‘যেখানে নির্বাচন সেখানে হেফাজত’

দেশের চার সিটি নির্বাচনে ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থীর জয় হয়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে হেফাজতে ইসলামকে। বিশেষ করে সিলেট ও বরিশালের সিটি নির্বাচনে আটঘাট বেধেই সরকার সমর্থিত প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করেছেন তারা। হেফাজত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও প্রত্যেকটি নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৬ জুলাই আওয়ামী লীগ ঘাঁটি খ্যাত গাজীপুরের নির্বাচনেও হেফাজত একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

চার সিটিতে সরকারি দলের প্রার্থীদের ভরাডুবির পর সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “হেফাজতের লোকেরা সেদিন মরেনি, গায়ে রঙ মেখে সেদিন রাতে শাপলা চত্বরে শুয়েছিল। অনেকে নিহতের ভান করে পরে উঠে দৌড় দিয়েছে।” এমন বক্তব্য আরো ক্ষিপ্ত করে তুলছে হেফাজত সমর্থিত আলেম-ওলামাদের।

এর জের ধরেই গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থী আবদুল মান্নানের পক্ষে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে সংগঠনটির নেতা কর্মীরা। সরেজমিনে দেখাগেছে, সিটি করপোরেশনের গাছা, কলেমশ্বর, কুনিয়া, বড়বাড়ি, ঝাজর, বোর্ডবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় টেলিভিশন প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করছেন। সকাল থেকে মধ্যরাত  পযন্ত হেফাজত একজোট হয়েও এমএ মান্নানের পক্ষে ভোট চাইছেন।

হেফাজত নিয়ে ভোটের মাঠে যে বেগ পেতে হচ্ছে তা অকপটেই স্বীকার করেছেন আজমত উল্লাহর পক্ষের নির্বাচনী কাজে থাকা বেশ কয়েকজন। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভোট চাইতে গেলেই প্রথমেই বাঁধ সাজে মহিলারা। তারা বসতে দিয়ে জানতে চায়-মার্কা-টার্কা বুঝিনা কোন দলের প্রার্থী। যদি বলা হয় আওয়ামী লীগ তাহলে মুখের উপর বলে দেয় আপনাদের ভোট দিব না। কারণ হিসেবে মহিলারা ওই রাতের ঘটনার কথা বলে দেন।”

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ হেফাজতের ১৩ দফার বিরোধিতা করার কারণে দেশের সব জেলার হেফাজত নেতা-কর্মীরা আওয়ামী লীগের বিরোধী হয়েছে। এ কারণেই দেশের যেসব আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্রদের এ দাবির প্রতি সমর্থন রয়েছে তারা বিএনপিকে পছন্দ না করলেও আওয়ামী লীগকে ঠেকাতেই তৎপর রয়েছে। এজন্য দেশের সব নির্বাচনগুলোতে আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্ররা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে এবং বেশিরভাগ ধর্মপ্রাণ মানুষকে বুঝাচ্ছেন এই সরকার ইসলাম ও আলেম-ওলামাবিদ্বেষী বলে। সঙ্গে সরকারের ব্যর্থতাগুলো তুলে ধরছেন সবার কাছে।

অন্যদিকে বিএনপিও হেফাজতে ইসলামের ধার করা সহমর্মিতা লুফে নিয়েছে। বিএনপি জানে তাদের হাতে এখন দুটি অস্ত্র রয়েছে একটি হেফাজতে ইসলাম আরেকটি তারেক রহমান। তারেক রহমানের নাম নিলেই সরকার হুঙ্কার দিয়ে কড়া চোখে তাকায়। তাই এ মুহূর্তে হেফাজতের সহমর্মিতা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার নাই।

এদিকে ৫ মে’র আবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন সংগঠনটি। এজন্য নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখতেই সরকারের বক্তব্যের সমালোচনা করে প্রতিদিন বিবৃতি দিচ্ছেন হেফাজতের কেন্দ্রীয় আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলার, থানা কমিটি তাদের সর্বোচ্চ এই নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দিক নির্দেশনা নিচ্ছেন। এছাড়াও হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রতিদিন কোথাও না কোথায় সংগঠনের ও আগামী জাতীয় নির্বাচনের কৌশল ঠিক করতে বৈঠক করেছেন বিভিন্ন এলাকার শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামাদের সঙ্গে। সার্বিক দিক বিবেচনা করে ঈদের পরে কর্মসূচি দেয়ার কথাও ভাবছে সংগঠনটি।

এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক মুফতি হারুন ইযহার চৌধুরী নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “নির্বাচন আমাদের লক্ষ না। আমাদের লক্ষ নাস্তিক ও ইসলাম বিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা। এখন এর প্রভাব যদি নির্বাচনগুলোতে পরে তাতে আমাদের কিছু করার নাই এবং নির্বাচনে কারা লাভবান হলো আর কারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো সেটাও আমাদের দেখার বিষয় না।”

তিনি আরো বলেন, “আওয়ামী লীগকে নাস্তিক বলব না। তবে সত্যিকার অর্থে নাস্তিকদের দোশর। আমরা যতদিন আছি ততদিন এই নাস্তিক শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে যাব। এজন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেয়া আছে যেখানেই ইসলাম বিদ্বেষী শক্তি মাথাচারা উঠবে সেখানেই তাদের প্রতিহত করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।”

হেফাজতের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল বলেন, “দেশের কওমি মাদরাসাগুলো চলে এদেশের সাধারণ মানুষের অর্থায়নে।  সরকারের অর্থ ছাড়াই বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে। আর এটা এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষ স্বার্থের সীমারেখা ছাড়াই অর্থায়ন করে। এর একটি কারণ এদেশের মানুষ ইসলামকে ভালোবাসে। তাই তাদের অর্থায়ন ধর্মীয় আবেগ ও ধর্মের প্রতি দুর্বলতা থেকেই।”

তিনি বলেন, “এ দেশের মানুষের অন্তরে ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি জমে আছে এই মাদরাসাগুলোতে। আর এইসব মাদ্রাসায়ই হেফাজত ইসলামের চালিকা শক্তি। সুতরাং সেই হেফাজতের প্রতি দেশের সাধারণ মানুষের দুর্বলতা কেন থাকবে না? আর সিটি নির্বাচনই তার প্রতিফলন।”


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।