শনিবার, অক্টোবর 16, 2021
শনিবার, অক্টোবর 16, 2021
শনিবার, অক্টোবর 16, 2021
spot_img
Homeবাংলাদেশপ্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতির অতি উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতির অতি উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, সংসদীয় নিয়ন্ত্রণে ঘাটতির কারণে প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতির অতি উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে এমন ২১টি  দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাংলাদেশের সঙ্গে একই পর্যায়ে রয়েছে চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাহরাইনের মতো দেশ।

মঙ্গলবার ব্রাসেলস থেকে ‘ওয়াচডগস’ ৮২টি দেশে ‘প্রতিরক্ষা খাতের ওপর সংসদীয় নজরদারির গুণগত মাত্রা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর সংসদীয় নজরদারি দুর্বল।

প্রতিবেদনে ৮২টি দেশকে দুর্নীতির ঝুঁকির বিচারে ছয়টি গ্রুপে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো: সর্বনিম্ন ঝুঁকিসম্পন্ন  (চারটি দেশ), নিম্ন ঝুঁকিসম্পন্ন (১২টি দেশ), মধ্যম ঝুঁকিসম্পন্ন (১৪টি দেশ), উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ (১৭টি দেশ), অতি উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন (বাংলাদেশসহ ২১টি দেশ) এবং চরম ঝুঁকিসম্পন্ন (১৪টি দেশ)।

প্রতিবেদন অনুযায়ী চরম ঝুঁকিতে রয়েছে ১৪টি দেশ, যাদের মধ্যে আলজেরিয়া, মিসর, ইরান, লিবিয়া, কাতার, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, সিরিয়া ও ইয়েমেন অন্যতম। অন্যদিকে সর্বনিম্ন ঝুঁকিতে রয়েছে মাত্র চারটি দেশ- অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্য।

যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া রয়েছে নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায়। মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, ইতালি, আর্জেন্টিনা ইত্যাদি। প্রতিবেশী দেশ ভারত, ইসরায়েল, ইন্দোনেশিয়া, রাশিয়ার অবস্থান রয়েছে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা খাতে ২৯ ধরনের দুর্নীতির ঝুঁকি রয়েছে এবং দুর্নীতির কারণে বিশ্বের সামরিক খাতে ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে বার্ষিক ২০ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে প্রতিবেদনভুক্ত ৮২টি দেশের সামরিক ব্যয়ের সামগ্রিক পরিমাণ ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের ৯৪ শতাংশ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিরক্ষা খাতের ২৯টি দুর্নীতির ঝুঁকিকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছে। এগুলো হলো রাজনৈতিক, আর্থিক, জনবল-সংশ্লিষ্ট, পরিচালনা ও ক্রয়সংক্রান্ত।

প্রতিবেদনটি সম্পর্কে দেয়া এক বিবৃতিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংস্থায় সংসদীয় জবাবদিহি আনা সময়ের দাবি। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে একদিকে ক্রমবর্ধমান হারে বড় ধরনের ক্রয়, অন্যদিকে এ বিষয়টিকে যেভাবে কোনো ধরনের আলোচনা, বিতর্ক ও পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব ও সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে এক আলাদা জগৎ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির জন্য মঙ্গলজনক নয়।”

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “শুধু সামরিক একনায়কতন্ত্র বা সামরিক বাহিনীর প্রভাববলয়ে পরিচালিত সরকার ছাড়া বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশে এই ধ্রুব সত্যকে মেনে নেয়া হয় যে, সশস্ত্র বাহিনী সর্বদা বেসামরিক কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে থাকবে।  এই নজরদারি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার বৈশ্বিক চিত্র গভীর উদ্বেগজনক।”

প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওপর সংসদীয় নজরদারির কার্যকারিতা বাড়াতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল দুটি কৌশলের ওপর গুরুত্বারোপ  করেছে। এর প্রথমটি হলো প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পরামর্শক গ্রুপ গঠন, যেখানে সংশ্লিষ্ট  কারিগরি বিশেষজ্ঞরা ছাড়াও সুশীল সমাজ, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা এবং এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বা শিক্ষকরা অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।

দ্বিতীয় কৌশলটি হলো সরকারের নির্দেশে অডিটর জেনারেলের নেতৃত্বে গঠিত একটি নিরপেক্ষ রিপোর্টিং সংস্থা, যারা প্রতিরক্ষা বাজেটের অপব্যবহার বা অপচয়সংক্রান্ত তথ্য সংসদ সদস্য ও জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করবে। এই সংস্থা প্রাপ্ত তথ্যের যথার্থতা অনুসন্ধান করে এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য সংসদের কাছে প্রতি বছর উপস্থাপন করবে।

প্রতিবেদনে সংসদ, নির্বাহী বিভাগ, অডিট অফিস ও সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের জন্য ১৫ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো:

সংসদ
১.    সর্বদলীয় প্রতিরক্ষা কমিটি প্রতিষ্ঠা করে সরকার ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ওই কমিটির কাছে প্রমাণসহ জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
২.    প্রতিরক্ষা বাজেটের গোপনীয় ব্যয় ও গোয়েন্দা বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে পর্যালোচনার জন্য বিশেষায়িত সংসদীয় কমিটি গঠন করা।
৩.    প্রতিরক্ষা বিষয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও তা প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
৪.    প্রতিরক্ষা বাজেটে দুর্নীতির ঝুঁকি এড়ানোর জন্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা সহায়তা গ্রহণ প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা।

নির্বাহী বিভাগ
১.    সংসদ সদস্যরা যেন গোপন বাজেট, গোয়েন্দা বিষয়সহ প্রতিরক্ষার সব বিষয়ে নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য বৃদ্ধি ও অর্থ বরাদ্দ করা।
২.    প্রতিরক্ষা বাজেটসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও যাবতীয় কাগজপত্র সংসদকে দেয়া। সংসদ থেকে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর ও তথ্য সময়মতো ও পরিপূর্ণভাবে প্রদান করা।
৩.    সংসদীয় প্রতিরক্ষা কমিটিকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা দেয়া, যেন তারা প্রতিরক্ষা বাজেট নিরীক্ষা এবং প্রয়োজনে ভেটো দিতে পারে। এই ক্ষমতা গোপন বাজেট ও প্রতিরক্ষা ব্যয় স্থগিত করা পর্যন্ত সম্প্র্রসারিত করা প্রয়োজন।
৪.    প্রতিরক্ষা তথ্যের শ্রেণীকরণ ও গোপনীয়তার মাত্রা সুনির্দিষ্টকরণে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা।
৫.    প্রতিরক্ষা ব্যয় নিরীক্ষার জন্য স্বতন্ত্র স্বাধীন অডিট অফিস প্রতিষ্ঠা করা এবং এর প্রতিবেদন জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা।

অডিট অফিস
১.    সংসদ সদস্য ও জনগণের জন্য সুস্পষ্ট, স্বচ্ছ ও বিস্তারিত অডিট প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ করা।
২.    নিরীক্ষা পরিচালনার আগে কারিগরি ঘাটতি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়ার জন্য সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করা।
৩.    প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হয়ে অডিট অফিসের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা এবং অডিট রিপোর্ট ব্যাখ্যা করা।

সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম
১.    প্রতিরক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি জোরালো করা, প্রতিরক্ষা বাজেট, গোপন বাজেট ও গোয়েন্দা বাহিনীর কর্মকাণ্ড পরীক্ষা-নিরীক্ষার লক্ষ্যে কার্যকর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের জন্য সংসদ ও সরকারের সঙ্গে অ্যাডভোকেসি করা।
২.    প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং এই খাতের নজরদারির উন্নয়নে সংসদ সদস্য বা সরকার সহায়তা চাইলে তা প্রদান করা।
৩.    প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ওপর সংসদের নজরদারির গুরুত্ব সম্পর্কে জনবিতর্ক ও চাহিদা সৃষ্টিতে কার্যক্রম গ্রহণ করা।


সম্পাদনা: শামীম ইবনে মাজহার,নিউজরুম এডিটর

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments