লিমনের সঙ্গে র‌্যাবের মধ্যস্থতা: সোস্যাল নেটওয়ার্কে ড. মিজানের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ

র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো ঝালকাঠির কলেজছাত্র লিমন হোসেনের সঙ্গে র‌্যাবের মধ্যস্থতা করার বিষয়ে সোমবার প্রথম আলো’তে প্রকাশিত একটি খবরের পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। প্রথম আলো’তে আজ খবর এসেছে, র‍্যাবের গুলিতে আহত ও পঙ্গু হয়ে যাওয়া নিরপরাধ লিমনের পরিবারকে ডেকে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন, র‌্যাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে পারা যাবে না। কারণ, রাষ্ট্র তাদের পক্ষে। রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করে টেকা যায় না।’ তাই বিষয়টি আপসে নিষ্পত্তি করে ফেলার জন্যে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘গত চার বছরে মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আমার মনে কখনোই কোনোরকম মোহ ছিল না; সরকারের এবং সরকার সমর্থকদের, সমাজে ক্ষমতাশালীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে এমনকি নিম্ন কণ্ঠে কথা বলার ক্ষেত্রেও এই কমিশনের ভূমিকা ছিল বলে মনে হয় না। তারপরেও কমিশনের এবং বিশেষ করে তার প্রধানের এই ভূমিকা বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি তৈরির ক্ষেত্রে একটা বড় ক্ষতির কারণ হলো বলেই আমার ধারণা।’
তিনি লিখেছেন, ‘মিজানুর রহমান এই কথাগুলো যেদিন বললেন সেদিনই, অর্থাৎ রোববার সকালে আমরা জানতে পারি যে, তাকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দ্বিতীয় দফায় আরো তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আগামীতে মানবাধিকার কমিশনের দায়িত্ব শেষ করে যাবার সময় মিজানুর রহমান অন্য কথা বলবেন কি না সেটার জন্যে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। মিজানুর রহমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে এক অতিমানবিক চরিত্র বলেই চিত্রিত করেছেন– তার বিরুদ্ধে পারা যাবে না বলেই তার ধারণা। কিন্ত গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্র যে ১৭ বছরের একজন তরুণকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে তার বিরুদ্ধে আইন ও আইনের বাইরে সব কিছুই করতে চাইছে তা কি শক্তির প্রকাশ না কি দুর্বলতার? এই রাষ্ট্রের একটা প্রতিষ্ঠান কি এত তাই শক্তিশালী হতে পারে যে তার বিরুদ্ধে কোনোরকম পদক্ষেপই নেয়া যাবে না?”
অধ্যাপক আলী রীয়াজের এই মন্তব্যের বিরপীতে অনেকেই প্রতিক্রিয়া জানিয়ছেন। কেউ কেউ এই প্রশ্নও তুলেছেন যে, যেদিন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব পেয়েছেন, সেদিনই তিনি লিমন ও তার পরিবারের সদস্যদের ডেকে নিয়ে র‌্যাবের সঙ্গে এরকম একটি আপসরফার প্রস্তাব দিলেন। তাহলে কি দ্বিতীয় মেয়াদে কমিশন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাবার ক্ষেত্রে র‌্যাবের সঙ্গে লিমনের আপস করিয়ে দেয়াও অন্যতম শর্ত ছিল?’ কেউ কেউ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো একটি নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠান আদৌ থাকার প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
একজন লিখেছেন, যে সরকারের অর্থমন্ত্রী নির্লজ্জের মতো বলেন, ‘শেয়ার বাজার লুটেরাদের নাম বলা যাবে না, কারণ তারা অনেক ক্ষমতাবান; যে সরকারের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের কপালে দুর্নীতির কলঙ্ক তিলক এঁকে দেয়া আবুল হোসেনের মতো একজন লোককে দেশপ্রেমিক বলে সার্টিফিকেট দেন- সে সরকারের নিয়োগ দেয়া মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যানের মুখ থেকে এ ধরনের কথা খুবই স্বাভাবিক নয় কি?”
আরেকজন লিখেছেন, “সব মানুষ লেজুড়বৃত্তি করবে আর তার ফল ভোগ করবে জাতি। লজ্জা লাগে এসব নপুংসকের কথা শুনে।”
একজন মিজানুর রহমানের ছাত্র পরিচয় দিয়ে লিখেছেন, “আমি উনার প্রথম ব্যাচের ছাত্র। উনার কাছ থেকে এ ধরনের স্খলন আশা করিনি। তবে অবাকও হইনি।’
এ বিষয়ে একজন  মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যানকে ‘রিয়েল মিডিয়া জোকার’ বলে মন্তব্য করেন।
এভাবে অনেকেই মিজানুর রহমান ও মানবাধিকার কমিশন সম্পর্কে নানা মন্তব্য করেছেন। যদিও লিমন হোসেনের বিরুদ্ধে র‌্যাবের দায়ের করা মামলার চার্জশিট দেয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে গত বছরের ৯ জুলাই নিজ কার্যালয়ে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেছিলেন, ‘এতে আমরা ক্ষুব্ধ ও দুঃখিত। ১৬ বছর ৯ মাস যার বয়স, আইনের চোখে সে শিশু; সেই লিমনের বিরুদ্ধে র‌্যাবের মাললার তদন্ত চলছে দ্রুত। পুলিশ গোপনে চার্জশিট দিয়ে দিচ্ছে। আর লিমনের দরিদ্র মা হেনোয়ার বেগমের দায়ের করা মামলার অগ্রগতি নেই। এটাই রাষ্ট্রের মূল্যবোধ!”
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ২৩ মার্চ লিমন হোসেন র‌্যাবের গুলিতে আহত হয়ে একটি পা হারান। শুধু তাই নয়, এরপর র‌্যাব উল্টো লিমন ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে। সরকারও লিমন ও তার পরিবারকে সন্ত্রাসী হিসেবে প্রমাণের জন্য উঠেপড়ে লাগে। কিন্তু মানবাধিকার কমিশন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ দেশের গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ লিমনের পাশে দাঁড়ায়। তাদের সহায়তা এ বছর লিমন এইচএসসি পরীক্ষা দেন। যদিও ২০১১ সালেই তার এইচএসচি পরীক্ষা দেবার কথা ছিল। কিন্তু র‌্যাবের গুলিতে পঙ্গু হওয়ায় তিনি পরীক্ষা দিতে পারেননি।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।