বিপত্তি ঘটে। কয়েকটি ভুল তথ্যের ভিত্তিতে টিআর প্রকল্পের চাল ভর্তি কয়েকটি গাড়ি জব্দ করে পুলিশ। পরে কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ওই সব চাউল ছেড়ে দেয়। এর পর খাদ্য বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটি খাদ্য গুদাম পরির্দশন করে প্রায় ৮ হাজার বস্তার মতো চাউল অতিরিক্ত পান। যা টিআর প্রকল্পের চাউল বলে জানান প্রকল্প কমিটির লোকজন।

কক্সবাজার শহরের বইল্ল্যা পাড়া ফোরকানিয়া মাদ্রাসা সংস্কার প্রকল্পের সভাপতি আসিফুল মওলা জানান- রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল ও ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’র কারণে খাদ্য গুদাম থেকে চাল ডেলিভারী নেয়া সম্ভব হয়নি। ধার-দেনা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। কিন্তু যখনই আমাদের ডিও’র চাল নিতে গেলাম গুদাম কর্তৃপক্ষ চাল আটকে দিয়েছে। তাদের প্রকল্পের চাউল পাওয়ার দাবী জানান তিনি।
পূর্ব লারপাড়া বাইতুল মোমেন জামে মসজিদ সংস্কার প্রকল্পের সভাপতি মোঃ আমিনুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বরাদ্দ পাওয়া চাল বিক্রির কথা দিয়ে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অগ্রীম টাকা নিয়ে মসজিদ সংস্কারের কাজ করেছি। কিন্তু যখনি ডেলিভারী অর্ডার (ডিও) এবং ট্রাক নিয়ে চালের জন্য খাদ্য গুদামে গিয়েছি, তখন ঝড়-বৃষ্টির কারণে গুদাম থেকে চাউল বের করা সম্ভব হয়নি। যার কারণে ট্রাকের অর্ধেক ভাড়াও লোকসান হিসেবে গুনতে হয়েছে। পরে ওই সব চাউল আবহাওয়া ভাল হলে নিয়ে যাওয়ার কথা দিয়ে খাদ্য গুদামে জমা রেখে এসেছিলাম।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখন ডিও নিয়ে আমার চাল আমি নিয়ে আসতে গেলেও গুদাম কর্মকর্তা চাল দিচ্ছেন না।’
লিংক রোড জামে মসজিদের মাঠ ভরাট প্রকল্পের সভাপতি জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম জানান, যৌক্তিক কারণেই আমরা গুদাম থেকে প্রকল্পের বরাদ্দ হওয়া চাউল নিতে পারিনি। প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পর চাল আটকে দিলে শত শত টিআর প্রকল্পের লোকজন ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এছাড়া এমন অবস্থা হলে আগামীতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হবে বলে তিনি জানান।

রাখাইন ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন এর আসবাবপত্র ক্রয় প্রকল্পের সভাপতি উথো ওয়াইন বলেন, ‘২টি ডিও’র মাধ্যমে ৫ মেট্রিক টন চালের মধ্যে আমার আড়াই মেট্রিক টন চাল খাদ্য গুদামে রয়ে গেছে। দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে কয়েক দিন পর আবহাওয়ার অবস্থা ভাল হলে ডেলিভারী নেয়ার কথা বলে চাউলগুলো গুদামে রেখে এসেছিলাম।’
সূত্র জানিয়েছে, টিআর প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ হওয়া খাদ্য শস্য আইনগতভাবে শত ভাগ বিক্রির নিয়ম রয়েছে। খাদ্য ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এর ‘গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর-খাদ্যশস্য/নগদ টাকা) কর্মসূচী নির্দেশিকা ২০১২-১৩’ এর ১২ নং অনুচ্ছেদ এ টিআরের খাদ্য শস্য বিক্রির কথা উল্লেখ রয়েছে। সরকারের সর্বশেষ ওই নীতিমালার ১২ নং অনুচ্ছেদে টিআর প্রকল্পের বরাদ্দকৃত খাদ্য শস্য ১০০ ভাগ বিক্রির নিয়ম রয়েছে। এছাড়া ২০১০ সালের ১০ মে কক্সবাজার সদর উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা আমীর আব্দুল্লাহ মু. মঞ্জুরুল করিম কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক বরাবরে প্রেরিত একটি তদন্ত প্রতিবেদনে টিআর এর খাদ্য শস্য শতভাগ বিক্রি করা যাবে মর্মে উল্লেখ করেন। এর আওতায় প্রকল্প কমিটির লোকজন টিআর প্রকল্পের বরাদ্দ হওয়া খাদ্য শস্য বিক্রি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকেন।

খাদ্য বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটির সংশ্লিষ্ঠ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, খাদ্য গুদামে অতিরিক্ত চাল থাকার বিষয়টি অপরাধমূলক কিছুই নয়। বরং গুদামে যদি চাউল কম থাকে তাহলে এটি খাদ্য কর্মকর্তাদের জন্য গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি আরো জানান, দেশের বিভিন্ন খাদ্য গুদামে ডেলিভারীর সমস্যার কারণে অল্প সময়ের জন্য অতিরিক্ত খাদ্য শস্য থাকতে পারে। এ ধরনের বিভিন্ন স্থানে হয়েছে। পরে উপযুক্ত প্রমাণ নিয়ে সেসব খাদ্য শস্য সংশ্লিষ্টদের দিয়ে দেয়া হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন পর্যন্ত গুদামের অতিরিক্ত চাউলগুলো টিআর প্রকল্পের বলে আমরা জানতে পেরেছি। তবে এ বিষয়ে এখনো তদন্ত চলছে।’
এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আয়ুব আলী জানান, টিআর প্রকল্পের কিছু খাদ্য শস্য গুদামে রয়ে গেছে। এসব খাদ্য শস্য ডেলিভারী নিতে বলা হলেও দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে প্রকল্প কমিটির লোকজন ডেলিভারী নেননি। ওই সব খাদ্য শস্য গুদামে জমা আছে বলে তিনি জানান। কক্সবাজার সদর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ হাসেম বলেন, ‘কক্সবাজার সদর খাদ্য গুদামে কিছু অতিরিক্ত খাদ্য শস্য রয়েছে। অতিরিক্ত খাদ্য শস্য টিআর প্রকল্পের বলে জেনেছি।’ চাউলগুলো ‘ওএমএস’ এর বলে অভিযোগ আসছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যারা এমন অভিযোগ করছেন তারা না জেনেই করছেন। কারণ ‘ওএমএস’ চাল বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই।’
কক্সবাজার সদর উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা কাজী আবদুর রহমান টিআর প্রকল্পের খাদ্য শস্য শত ভাগ বিক্রির নিয়ম থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘খাদ্য গুদামে অতিরিক্ত থাকা চাল টিআর প্রকল্পের বলে জানানো হয়েছে। এসব খাদ্য শস্য আসলে কিসের বা তা কি করা হবে খাদ্য বিভাগের তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দেয়ার পরেই আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিব।’


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।