গাজীপুরে ইমাম-শিক্ষকদের নিয়ে মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গোপন বৈঠক!

ক্ষমতাসীন ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানের পক্ষে  বহিরাগতদের নিয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মসজিদে গোপন বৈঠক করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইফা)। প্রচারণার শেষ মুহূর্তে ইফা ডিজি শামীম আফজাল নির্বাচনী আরচণবিধি লঙ্ঘন করে বেপরোয়াভাবে সরকারদলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বুধবার রাত থেকে ১২টা থেকে নগরীতে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এই বৈঠক অংশ নেন ময়মনসিংহ, কাপাসিয়া, এয়ারপোর্ট রোড, শালনা, টাঙ্গাইল ও মধুপুর থেকে আগত বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষকরা।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত জয়দেবপুর জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত গোপন বৈঠকে সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণার চালাতে বহিরাগত এসব মসজিদের ইমাম ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষকদের নির্দেশ দেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা।

বৈঠকে ইফা ডিজি শামীম আফজাল উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের রোষানলে পড়ার ভয়ে তিনি উপস্থিত হননি বলে জানান বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক ইমাম ও শিক্ষকরা।

বৈঠকের খবর খুব দ্রুত নগরীতে ছড়িয়ে পড়লে তড়িগড়ি করে বৈঠক সমাপ্ত করে গণমাধ্যমকর্মীদের এড়িয়ে গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ছাড়েন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বৈঠকে অংশ নেওয়া বহিরাগত মসজিদের ইমাম ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষকরা জয়দেবপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কড়া সমালোচনা করছেন।

তারা জানান, গতকাল রাতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি শামীম আফজালের নির্দেশে মহাজোট  শরিক বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের (মেজবাহুর) মহাসচিব মুফতি মুনিরুজ্জামান গাজীপুরের আশপাশের ইসলামিক ফাউন্ডেশন নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষকদের মুঠোফোনে গাজীপুরে আসার আমন্ত্রণ জানান।

মসজিদের ইমাম ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষকরা গাজীপুরের আসার কারণ জানতে চাইলে মুফতি মুনিরুজ্জামান জানান, ‘ডিজি সাহেব আপনাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন’। আমন্ত্রণ পেয়ে ইমাম-শিক্ষরার জয়দেবপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে হাজির হোন।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক শিক্ষক-ইমাম অভিযোগ করে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লাহর পক্ষে নির্বাচনে কাজ করার জন্য আমাদের এখানে জড়ো করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বৈঠকে আমাদেরকে ইফার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আজমত উল্লাহর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে বলে। তাদের এমন প্রস্তাবে অনেক ইমাম-শিক্ষক প্রতিবাদ জানালে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা তদের ওপর ক্ষিপ্ত হোন।’

পরে অনেক ইমাম ও শিক্ষক অনুষ্ঠানে ডিজি শামীম আফজালের না আসার কারণ জানতে চাইলে উপস্থিত দায়িত্বশীল নেতারা জানান, ‘তিনি বিশেষ কারণে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হতে পারেননি।’

তবে ইমাম-শিক্ষকরা জানান, বৈঠকের খবর বাইরে ছড়িয়ে পড়ায় বিএনপি নেতাকর্মীদের রোষানলে পড়ার ভয়ে ডিজি আফজাল বৈঠকে আসেননি। তিনি না আসায় বৈঠক সমাপ্ত করা হয়েছে এবং সবাইকে নিজ নিজ এলাকায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গাজীপুরের সালদা থেকে আগত গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক মাস্টার হুমায়ন  বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লাহর পক্ষে প্রচারণা করতে ডিজি স্যারের নির্দেশে আমাদের এখানে আনা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বৈঠকে আমাদেরকে দোয়াত-কলমের পক্ষে ভোট চাইতে বলা হয়েছে। আর ৫ মে শাপলা অভিযানে কোনো হতাহত হয়নি এমন তথ্য ভোটারদের কাছে দিতে বলেছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।’

দায়িত্বশীল কর্মকর্তার নাম জানতে চাইলে হুমায়ূন বলেন, ‘উনার নাম বললে আমার চাকরি থাকবে না।’

একই অভিযোগ করেছেন টাঙ্গাইল থেকে আসা ইমাম একলাছ উদ্দিন। তিনি জানান, ‘গাজীপুরে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে হেফাজত ইসলাম প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়ায় সরকারি দল কিছুটা ভয়ে আছে। তাই তারা আমাদেরকে সাধারণ মানুষের কাছে পাঠিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষদের ভোট আদায়ের চেষ্টা করেছে।’

বৈঠকের সত্যতা নিশ্চিত করে তিনি আরো বলেন, ‘বৈঠকে অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। দোয়াত-কলমের পক্ষে প্রচারণা চালাতে বলা হয়েছে।’

এই বিষয়ে কথা বলতে মহাজোট  শরিক বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের (মেজবাহুর) মহাসচিব মুফতি মুনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তী তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা কর হলেও মুনিরুজ্জামানের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

জয়দেবপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বৈঠককে কেন্দ্র করে মসজিদের আশাপাশে বিপুল পরিমাণ পুলিশ উপস্থিত ছিল। তবে তারা বৈঠকের বিষয়ে নিয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।