জোয়ারের পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি : তলিয়ে গেছে মহেশখালী কুতুবদিয়া

পূর্ণিমার জো উঠায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে বেড়ীবাঁধ ভেঙ্গে মহেশখালীতে প্রায় ৬ হাজার বসতবাড়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৫শ চিংড়ি প্রজেক্টের বাঁধ ভেঙ্গে প্রায় ১শ কোটি টাকার চিংড়ি মাছ জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে। ধলঘাট ও ঘটিভাঙ্গায় দেখা দিয়েছে খাওয়ার পানির সংকট। ধান্য রক্ষাবাঁধ ভেঙ্গে আমন চাষের বিপুল পরিমান বীজ তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কুতুবজুমের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
ধলঘাটার অনেক গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে পানি বন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ১০ হাজার মানুষ। বেড়ীবাঁধ ও রক্ষাবাঁধ ভেঙ্গে জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে প্রায় দুই শতাধিক চিংড়ি প্রজেক্টের মাছ। বেড়ীবাঁধসহ কোন কিছুর সংস্কার কাজ না হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় লোকজন।
ধলঘাট ইউনিয়নের একজন সাবেক মেম্বার ও সাবেক চেয়ারম্যান জানিয়েছেন সরকার ধলঘাটার প্রায় কোটি টাকা বরাদ্দ করলেও এক টাকার কাজও ধলঘাটায় হয়নি। যার ফলে ধলঘাট এখন পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ধলঘাটবাসী এমন অবস্থা ৯১ এর ঘুর্ণিঝড়ের পর আর দেখেনি। স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে বেড়ীবাঁধ নির্মাণের জন্য প্রায় ৩৫ লাখ টাকা উঠানো হলেও এক টাকাও বেড়ীবাঁেধর জন্য খরচ করেনি বর্তমান চেয়ারম্যান। গত আড়াই বছরে এলজিএসপির প্রায় ২৫ লাখ টাকাও উধাও হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত সরকারী ও বেসরকারী পর্যায় থেকে যে সহায়তাগুলো পাওয়া গেছে এর এক টাকাও এলাকার উন্নয়ন খাতে খরচ করেনি। এমনকি হতদরিদ্রদের চাল ভিজিএফ ও ভিজিডির চালও স্থানীয় লোকজন ঠিকমত পায়নি।
ধলঘাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আহচান উল্লাহ বাচ্চু জানিয়েছেন, পুরো ধলঘাট জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে যতদুর সম্ভব সাধারণ মানুষকে সহায়তা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ও নিজস্ব অর্থায়নে বেড়ীবাঁধের কিছু অংশ সংস্কার করা হলেও ভাঙ্গন রোধ করা যায়নি। তবে যা অভিযোগ করা হচ্ছে কোন সত্যতা নেই। স্থানীয় রাজনীতি সুবিধা গ্রহন করতে অপ-প্রচার চালানো হচ্ছে।
৮ নং ওয়ার্ড মেম্বার আকতারুজ্জামান জানিয়েছেন পন্ডিতের ডেইল ও বেগুন বনিয়ার প্রায় ৩শ বসতবাড়ী পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এখন এলাকায় খাওয়ার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পুকুর গুলো জোয়ারের পানিতে ডুবে যাওয়ায় ব্যবহার করার পানিও কেউ পাচ্ছেন না। ধলঘাটার প্রায় ৫০টি চিংড়ি প্রজেক্টের মাছ জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে।
কালারমারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার নুরুল ইসলাম জানান, কালারমারছড়ার প্রায় দুই শতাধিক চিংড়ি প্রজেক্ট জোয়ারের পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ভেসে গেছে প্রায় কয়েক কোটি টাকার চিংড়ি মাছ। জোয়ারের পানিতে ধান্য রক্ষাবাধঁ ভেঙ্গে বিপুল পরিমান আমন চাষের জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। একই সাথে বীজ তলারও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
কুতুবজুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মৌলভী শফিউল আলম জানান, পূর্ণিমার জোয়ারে কুতুবজুমের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সোনাদিয়ার প্রায় সবকটি চিংড়ি প্রজেক্ট জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। নিচু এলায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতবাড়ীর লোকজনকে জরুরী সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ারুল নাসের জানিয়েছেন ইতোমধ্যে ক্ষয়ক্ষতি নিরুপনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার পূর্নিমার জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৩/৪ ফুট উচ্চতা বেড়ে যায়। যার ফলে কুতুবদিয়া দ্বীপের বড়ঘোপ ইউনিয়নের আজম কলোনী, মিয়ারঘোনা, লেমশীখালী ইউনিয়নের সতর উদ্দিন, পেয়ারাকাটা,উত্তর ধূরুং ইউনিয়নের ফয়জানির বাপের পাড়া, চর ধূরুং, আকবরবলী ঘাট এলাকা, আলী আকবর ড়েইল ইউনিয়নের বায়ু বিদ্যুৎ এলাকা, কিরনপাড়া, পুতিন্যারপাড়া, তেলিপাড়া, শান্তিবাজার এলাকায় পাউবোর বেড়িবাধ ভাংগা থাকায় এবং নির্মিত বেড়িবাঁধ টপকিয়ে নোনা পানি ভিতরে ডুকে ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
লেমশীখালী ইউপি চেয়ারম্যান আকতার হোছাইন জানান, সতর উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে ও পেয়ারাকাটা এলাকায় বেড়িবাধঁ ভেঙে শতশত একর আউশ চাষের ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া ঐ এলাকায় অর্ধশত কাচাঁ ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়ে ভেঙে গেছে। নোনা পানি উঠে মাছ চাষের পুকুরের মাছ তলিয়ে গেলে। সতর উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শুক্কুর আলম আযাদ ও পেয়ারাকাটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলমগীর জানান, গত দুই দিন ধরে বিদ্যালয় এলাকায় বেড়িবাধঁ ভাংগা থাকায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ রাখা হয়েছে। সতর উদ্দিন বিদ্যালয়ের শ্রেণী কক্ষে দেড় থেকে দুই ফুট পানি উঠেছে। এ কারণে শ্রেনী কক্ষের ক্লাস বন্ধ রাখা হয়েছে। পেয়ারাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা  রাস্তা ও বেড়িবাঁধ দিয়ে আসা যাওয়া করতে না পারায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত নেই বললে চলে। আজম কলোনী গ্রামের অধিবাসি আবু সুফিয়ান মিস্ত্রি  জানান, আজম কলোনী গ্রাম এলাকায় বেড়িবাঁধ ভাঙা থাকায় জোয়ারের নোনা পানি ডুকে অর্ধশত কাচাঁ ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। এ সব এলাকায় প্রায় ৭০ টি পুকুরে নোনা পানি প্রবেশ করে মাছ চাষের পুকুর নষ্ট হয়ে গেছে।
আলী আকবর ডেইল ইউপির চেয়ারম্যান ফিরোজ খান চৌধুরী জানান, গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গেল বছর নির্মিত স্থায়ী বেড়িবাঁধ উপচে নোনা পানি ডুকে শত শত ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গিয়ে হাজার হাজার মানুষ পানি বন্ধি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এ সব প্লাবিত এলাকায় পানি সরানোর সুযোগ খোজে পাচ্ছে না এলাকাবাসি। তাবলরচর ও শান্তিবাজার এলাকায় ব্যাপক গ্রামাঞ্চল ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী বলেন, পাউবোর এক ও দুই নং প্যাকেজের পাউবোর বাঁধ উপচে জোয়ারের নোনা পানি গ্রামাঞ্চলে প্রবেশ করে কাহার পাড়া, তেলিপাড়া, কাজিরপাড়া, পন্ডিতপাড়া, হায়দারবাপের পাড়া এলাকার হাজার হাজার মানুষ পানি বন্ধি হয়ে পড়েছে। নোনা পানি উঠে ভেঙে গেছে অর্ধশত কাঁচা ঘরবাড়ি। আলী আকবর ডেইল ইউনিয়ন পরিষদ হতে তাবলরচর পর্যন্ত এক কিলোমিটার আজম সড়ক ভেঙে যাওয়ায় পূর্ব আলী আকবর ডেইল, পূর্ব তাবলরচর, সন্ধিপীপাড়া এলাকার হাজার হাজার মানুষ পানি বন্ধি হয়ে পড়েছে। আউশ চাষের শত শত একর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া আজম কলোনী, মিয়ারঘোনা, পেয়ারাকাটা, সতর উদ্দিন, ফয়জনির বাপের পাড়া, আকবরবলি ঘাট, চর ধুরুং এলাকায় বাধঁ ভেঙে শত শত ঘরবাড়ি ও দুটি বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পাউবোর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রাণালয়ে ক্ষতিগ্রস্তের বিষয়ে লিখিত ভাবে অবহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবোর) কক্সবাজার জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মঈন উদ্দিন জানান, জরুরী ভিত্তিতে ভাঙন বেড়িবাঁধ মেরামত করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে অবহিত করা হয়েছে। পানি বন্ধি লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা নির্দেশ দিয়েছেন পাউবোর কুতুবদিয়ার কর্তৃপক্ষকে। কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ ফিরোজ আহমেদ বলেন, গতকাল দুপুরে পুর্ণিমার জোয়ারে কুতুবদিয়া দ্বীপের উপকুলের ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। শত শত কাচাঁ ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। শত শত একর আউশ ফসলি জমি নোনা পানিতে তলিয়ে গেছে। পাউবোর কর্তৃপক্ষ জরুরী ভিত্তিতে ভাঙন বেড়িবাঁধ মেরমতের জন্য লিখিত ভাবে অবহিত করা হয়েছে।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।