রবিবার, অক্টোবর 24, 2021
রবিবার, অক্টোবর 24, 2021
রবিবার, অক্টোবর 24, 2021
spot_img
Homeউপজেলাকারাবন্দি বাবার জন্য ভোট চাইতে মেটোপথে দুই শিশু !

কারাবন্দি বাবার জন্য ভোট চাইতে মেটোপথে দুই শিশু !

তাসিন, বয়স মাত্র ৩ বছর! এখনও স্কুলে যাওয়ারও সুযোগ হয়নি। মায়ের আঁচল জড়িয়েই যার কাটে দিন-রাত। আর সালসাবিল আহমদ তাসফি বয়সে ৮ বছরের শিশু। নাই্যংছড়ি বর্ডার গার্ড স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী। ছোট্ট এই দুই শিশু, ছোট দুই ভাই-বোনকে মায়ের কোল ছেড়ে নামতে হয়েছে গ্রামের মেটোপথে! তাসফি হাতে লিফলেট নিয়ে, আর ছোট তাসিন কোন আংকেলের কাঁধে চড়ে মাঠ-ঘাট ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেবলই একটি আশায়, ভোট পেলে তাদের বাবা তাদের কাছে ফিরে আসবেন। মুক্তি পাবেন বন্দিশালা থেকে!

হ্যাঁ, এরা সেই দুই ছেলে-মেয়ে, যাদের বাবা তোফাইল আহমদ। যিনি ছিলেন পার্বত্য নাই্যংছড়ি উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান আর আগামি ২৩ মার্চের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ১৯ দলের ‘পূর্ণাঙ্গ’ সমর্থন পেয়ে কারাগার থেকেই উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছেন।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে ‘রামু বৌদ্ধ বিহার সহিংসতা’র ঘটনায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সেই অভিযোগে জড়িয়ে তোফাইল আহমদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি প্রায় ১৮ মাস ধরে কক্সবাজার জেলা কারাগারে অন্তরীন রয়েছেন। যদিও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি বেসরকারি ভাবে যতগুলো তদন্ত করা হয়েছিল তার কোনটিতেই রামু বৌদ্ধ বিহারে হামলা বা অগ্নিসংযোগের সাথে তোফাইল আহমদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রামু সহিংসতায় দায়ের করা কোন মামলায়ও তাঁকে আসামি করা হয়নি। অথচ রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতার কারণেই তোফাইল আহমদকে রামু সহিংসতায় জড়াতে ও গ্রেপ্তার করাতে সরকারি দলের একটি প সবসময় কাজ করেছে। নাই্যংছড়ি উপজেলার পাহাড়ি-বাঙ্গালি সাধারণ মানুষরা এমনটাই মনে করেন।

কারাবন্দি তোফাইল আহমদ কারাগারে বন্দি হওয়ার পর তাঁর সহধর্মিনী ও স্কুল শিকিা মনোয়ারা বেগম জেসমিন ছোট্ট দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে সংসারটা টেনে গেছেন। তাসফি ও তাসিন, দুই ছেলে মেয়ে ১৮ মাস ধরেই বাবার মুখ দেখেনি। কারাগারে বন্দি বাবাও বারবারই নিষেধ করেছেন, তাঁর ছেলে-মেয়েকে যেন কারাগারে নেয়া না হয়, তিনি তাদের কষ্ট সইতে পারবেন না!কারাবন্দি বাবার জন্য ভোট চাইতে মেটোপথে দুই শিশু !

সেই থেকে তারা বাবার আদর থেকে বঞ্চিত, দেখছে না বাবার প্রিয় মুখ! সেই বাবাকেই ফিরে পেতে নির্বাচনী মাঠে নেমেছে এই অবুঝ দুই শিশু।
পার্বত্য বান্দরবান জেলার দূর্গম এই উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, কারাবন্দি বাবার জন্য ভোট চাইতে ঘুরছে এই দুই শিশু। মেয়ে তাসফি হাতে লিফলেট নিয়ে গ্রামের দোকানে বাজারে ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে ভোট চাইছে। আর ৩ বছরের তাসিন কোন ভোটার আংকেলের কাঁধে চড়ে মিছিলে হাত নাড়তে নাড়তে মানুষকে বাবার জন্য ভোটে আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

গত বুধবার তাদের পারিবারিক সূত্র জানিয়েছেন, গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে অসুস্থ হয়ে পড়েছে ছোট্ট তাসিন। পারিবারিক সূত্রের দাবি, বাবার জন্য ভোট চাইতে মাঠে নামলেও সাধারণ ভোটাররা বাবার আদর বঞ্চিত এই দুই শিশুকে কাছে পেতে যেন উদগ্রীব। যেখানেই তোফাইল আহমদের ভোটের প্রচারণা চলছে, সেখানকার মানুষের একটাই দাবি, তোফাইলের ছেলে মেয়েদের যেন তাদের গ্রামেও আনা হয়!

এভাবেই চলছে বাবার জন্য দুই ছেলে মেয়ের ভোটের প্রচারণা। সাথে যুক্ত হয়েছে ১৯ দলের পূর্ণ সমর্থন। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামিসহ ১৯ দলের নেতা-কর্মীরা তোফাইলের নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন। বান্দরবান জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সাচিং প্র“ জেরী নিজেই নেমেছেন ভোটের প্রচারণায়। এছাড়াও নবনির্বাচিত পার্বত্য বিভিন্ন উপজেলার চেয়ারম্যানরাও নেমেছেন তোফাইলের ভোটযুদ্ধের সৈনিক হিসেবে!
নাই্যংছড়ি উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল আলম কোম্পানি ও উপজেলা জামায়াতে ইসলামির আমীর রফিক আহমদ যৌথভাবে নির্বাচন সমন্বয় করছেন।
নাই্যংছড়ি উপজেলা সদরের সাধারণ মানুষের ধারণা, তোফাইল কারাগারের বাইরে থাকলে কী হতো তা বলা মুশকিল। তবে এই অবস্থাতেও কারাবন্দি তোফাইল যে ৮০ শতাংশ ভোটই পাচ্ছেন তা নিশ্চিত!

কারাবন্দি তোফাইল আহমদ কারাগার থেকেই নাই্যংছড়িবাসিদের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। তাতেও তিনি নিজেকে ‘নির্দোষ’ দাবি করে তাঁর দুই সন্তানের কসম খেয়েছেন! তিনি চিঠিতে লিখেছেন, ‘আমি আমার জীবনের সব চাইতে মূল্যবান সম্পদ কলিজার টুকরা, যাদের ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব, সেই ছেলে মেয়ে দুইজনের মাথায় হাত রেখে আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। যদি দোষী হই বা ঘটনা সম্পর্কে জেনে থাকি তাহলে আল্লাহ যেন আমার অমূল্য সম্পদ ছেলে মেয়ে দুইজনকে চিরদিনের জন্য আমার কাছ থেকে নিয়ে যান। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় শপথ আর আছে বলে মনে হয় না।’
তিনি ওই খোলা চিঠিতে নাই্যংছড়িবাসিকে বলেন, ‘আপনারা অবশ্যই ভালো ভাবে জানেন যে, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। যে সকল মামলায় জেলখানায় অসহনীয় যন্ত্রণায় বন্দি রয়েছি, তা সব মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত। রামু বৌদ্ধ মন্দির ভাংচুর, অস্ত্র মামলা, হত্যা মামলাসহ যে সকল মামলায় আসামী করা হয়েছে তার সাথে আমার দূরতম সম্পর্ক নাই ও ছিল না।’

বাবার জন্য ভোটের চেয়ে রাস্তায় নামা সালসাবিল আহমদ তাসফি (৮) জানিয়েছে, সে সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বাবার জন্য ভোট চেয়ে এলাকায় এলাকায় যাচ্ছে। বাবার মুক্তির জন্য ভোট চাইছে। তার বিশ্বাস, ‘ভোটে জিতলে বাবা মুক্তি পাবেন!’

পারিবারিক সূত্রের দাবি, এই অবুঝ দুই শিশু সব ধরণের কষ্ট ভোগ করে মাঠে ময়দানে ঘুরছে। আর রাতে বাসায় ফিরে বাবার জন্য কয়টা ভোট যোগাড় করতে পেরেছে সেই হিসাবও করতে বসে! অবুঝ এই দুই ভাই-বোনের মধ্যেও যেন চলছে বাবার জন্য ভোট সংগ্রহের প্রতিযোগিতা!
নাই্যংছড়ি উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল আলম কোম্পানি জানিয়েছেন, সকল দলের, সকল মতের মানুষ তোফাইলের নির্বাচনী প্রচারণায় নিজেদের ইচ্ছায় অংশ নিচ্ছেন। কেউ কাউকে ডাকছে না, শুধু ভালোবাসার টানে পাহাড়ি-বাঙ্গালি এক হয়ে কাজ করছেন।

তিনি দাবি করেন, এখন দুইজন উপজেলা চেয়ারম্যান কারাবন্দি তোফাইলের হয়ে মাঠে নেমেছেন। কয়েকদিনের মধ্যে মাঠে নামবেন আরও ৫ উপজেলা চেয়ারম্যান।
নাই্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দীপক বড়–য়া দাবি করেন, তোফাইল আহমদ কোন ভাবেই বৌদ্ধ বিহার সহিংসতার সাথে জড়িত নন। তিনি যদি জড়িত থাকতেন তাহলে নাই্যংছড়ির ৩৪টি বৌদ্ধ বিহারের একটি বিহারেও কেন হামলা হলো না!

তিনি জানান, তোফাইলের অপরাধ তিনি জনপ্রিয়, তিনি মানুষের সাথে মেশেন আর তিনি এক সময় ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন! তা নাহলে তোফাইল আহমদের মতো সদাচারি মানুষকে কেন মিথ্যা মামলায় জড়ানো হবে।

প্রসঙ্গতঃ আগামি ২৩ মার্চ পার্বত্য উপজেলা নাই্যংছড়িতে নির্বাচন অনুষ্টিত হবে। এতে চেয়ারম্যান পদে দুইজন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৪ জন ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে দুইজন প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। এরা হলেন চেয়ারম্যান পদে ১৯ দল সমর্থিত প্রার্থী তোফাইল আহমদ ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ শফিউল্লাহ, ভাইস চেয়ারম্যান পদে সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল আবছার, বিএনপি সমর্থিত কামাল উদ্দিন, আওয়ামী লীগ সমর্থিত হাবিব বেগ ও চো চু মং এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ১৯ দল সমর্থিত প্রার্থী হামিদা চৌধুরী ও আওয়ামী লীগ প্রার্থী উজিবা খাতুন রুবি।

নাই্যংছড়ি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ২৪টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে। ১৯ দল সমর্থিত প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ২৪টি কেন্দ্রকেই ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে।
এদিকে এলাকাবাসীর প থেকে অভিযোগ আনা হয়েছে, বান্দরবান পুলিশ সুপার সরকার দলীয় এম.পি বীর বাহাদুরকে এই উপজেলা চেয়ারম্যান পদটি উপহার দিতে চান। এলাকাবাসীর এমন অভিযোগের প্রেেিত বান্দরবান পুলিশ সুপার দেবদাস ভট্টাচার্য্যরে সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি খেলার মাঠে ব্যাট করছেন তাই কথা বলতে পারছেন বলে জানান।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments