কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ গত দেড় মাসে নিহত ৪৬

তীব্র সমালোচনার পরেও তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ কিংবা ‘ক্রসফায়ার’ নামক বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা রাজধানীসহ সারা দেশে দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী ও পুলিশের সঙ্গে এই কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ গত দেড় মাসে অন্তত ৪৬ জন হত্যার শিকার হয়েছেন।

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী- চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ থেকে শুরু করে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মোট ৪৬ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে র্যা বের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১৫ জন, পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ২২ জন, র্যা ব ও পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ একজন, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ একজন এবং যৌথবাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১৬ জন নিহত হয়েছেন।

এই ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যা শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালে ‘এলিট ফোর্স’ হিসেবে র্যারপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যা০ব প্রতিষ্ঠার পর। শুধু ২০০৫ ও ২০০৬ সালেই র্যা বের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন ৭৩৯ জন মানুষ।

সে সময় প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছিল। সে সময় তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ক্ষমতায় এলে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে এই ধরনের হত্যাকাণ্ড তথা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বন্ধ করে দেবে। কিন্তু ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত তারাও ঠিক একই পদ্ধতিতে অন্তত ২২৯ জন মানুষকে হত্যা করেছে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পরে ২০০৬ সালে তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’র মাধ্যমে এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে, যা ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের পরেও বহাল ছিল। তবে ২০১২ সাল থেকে তা আবার শুরু হয়। এ বছর তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে ৯১ ব্যক্তি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়- ২০০৪ সালে ২১০ জন, ২০০৫ সালে ৩৭৭ জন, ২০০৬ সালে ৩৬২ জন, ২০০৭ সালে ১৮০ জন, ২০০৮ সালে ১৭৫ জন, ২০১০ সালে ১৩৩ জন এবং ২০১১ সালে ১০০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

তবে গত বছর থেকে চিত্রটি ভিন্ন হয়ে গেছে। ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ২০১৩ সালেই মারা গেছেন অন্তত ২০৮ ব্যক্তি। এছাড়া, গত ১০ বছরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে অপহৃত ব্যক্তিদের সংখ্যাটিও বেশ বড়।

প্রসঙ্গত, এই অপহৃত ব্যক্তিদের পরবর্তী সময়ে আর কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মানবাধিকার কর্মীরা জানান, গত ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’র  ঘটনা হঠাৎ করেই আশংকাজনক হারে বেড়ে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতদের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে আখ্যায়িত করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান জানান, এই ধরনের হত্যাকাণ্ড সব সময়েই আইন ও গণতন্ত্রের বিপক্ষে বলে এগুলো কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি বলেন, “এই অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিত। তাহলেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের এই প্রবণতা বন্ধ করা যাবে।”

অবশ্য পুলিশের মহাপরিদর্শক আইজিপি মাহমুদ খন্দকারের ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধীদের জন্য এই ধরনের হত্যাকাণ্ড ও গুম বা অপহরণ নতুন কিছু নয় এবং এই ধারা চলতেই থাকবে। তিনি বলেন, “নিরাপত্তা বাহিনীগুলো এই ধরনের অপরাধ সম্পর্কে অবগত আছে এবং এই অপরাধীদের গ্রেফতারের ব্যাপারে তারা সফলও হচ্ছে।”

‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে তিনি জানান, এ ধরনের কোনো অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে এবং তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ‘বন্দুকযুদ্ধে’র ঘটনাই একতরফা এবং সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত। এসব ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত পুলিশ সদস্যরা নিজেদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে একটি গৎবাঁধা প্যাটার্ন অনুসরণ করেন। অধিকাংশ ঘটনার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে- পুলিশ, র্যা ব কিংবা ডিবি কর্মকর্তা হিসেবে নিজেদের পরিচিতি দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা মানুষজনকে তুলে নিয়ে যায়। নিরাপত্তা বাহিনীর তুলে নেয়ার পর আর না ফিরে আসা ব্যক্তিদের তালিকায় ছাত্র, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং বিরোধী দলের অজস্র নেতার নাম রয়েছে। কখনো এই ব্যক্তিদের মৃতদেহ হয়তো খুঁজে পাওয়া যায়, কিংবা কখনো তারা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যান। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায় যে, মৃত ব্যক্তি একজন অপরাধী ছিলেন। বেশ কয়েকবার তাদের এই দাবি মিথ্যা হিসেবেও প্রমাণিত হয়েছে। কখনো কখনো এও দাবি করা হয় যে, আটককৃত ‘অপরাধী’র পক্ষের লোকেরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর অস্ত্র চালায় বলেই সম্পূর্ণ আত্মরক্ষার্থে তারা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ লিপ্ত হতে বাধ্য হন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ি এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধসংক্রান্ত কোনো পূর্ব অভিযোগ ছিল না। সেদিন ঘটনাস্থলে সালাউদ্দীন (২৯) এবং জুয়েল (২৮) নামের দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে সালাউদ্দীনের বিরুদ্ধে আটটি হত্যা মামলা থাকলেও নিহত জুয়েলের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই ছিল না। জুয়েল কাপ্তানবাজার এলাকার একজন ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তিনি ফিল্টার যন্ত্রপাতি বেচতেন।

নিহত জুয়েলের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ি পুলিশ কোনো মামলা কিংবা সাধারণ ডায়েরি বা নিদেনপক্ষে কোনো অভিযোগই দেখাতে পারেনি। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ি থানার উপ-পরিদর্শক এসআই প্রদীপ কুমার কুন্ডুও জুয়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগসংক্রান্ত বৈধ কোনো কাগজ বা দলিলপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে ডেমরা পুলিশ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার মহিউদ্দীন আহমেদ জানান, জুয়েলের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না থাকলেও বিভিন্ন মামলার আসামি সালাউদ্দীন একজন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেয়া তিনটি পৃথক স্বীকারোক্তিতে জুয়েলের নাম উল্লেখ করেছিলেন।

জুয়েলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে শনির আখড়া এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল হক বলেন, “অপরাধী হিসেবে সালাউদ্দীনের নাম আমাদের পরিচিত হলেও জুয়েলের নাম আমরা কখনো শুনিনি। জুয়েলের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল বলেও অন্তত আমি তো জানি না।”

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং অপহরণ-গুম বন্ধ করতে হলে সরকারের স্বদিচ্ছা এবং রাজনৈতিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী এলিনা খান। তিনি বলেন, “কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হয়ে গেলে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় থানায় অভিযোগ জমা দেন। আর এসব অভিযোগের অধিকাংশই করা হয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে। যদি এসব ঘটনার সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো সম্পর্কই না থাকবে, তাহলে সব অভিযোগে ধারাবাহিকভাবে শুধু তাদের নামই কেন উঠে আসছে?”

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভাটারা থানা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর হাসান অঞ্জন গত ২৮ জানুয়ারি নিখোঁজ হন। এই বিষয়ে একাধিক অভিযোগ দায়ের করা হলেও পুলিশ, র্যা ব এবং ডিবি কর্মকর্তারা তাকে শনাক্ত করার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র অগ্রগতি লাভ করতেও ব্যর্থ হয়েছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক নেতা আসাদুজ্জামান রানা, মাজহারুল ইসলাম এবং আল-আমিন রাজধানীর বারিধারা এলাকা থেকে নিখোঁজ হন গত বছরের ৪ ডিসেম্বর। ঘটনার পরে মুগদা থানায় রানার বোন মিনারা বেগম একটি সাধারণ ডায়েরি দায়ের করার পর এখনো পর্যন্ত পুলিশ এই ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।

এদিকে, নিখোঁজ এই তিনজনের বিরুদ্ধে কোনো থানা এমনকি নগরীর কোতয়ালি থানাতেও কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, ছাত্রদলের নেতা হিসেবে এই তিনজন বেশ পরিচিত হলেও তারা কোনো অপরাধ বা সংঘর্ষমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে কারো জানা নেই। সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।