গণতান্ত্রিক সরকারের উপর সেনা হস্তক্ষেপ, মিশরে শুধু ধ্বংসই বয়ে আনবে

অভ্যুত্থানের পর যারা ভাবছেন, মিশরের সেনাবাহিনীর কাজ হবে জনগণের স্বাধীনতা রক্ষা করা তারা অচিরেই হতাশ হবেন। গত কয়েক দশকে মাত্র এই প্রথমবারের মতো মিশরে একটা  পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু চলমান সামরিক হস্তক্ষেপ তার সবটাই ধ্বংস করে দিতে পারে।

২০১১ সালে হোসনি মোবারকের পতনের পর রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিদায় নেয়া মিশরীয় সেনাবাহিনী আবারো রাজনৈতিক অঙ্গনে হস্তক্ষেপ করেছে। অবাধ ও নিরপেক্ষ হিসেবে স্বীকৃত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ফলাফল এবং দেশের মৌলিক আইন-কানুন লঙ্ঘন করে এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া কখনই কাম্য হতে পারে না।

কিন্তু এটাও সত্যি যে, মিশরের সেনাবাহিনীর এ পদক্ষেপকে মিশরের সেসব বিপ্লবীরাই স্বাগত জানিয়েছেন যারা ২০১১ সালে মোবারকের বিরুদ্ধেও সবার আগে রাস্তায় নেমে আসার সাহস দেখিয়েছিলেন। তবে এ থেকে বরং তাদের রাজনৈতিক নাবালকত্ব ও দূরদর্শীতার অভাবের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে গেছে।

তবে এটাও বলার কোনো সুযোগ নেই যে, মুরসির কোনো দোষ নেই। তার বিরুদ্ধে ন্যায্য অভিযোগ রয়েছে অসংখ্য। এসবের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হলো গত নভেম্বরে কয়েকটি ডিক্রি জারি করে তার একক ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা। তবে গণরোষের মুখে তিনি সে পদক্ষেপ থেকে সরে আসেন।

আবার চলমান গোলযোগের সময় মুরসি বারবার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন এবং নতুন করে সংসদ নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েও আপসের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন।

বিগত দুই বছর ধরে দানা বেধে ওঠা এই গণঅসন্তোষের জন্য তাকেই পুরোপুরি দোষারোপ করাটাও হবে অবিবেচনাপ্রসূত এবং হাস্যকর। কারণ মুরসি নয়, বরং মিশরের সর্বোচ্চ আদালতই দেশটির জননির্বাচিত প্রতিনিধিদের সভা বা পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ বাতিল করে দিয়েছিল।

এমনকি বিরোধীদের কারণেই মুরসির সরকার একটি মুসলিম ব্রাদারহুড নিয়ন্ত্রিত সরকারে পরিণত হয়েছিল। মুরসি তার বিরোধিদের প্রতি অসংখ্যবার সবিনয় নিবেদন করেছিলেন মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়ার জন্য। কিন্তু বিরোধিরা তা প্রত্যাখান করে।

মিশরের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্যও মুরসিকে দায়ী করা ঠিক হবে না। প্রতি বছর যে লাখ লাখ উচ্চ শিক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হয় তাদের জন্য চাকরির সংস্থানে মিশরীয় অর্থনীতির ব্যর্থতার দায় শুধু মুরসির একার নয়। এর ওপর আছে ইতোমধ্যে চাকরি হারা জেষ্ঠ্য আরেকটি প্রজন্ম।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ অনুযায়ী মুরসি খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মুল্যের ওপর থেকে ভর্তুকি তুলে নেন। যার ফলে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে। কিন্তু বর্তমানে মুরসি বিরোধিদের যারা আগে ক্ষমতায় ছিলেন তারাও তো একই কাজ করেছেন বহুবার। অথচ তারাই এখন আবার মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে রাস্তায় নেমে গলা ছাড়লেন।

আর দেশটির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একটি প্রধান উৎস পর্যটন খাতে ধস নামে মূলত গত কয়েকবছর ধরে অব্যাহত বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও অসন্তোষের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীল অনিরাপদ পরিবেশের কারণে।

প্রধানত মোবারকের জাতীয় গণতান্ত্রিক দলের সদস্যদের দখলে থাকা মিশরের রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র, মোবারকের সমর্থক অভিজাত উদ্যোক্তা শ্রেণী এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ও নবগঠিত ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প কারখানা এবং বাণিজ্যিক কোম্পানিসমূহের দখলদার সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা শ্রেণীই মিশরীয় গণতন্ত্রের জন্য প্রধান হুমকি।

অনেকে অভিযোগ করেছেন, মুরসিও মিশরের এই কর্তৃত্ববান ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণীর সঙ্গে আঁতাত করেছেন। কিন্তু এই অভিযোগ সঠিক নয় বরং তার বিরুদ্ধে সঠিক অভিযোগটি হবে এই যে, তিনি তাদের বা তাদের বরকন্দাজবাহিনী অর্থাৎ মারাত্মক দুর্নীতিগ্রস্ত এবং সীমাহীন বর্বর মিশরীয় পুলিশ বাহিনীকে মোকাবেলায় খুব সামান্যই চেষ্টা করেছেন।

অথচ গত কয়েকদিনের ঘটনা প্রবাহের একটা নির্মম পরিহাস হলো এই যে, যারা কায়রোর তাহরির স্কয়ারে এবং দেশটির অন্যান্য শহরের রাস্তায় প্রেসিডেন্ট মুরসির পতন চেয়ে হুংকার দিয়ে যাচ্ছেন, তারা এই ক্ষুদ্র অভিজাত গোষ্ঠীর খপ্পরেই পড়তে যাচ্ছেন। তারা শক্তিমান এই ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণীর বানানো ফাঁদেই আটকা পড়েছেন। অথচ তারা এদের নিয়ন্ত্রণ করার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই ২০১১ সালের গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।

এটাও সত্যি যে, মুসলিম ব্রাদারহুড সামাজিকভাবে একটি রক্ষণশীল দল এবং তারা হয়তো মিশরের জনগণের অনেক ছোট-খাটো গণতান্ত্রিক নাগরিক অধিকারও সংকুচিত করে দিতে পারতো। কিন্তু এ মুহূর্তে মিশরের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হওয়ার দরকার ছিল, মোবারককে উৎখাত করে মিশরের জনগণ যে রাজনৈতিক অধিকার অর্জন করেছিল তার সুরক্ষাকরণ নিশ্চিত করা।

একদলীয় শাসন ব্যবস্থার উৎখাত, স্বাধীনভাবে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করার অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বিরোধিদের ওপর দমন-পীড়নের অবসানের অধিকার সুরক্ষা করা চলমান আন্দোলনের মুল ইস্যু হওয়া উচিৎ ছিল, অথচ তা হয়নি।

এখন যারা ভাবছেন যে, সেনাবাহিনীর প্রধান লক্ষ্য হলো ২০১১ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে  মিশরীয়দের অর্জিত এই নতুন স্বাধীনতা রক্ষা করা, তারা অচিরেই হতাশ হবেন। তাদের ভুল ভাঙতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

১৯৭৩ সালে চিলি এবং ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা এবং এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরো অনেক দেশের ইতিহাস থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, সংকটময় মুহূর্তে সামরিক হস্তক্ষেপকে প্রাথমিকভাবে স্বাগত জানানো হলেও পরে পস্তাতে হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেলিত জনগণকে নিমজ্জিত হতে হয় হতাশার অতল গহ্বরে।

মিশরীয়রাও যদি সে একই পথে পা বাড়ায় তবে তাদের জন্যও তা একটা ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ বৈ আর কিছুই হবে না। কারণ সেনাবাহিনীর ক্ষমতা নেওয়ার পরই শুরু হয়েছে ভুলপন্থা দিয়ে। বলা হয়েছে, মিশরের ক্ষমতা গ্রহণ করেছে দেশটির ‘সাংবিধানিক পরিষদ’। অথচ দেশটিতে এখন কোনো সংবিধানই নেই, কি হাস্যকরই না গণতন্ত্রের এই রক্ষাকবচ সেনাবাহিনীর অবস্থান!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।