কোটাবিরোধী আন্দোলন রাত ১০টা পর্যন্ত অবস্থান, কাল শাহবাগে ফের গণজমায়েত

শাহবাগে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সরকারি কর্ম কমিশনের অধীনে ৩৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারির ফলাফল পুনর্মূল্যায়ন এবং কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে  বুধবার রাত ১০টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। আন্দোলনকারীদের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শাহীন আলম এই ঘোষণা দেন।

একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন, ‘আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে আবারো একই দাবিতে শাহবাগে গণজমায়েত করা হবে।’ দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি তারা অব্যাহত রাখবেন বলেও জানান শাহীন আলম।

আন্দোলন শুরুর পর থেকে শাহবাগে পুলিশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। নগরীর এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দিনভর বন্ধ থাকায় তীব্র যানজট দেখা গেছে।

পুলিশের রমনা বিভাগের সহকারী কমিশনার এসি (পেট্রোল) ইমান-উল হক আরটিএনএন- কে বলেন, ‘কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের বিষয়ে এখন পর্যন্ত উপরের কোনো নির্দেশনা নেই। শান্তিপূর্ণ অবস্থান করলে পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নিবে না।’

তবে তিনি জানান, ‘আগামীকাল বৃহস্পতিবার প্রথম রমজান। এই অবস্থা চলতে থাকলে জনদুর্ভোগ বাড়বে। তখন হয়তো পুলিশ হয়তো ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। তবে এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো নির্দেশনা নেই।’

এদিকে, পরীক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলনের মুখে ৩৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারির ফল পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। পিএসপির জনসংযোগ কর্মকর্তা মীর মোশাররফ হোসেন বুধবার বিকেলে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।

তবে শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা ফল পুনর্মূল্যায়ন নয়, বাতিল দাবি করেছেন।

আন্দোলনকারীদের পক্ষে ঢাবি ছাত্র শাহীন আলম বলেন, ‘সব ধরনের কোটা বাতিল করে শুধুমাত্র মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সকল নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং অবিলম্বে ৩৪তম বিসিএসের ফল বাতিল করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের স্পষ্ট দাবি এই দুটিই। যতক্ষণ পর্যন্ত এই দুই দাবি মানা না হবে ততক্ষণ আন্দোলন চলবে। আজ আমরা রাত ১০টা পর্যন্ত অবস্থান করব। আর আগামীকাল সকাল ১০টা থেকে আবারো গণজমায়েত করে আন্দোলন তীব্র করা হবে।’

এদিকে, ক্ষোভ প্রকাশ করে আন্দোলনকারীরা বলেন, ‘স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও কোটা পদ্ধতি এবং দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের প্রশাসনসহ সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করা হচ্ছে। ’৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদাররা এই দেশকে মেধাশূন্য করার জন্য একবার বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল। আর স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক সরকার কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে আবারো দেশকে মেধাশূন্য করার পরিকল্পনা করেছে।’

উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ কোটা পদ্ধতি রয়েছে। আর বাকি ৪৪ শতাংশ মেধা থেকে পূরণ করা হয়। পাঁচ ধরনের কোটা সুবিধাভোগীদের মধ্যে রয়েছে- জেলা/বিভাগ কোটা ১০ ভাগ, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান/নাতি-নাতনি কোটা ৩০ ভাগ, নারী কোটা ১০ ভাগ, প্রতিবন্ধী কোটা ১ ভাগ ও উপজাতি কোটা ৫ ভাগ। কোটার জন্য বিবেচিত ব্যক্তিরা আবার মেধার ৪৪ ভাগের ক্ষেত্রেও বিবেচিত হতে পারবেন এমন বিধান রয়েছে।

আন্দোলনকারীরা এই কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবি তুলেছেন। তাদের দাবি, শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী কোটা বহাল রেখে সব কোটা বাতিল করা হোক।

আন্দোলনকারীরা বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা সব সময় আমাদের কাছে পরম সন্মানের। রাষ্ট্র তাদের সুবিধা দিতে পারেন। আজীবন তাদের উত্তরসুরিদের নয়। মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের বংশধরদের রাষ্ট্র অন্যভাবে অনেক সুবিধা দিতে পারে, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। তবে চাকরির এই ক্ষেত্র দিয়ে দিতেই হবে, এটা মানা হবে না।’

প্রসঙ্গত, পঞ্চম আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ২৫ লাখ ১৮ হাজার ১৫ জন। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪১ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬১২ জন প্রতিবন্ধী।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এই হিসাবে মোট জনসংখ্যার ১.১০ শতাংশ নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৫ ভাগ, ১.৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধীর জন্য ১ ভাগ, ০.১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ ভাগ অর্থাৎ ২.৬৩ শতাংশ জনগোষ্ঠীর জন্য ৩৬ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত। সব মিলে জেলা ও নারী কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটাধারীদের জন্য সংরক্ষিত। অন্যদিকে প্রায় ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র ৪৪ শতাংশ চাকরি বরাদ্দ।

গত সোমবার ৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন-বিপিএসসি। এতে কোটাধারীদের জন্য আলাদা নম্বর রাখা হয়। এতে সাধারণ পরীক্ষার্থীরা অনেক বেশি নম্বর তুলেও যেখানে টিকতে পারেননি। সেখানে কোটা সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা অনেক কম নম্বরে উত্তীর্ণ হয়েছেন। আর এই খবর ছড়িয়ে পড়লে চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতি সংস্কার এবং ফলাফল পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে বাদপড়া শিক্ষার্থীরা বুধবার রাস্তায় নেমে আসেন।

তারা সকাল থেকে রাজধানীর শাহবাগ অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বঞ্চিত শিক্ষার্থীর ব্যানারে এই আন্দোলনে বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা যোগ দেয়। তারা এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে।

এছাড়া ঢাকার বাইরে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে একই দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের একটি করে গ্রুপ ঢাকার আন্দোলনে সংহতি জানাতে রওনা হয়েছেন বলে আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।

বিসিএসে এর আগে মৌখিক পরীক্ষার পর কোটার ভিত্তিতে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ হলেও এবার প্রাথমিক বাছাই তথা প্রিলিমিনারিতেই কোটার ভিত্তিতে ফল দেয়া হয়েছে। আর এজন্যই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রাথমিক বাছাই থেকে বাদ পড়ে যান।

গত সোমবার বিকেলে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) অধীনে ৩৪তম প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এতে ১২ হাজার ৩৩ জন পরীক্ষার্থী পাস করেছেন।

পিএসসি জানায়, এ বছরই সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রতিযোগী গত ২৪ মে ১০০ নম্বরের এক ঘন্টার প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেয়। পিএসসির তথ্যমতে, দুই লাখ ২১ হাজার ৫৭৫ জন প্রার্থী পরীক্ষার জন্য অনলাইনে আবেদনপত্র জমা দেন।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, কোটা না থাকায় ৭৫ এর বেশি নম্বর পেয়েও তারা প্রিলিমিনারি উত্তীর্ণ হতে পারেনি। বিপরীতে ৬০ এর মতো নম্বর পেয়ে কোটাধারীরা প্রিলিমিনারি পার হয়ে গেছে।

বৈষম্যমূলক এই কোটা প্রথার প্রতিবাদে গত কয়েক বছর ধরেই বঞ্চিত মেধাবীরা আন্দোলন করে আসছিল। কিন্তু প্রত্যেকবারই এই আন্দোলনকে জামায়াত-শিবিরের চক্রান্ত আখ্যায়িত করে তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ দমিয়ে দিয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।