জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ, ইসিকে বাতিলের আদেশ

জামায়াতকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া নিবন্ধন অবৈধ বলে রায় দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে নিবন্ধন বাতিলের আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একটি রিট আবেদনের ভিত্তিতে হাইকোর্টের জারি করা রুলের চূড়ান্ত রায়ে বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল-হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বৃহত্তর (লার্জার) বেঞ্চ।

বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটা থেকে রিটটির (নম্বর: ৬৩০/ ২০০৯) রায় ঘোষণা শুরু করেন আদালত। তিন বিচারপতির লার্জার বেঞ্চ ৫ মিনিটে রায় ঘোষণা করেন।

গত ১২ জুন রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে যে কোনো দিন রায় দেবেন বলে জানিয়ে অপেক্ষমান (সিএভি) রাখেন হাইকোর্টের বৃহত্তর (লার্জার) বেঞ্চ।

২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি জারি করা রুলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভুত এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০বি (১) (বি) (২) ও ৯০ (সি) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়। গত ১১ মার্চ জামায়াতে ইসলামী ও ইসিকে ৯ এপ্রিলের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলেছিলেন হাইকোর্ট।

গত ১১ এপ্রিল রুলের চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়ে ৯ কার্যদিবসে শেষ হয়। ওই দিন আদালতে হলফনামা আকারে ইসির জবাব দাখিল করা হয়। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর। জামায়াতের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ও বেলায়েত হোসেন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মহসীন রশিদ ও তৌহিদুল ইসলাম।

ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর ১৮ এপ্রিল রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি শেষ করেন। আর গত ২৫ এপ্রিল শুনানি শেষ করেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আইনজীবী মহসীন রশীদ। এর পর ২২ মে থেকে জামায়াতের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন ও অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার।

শুনানিতে আদালতে ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর বলেন, যে গঠনতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে জামায়াতকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল নিবন্ধনের অযোগ্য। তাই নিবন্ধনের পর ওই গঠনতন্ত্র সংশোধনের সুযোগ নেই। জামায়াতের নিবন্ধন সংবিধানের ৭ ও ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ পরিপন্থী।

তিনি বলেন, সংবিধানে রাজনৈতিক দল করার মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো দলের গঠনতন্ত্র সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে, দলের নীতিতে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বৈষম্য থাকলে সংগঠন বা রাজনৈতিক দল করা যাবে না।

তানিয়া আমীর বলেন, গণতন্ত্রের মূল বক্তব্য হচ্ছে সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু জামায়াতের গঠনতন্ত্র সংবিধানের এ ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তিনি বলেন, জামায়াতের জন্ম হয়েছে ভারতে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দলটির শাখা রয়েছে। তাই ইসি দলটিকে নিবন্ধন দিতে পারে না। বিদেশে শাখা থাকলে নিবন্ধনের জন্য দলটির ইসির দরজা দিয়ে ঢোকার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন বলেছে, এটা সাময়িক নিবন্ধন বা প্রভিশনাল রেজিস্ট্রেশন। কিন্তু ইসির আইনে কোথাও প্রভিশনাল নিবন্ধনের বিধান খুঁজে পাইনি।

তিনি বলেন, জামায়াত ইসিতে যে গঠনতন্ত্র জমা দিয়েছে তা শোধরাবার অবকাশ নেই। যেটা জমা দিয়েছে সেটাই বিবেচনায় নিতে হবে। এটা শুরু থেকে বা জন্ম থেকেই অবৈধ।

ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, ইসি এখনও নিবন্ধনের বিষয়ে পরিপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তে আসেনি। তারা কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া না পর্যন্ত রিট আবেদন অপরিপক্ক।

তিনি বলেন, ২০১২ সালে ইসি একটি মেমো তৈরি করে। সেখানে মাত্র দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও জাসদ ছাড়া বাকি সকল দলের গঠনতন্ত্র ছিল ত্রুটিপূর্ণ। তাই জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করতে হলে বাকি ১০টি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল করা প্রয়োজন হবে। এটা করা ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, যারা জামায়াতের নিবন্ধন চ্যালেঞ্জ করেছে তাদের গঠনতন্ত্রেও জিহাদ ও ইসলামের কথা রয়েছে। কিন্তু জামায়াতের গঠনতন্ত্রে জিহাদের কথা নেই। এ কারণে রিট করা হয়েছে অসৎ উদ্দেশ্যে।

ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বিষয়ে ২০০৮ সালে আইন হয়। এ আইন পরিপূর্ণ নয়। পাকিস্তানে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন নিয়ে আইন হয়েছিল। কিন্তু সেটা পরিপূর্ণ না হওয়ায় সেদেশের আদালত নিবন্ধন আইন বাতিল ও অবৈধ বলে রায় দিয়েছে।

ইসির আইনজীবী মহসীন রশিদ বলেন, ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর জামায়াতকে সাময়িক নিবন্ধন দেওয়া হয়। সে সময় সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ও রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামের কথা ছিল। তখনকার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সাময়িক নিবন্ধন দেওয়া হয়। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার লক্ষ্য নিয়েই তখন ইসি এ সিদ্ধান্ত নেয়। তখন ইসির সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।

তিনি বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী হয়েছে জামায়াতকে সাময়িক নিবন্ধন দেওয়ার অনেক পরে।

বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী, জাকের পার্টির মহাসচিব মুন্সি আবদুল লতিফ, সম্মিলিত ইসলামী জোটের প্রেসিডেন্ট মওলানা জিয়াউল হাসানসহ ২৫ জন জামায়াতের নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০৯ সালে রিট আবেদনটি করেন। জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, নির্বাচন কমিশনসহ চারজনকে রিটে বিবাদী করা হয়। তারা জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের আরজি জানান।

এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক (পরর্বতীতে প্রধান বিচারপতি) ও বিচারপতি মো. আবদুল হাইয়ের হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি রুল জারি করেন। ৬ সপ্তাহের মধ্যে বিবাদীদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রিট আবেদনকারীরা বেঞ্চ গঠনের জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেন। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৫ মার্চ আবেদনটি বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেনের নেতৃত্বাধীন দ্বৈত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠানো হয়। ১০ মার্চ সাংবিধানিক ও আইনের প্রশ্ন জড়িত থাকায় বৃহত্তর বেঞ্চে শুনানির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে আবেদনটি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানোর আদেশ দেন দ্বৈত বেঞ্চ। ওই দিন প্রধান বিচারপতি তিন বিচারপতির সমন্বয়ে বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে দেন।

জামায়াতের নিবন্ধন নিয়ে রুল জারির পর ওই বছরের ডিসেম্বরে একবার, ২০১০ সালের জুলাই ও নভেম্বরে দুইবার এবং ২০১২ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে দুইবার তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়। এসব সংশোধনীতে দলের নাম ‘জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ’ পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ করা হয়।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।