৫ মে কোন গোলাগোলি হয়নি বরং হেফাজতের কর্মীরা গায়ে লাল রঙ লাগিয়ে মৃতের অভিনয় করেছে: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ৫ মে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের ওপর কোনো  গুলিবর্ষণ করা হয়নি বরং হেফাজতের কর্মীরা গায়ে লাল রঙ লাগিয়ে মৃতের অভিনয় করেছে।। মাদ্রাসা থেকে বাচ্চাদের নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের বাসে তুলে দেয়া হয়েছে। কোনো মাদ্রাসায় হারিয়ে যাওয়া ছাত্রের তালিকা নেই।” সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গত ৩ থেকে ৬ মে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে জামায়াত, শিবির, ছাত্রদল ও বিএনপি এক হয়ে রাজধানীর শাপলা চত্বরে সমাবেশ থেকে নির্দোষ ও নিরপেক্ষ সাধারণ জনগণের দোকানপাট লুট ও অগ্নিসংযোগ, কমিউনিস্ট পার্টি অফিসে অগ্নিসংযোগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, এমনকি কুরআন শরিফ পর্যন্ত পুড়িয়েছে। তাদের পরিকল্পিত আক্রমণ থেকে জনগণের যানবাহন ও গাছপালাও রেহাই পায়নি। তাদের যত্রতত্র বিষ্ঠা ত্যাগের কারণে রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকায় নারকীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়।”

শেখ হাসিনা বলেন, “এ ধরনের দায়িত্বহীন সাংবিধানিক সূত্রের লঙ্ঘন করার ফলে যে ক্ষতিসাধন হয়েছে তা পরিমাপ করার জন্য এবং তা ভবিষতে নিবারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার তরফ থেকে মূল্যায়ন ও নিরুপণে পরবর্তীতে একমাসের জন্য ঢাকা মহনগরীতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা কোনো সংগঠনের সভা বা সমাবেশ নিষিদ্ধ করার অভিপ্রায় নেই।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়ার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে। কিন্তু সম্প্রতি জামায়েতে ইসলামী, ছাত্র-শিবির এবং বিএনপি ও ছাত্রদলের প্ররোচনায় ও নেতৃত্বে যেসব সবাবেশ ঢাকা মহনগনরীতে ও দেশের অন্যন্য স্থানে হয়েছে, তাতে দেখা গেছে তারা সব সমাবেশেই জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে।”

তিনি বলেন, “সময় ও ক্ষেত্র বিশেষে লাঠিসোটা, ককটেল এমনকি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সাধারণ জনগণের জীবন, সম্পত্তি ও সম্মানের অধিকার বিনষ্ট করেছে। তাদের অশুভ তৎপরতায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আক্রান্ত হয়েছে, এমনকি নিহত হয়েছে।”

‘সন্ত্রাস নিরোধে সরকারের
দৃষ্টিভঙ্গি ‘জিরো টলারেন্স’

শামসুল হক চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “সন্ত্রাস নিরোধে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ‘জিরো টলারেন্স’। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই সন্ত্রাস নিরোধে সমঅংশীদার হিসেবে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে একযোগে কাজ করছে।”

শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশ এন্টি টেররিজম অ্যাক্ট ২০০৯, টেরোরিজম (সংশোধন বিল-২০১৩ এবং এন্টি মানিলন্ডরিং অ্যাক্ট) প্রণয়ন করে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। এতে বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরিতে সহায়ক হয়েছে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এ যাবৎকালীন সন্ত্রাস নির্মূলে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গৃহিত ১৩টি কনভেনশন/প্রটোকলের মধ্যে বাংলাদেশ ১২টিতে অংশীদার হিসেবে কাজ করছে এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে।”

শেখ হাসিনা বলেন, “আঞ্চলিক পর্যায়ে সার্কভুক্ত দেশসমূহের মধ্যে সন্ত্রাস নিরোধে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশ সার্ক রিজিউনাল কনভেনশন অন সুপারসেশন অব টেরিজম এবং এর এডিশনাল প্রোটকল অনুসমর্থন করেছে। এই কনভেনশনসহ অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তজার্তিক চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ সব কার্যক্রম বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছে।”

তিনি জানান, একইভাবে বাংলাদেশ বিমসটেক কনভেনশন অন কম্বাইটং ইন্টারন্যাশনাল টেরিজম, ট্রান্স-ন্যাশনাল অর্গানাইজ ক্রাইম অ্যান্ড ইলিসিট ড্রাগ ট্রাফিকিং শীর্ষক চুক্তির আওতায় গৃহিত সিন্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

সামশুল হক চৌধুরীর এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সরকারের চার বছরে ডিসেম্বর ২০১২ পর্যন্ত ২০ লাখ ৪১ হাজার ৮৪০ জন বিদেশে অভিবাসন করেছে। এই জনশক্তি রফতানি চলতি মাস পর্যন্ত ২২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। যার মধ্যে শুধুমাত্র আফ্রিকার দেশসমুহে এক লাখ ২৫ হাজারে উন্নীত হয়েছে।”

তিনি বলেন, “বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারত বাংলাদেশকে এক বিলিয়ন ডলার সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে। যার মধ্যে ২০০ মিলিয়ন ডলার অনুদানে রূপান্তর করা হয়েছে।”

পদ্মা সেতুর দরপত্র চলতি মাসের শেষে
চলতি মাসের শেষের দিকে পদ্মা সেতুর দরপত্র আহ্বান করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “চলতি মাস অর্থাৎ জুন মাসের শেষের দিকে টেন্ডার আহ্বানের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ চূড়ান্ত করে বর্তমান সরকারের মেয়াদকালের মধ্যে সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।”

বুধবার নবম জাতীয় সংসদের ১৮তম অধিবেশনে মুহিবুর রহমান মানিকের এক লিখিত প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী এই তথ্য জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি মোট ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ (সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়। এই প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নে আগামী ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ছয় হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য মোট ভূমির প্রয়োজন এক হাজার ১০৩ দশমিক ৭২ হেক্টর। যার মধ্যে এক হাজার এক দশমিক ১৩ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ৮৩৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট তিন জেলার জেলা প্রশাসককে পরিশোধ করা হয়েছে।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ক্ষতিপ্রস্তদের বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চলতি বছর মে মাস পর্যন্ত জেলা প্রশাসকদের দ্বারা পরিশোধিত অর্থের অতিরিক্ত ৩৪৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা প্রকল্পের পুনর্বাসন খাত হতে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিশোধ করা হয়েছে।”

শেখ হাসিনা বলেন, “পরিবেশ কার্যক্রমের আওতায় চারটি পুনর্বাসন এলাকায় মে মাস পর্যন্ত ১৬ হাজার ১১০টি গাছের চারা রোপন করা হয়েছে। জাজিরা এপ্রোচ সড়ক, টোল প্লাজা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নির্মাণে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার যৌথ বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এএমএল-এইচসিএম-জেভি’র সঙ্গে চলতি বছর ৫ জুন একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব প্রকল্পের চুক্তিমূল্যে ১ হাজার ৯৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং তা নিমার্ণ করতে তিন বছর সময় লাগবে।”


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।