রবিবার, অক্টোবর 24, 2021
রবিবার, অক্টোবর 24, 2021
রবিবার, অক্টোবর 24, 2021
spot_img
Homeবাংলাদেশ‘যে ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর ফাঁসি হয়, আমি তো বড় গোনাহগার’: সা.কাদের

‘যে ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর ফাঁসি হয়, আমি তো বড় গোনাহগার’: সা.কাদের

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় দিয়েছেন প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল।

মঙ্গলবার বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেন। সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে শুরু করে দুপুর সোয়া একটায় রায় পড়া শেষ হয়।

এই আড়াই ঘণ্টা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় ছিলেন। কখনো তিনি দাঁড়িয়েছেন, আবার কখনো বসেছিলেন। তবে মাঝেমধ্যেই নিজের স্বভাবসূলভ আচরণের প্রকাশ ঘটাচ্ছিলেন বিএনপির এই বিতর্কিত নেতা।

সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরিহিত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পায়ে ছিল চকলেট  রঙের জুতা। চোখে চশমা। ট্রাইব্যুনালের আসার পর হাজত খানায় বসে সিগারেট শেষ করে ১০টা ৪২ মিনিটে তাকে এজলাসে হাজির করা হয়।

এজলাস কক্ষে এসে পানি পান করে আসামির নির্ধারিত কামরায় রাখা চেয়ারে বসলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য। প্রথম দিকে কয়েক মিনিট তাকে চিন্তিত মনে হলেও তা বেশিক্ষণ থাকেনি।

এরই মধ্যে একে একে ট্রাইব্যুনালে হাজির হন তার স্ত্রী, মেয়ে, দুই ছেলে, ছেলের বউ, ফুফু ও ভাতিজারা। ১০টা ৪৪ মিনিটে রায় পড়া শুরু হলে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেননি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী।

রায় পড়াকালীন বিচারপতি একবার বলেন, ‘তিনি ৫ বারের সংসদ সদস্য।’ সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে তার প্রতিবাদ করেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘জনগণ আমাকে ৬ বার সংসদে পাঠিয়েছে। তবে যেহেতু আপনারা রায়ে ৫ বার লিখেই ফেলেছেন, তাই থাকুক।’

এ সময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী উচ্চস্বরে বিচারপতিদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন, ‘কী রায় আর দিবেন! রায় তো গতকালই বেরিয়ে গেছে। যা পড়ার পড়ে ফেলেছেন, আর না পড়াই ভালো। বাকি রায়টুকু ওয়েবসাইট থেকে নিয়ে নিলেই তো হয়!’

এ সময় সেখানে তার স্ত্রী ফারহাদ কাদের চৌধুরী বলেন, ‘ওয়েবসাইটে যে রায় প্রকাশিত হয়েছে, তাই পড়া হচ্ছে। এ রায় আইন মন্ত্রণালয় থেকে বেরিয়েছে।’

এতে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী হাসতে থাকেন। আর বলতে থাকেন, ‘এতদিন বলা হয়েছে দেশি আইনে বিচার হচ্ছে। এখন বলা হচ্ছে, বিদেশি আইন। সরকারের আইনমন্ত্রীও বলেছেন তারা আন্তর্জাতিক আইনে বিচার করছেন।’

রায় পড়াকালীন একবার বিএনপির এই স্থায়ী কমিটির সদস্য কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনকে লক্ষ্য করে বলতে থাকেন, ‘আইন করেছি আমরা। তাই তোরা জজ হইছছ। দুদিন আগে প্রকাশিত রায়ও তো তোরা ঠিকমত রিডিং পড়তে পারছছ না। দুঃখ লাগে তোদের কেন যে চাকরি দিলাম।’

তিনি বলতে থাকেন, ‘আমাকে নির্বাচন করতে না দেওয়ার জন্য বেচারারা এত কষ্ট করছে। ’৯৬ সালে বিএনপি থেকে যখন বাদ পড়েছিলাম, তখন আমি ছিলাম দেশপ্রেমিক। পরে আবার বিএনপিতে যোগ দেওয়ায় আমি আসলে কবীরা গুণা করে ফেলেছি।’

এ সময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ট্রাইব্যুনালের রায়কে ‘সহীহ হাদীস’ বলেও আখ্যা দেন। আর তার এই কথায় ট্রাইব্যুনালের উপস্থিত লোকজন যেমন বিব্রত হতে থাকেন, তেমনি বেশ মজাও পান।

কিন্তু সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী কারও কেয়ার না করে উচ্চস্বরে বলতেই থাকেন, ‘এই রায় বেলজিয়াম ও দিল্লি থেকে লিখে আনা হয়েছে। স্যার (বিচারপতি) এগুলো অনলাইনে চলে এসেছে। পড়ার দরকার নেই। গত দুদিন আগেই তা প্রকাশ পেয়েছে। এখন খামোখা পড়ে লাভ কী? সময় নষ্ট।’

এক পর্যায়ে বিচারপতিরা তাদের রায় পড়া বন্ধ করে দেন। তবে কয়েক সেকেন্ড পর আবার তা পড়া শুরু হয়। রায় পড়া বন্ধ করে বিচারপতিরা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর দিকে তাকান কিন্তু কেউ কোনো কথা বলেননি।

বিচারপতিদের পড়ায় এগিয়ে যেতে থাকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর একের পর এক অভিযোগ। তাতে তিনি দোষী কিনা, তা। বিচারপতিরা বলতে থাকেন, এত নং অভিযোগে নন গিল্টি, অথবা এত নম্বর অভিযোগে গিল্টি।

এমনই এক পর্যায়ে বিএনপির এই বিতর্কিত নেতা বলে ওঠেন, ‘এখন সংসদ অধিবেশন চলছে। আর তারা জবর-দস্তি করে রায় দিয়ে দিচ্ছে। যেসব জায়গায় আমি জীবনেও যাইনি, এমন কী ভোট চাইতেও না। অথচ রায়ে বলা হচ্ছে, আমি সেখানে গিয়ে মানুষ হত্যা করেছি।’

তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিদেশিদের সাহায্য চেয়েছেন।’ এ সময় এজলাসের পাশে দাঁড়িয়ে ইংরেজী একটি দৈনিকের প্রতিবেদককে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘তুমি যে পত্রিকায় কাজ কর, তা বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশনায় চলে। তোমার সম্পাদককে বইলো, আমি তাকে স্মরণ করেছি।’

রায়ে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘তিন নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত।’ তৎক্ষণাত সালাহউদ্দিন তাদের চৌধুরী তাকে উদ্দেশ্য করে হাসি দিয়ে অশ্লীল বাক্য ছুঁড়ে দেন। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভাষায়, ‘তোমার বইনের (বোন) লগে আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, শা…(প্রকাশ করার অযোগ্য)।’

এ সময় স্বভাবসূলত ভঙ্গিতে ঠিকই বলে ওঠেন, ‘সোনা আমার লাল হইয়া গেছে কিন্তু এখনও ঠিকই আছে। ফাঁসি দিবা, তো দাও সমস্যা নাই।’

এক পর্যায়ে যোহর নামাযের আযান শুরু হলে কিছুক্ষণ রায় পড়া বন্ধ করেন বিচারপতিরা। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলতে থাকেন, ‘আযানের সময় নাস্তিকরা এভাবে মুখ বন্ধ কইরা দিলো, অথচ তারাই সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস  উঠিয়ে দিয়েছে।’

এ সময় বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘সাঈদী (জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী) সাহেবের মত লোককে যেখানে ফাঁসি দেওয়া হয়, সেখানে আমি তো অনেক বড় গোনাহগার। কাদের মোল্লাকে তো আদালত কসাই কাদের বইলা ফাঁসি দিয়া দিছে।’

তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্যে করে বলতে থাকেন, ‘উনি (শেখ হাসিনা) দেশটারে একটা পাগলাখানা বানাইছে।’ আরও বলতে থাকেন, ‘The man leading in the blind that is the plague of our time।’

বিচারপতিরা যখন একে তাকে বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত করছে তখন তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘no never’।

প্রথম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবীর যখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির আদেশ ঘোষণা করেন, তখন তিনি বলেন, ‘এই রায় মন্ত্রণালয় থেকে বেরিয়েছে। দুদিন আগে তা থেকে ইন্টারনেটে প্রকাশিত হয়েছে। সুন্দর একটা রায় লেখায় আইন মন্ত্রণায়লক ধন্যবাদ।’

পুরো রায় পড়াকালীন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বেশ স্বাভাবিক ছিলেন। এমন কি ফাঁসির আদেশ শোনার পরেও তিনি বিচলিত হননি। বরং তাকে ঘিরে থাকা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে মজা করতে থাকেন। রায় নিয়ে ব্যাপক ব্যঙ্গ ও হাস্যকর মন্তব্য করেই মূলত পুরোটা সময় পার করেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী।

সুত্র:আরটিএনএন

 

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments