একদিনের বাঙালিরা সাবধান!

বছর ঘুরে আবার আসছে পয়লা বৈশাখ, সর্বস্তরের, সব ধর্মের-বর্ণের মানুষের সর্ববৃহৎ উৎসব। আর এ উৎসবকে ঘিরে কিছু অত্যুৎসাহী (শহুরে) মানুষকে একদিনের বাঙালি সাজার জন্য নানা ধরনের দৌড়-ঝাপ, লম্ফ-ঝম্প করতে দেখা যায়। ভাবখানা এমন, যে এই সব কর্মগুলো না করতে পারলে তার বাঙালিয়ানা প্রশ্নের মুখে পড়বে। এর একটি হলো সকালে তথাকথিত পান্তা-ইলিশ খাওয়া। (তথাকথিত এ জন্য বলছি যে, যারা প্রকৃত পান্তাভোগী তাদের কপালে দু’টো পিঁয়াজ আর দু-তিন’টা কাচা মরিচ ছাড়া আদৌ ইলিশ জোটে কি না, তা ‘বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতি’ নিয়ে যারা পড়াশুনা করে তারা গবেষণা করে দেখতে পারেন)।

এই এক দিনের ‘অতি বাঙালি’দের বাঙালিয়ানার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর অসাধু মাছ ব্যবসায়ী কোল্ড স্টোরেজ-এ রাখা বছরাধিক্ পূরানো (বা এরও বেশি) ইলিশ চড়া দামে বাজারে ছাড়ে। আবার কোনো কোনো ব্যবসায়ী মিয়ানমার থেকে বৈধ বা অবৈধ পথে আমদানি করে। এগুলোই সাধারণ খুচরা বিক্রেতারা কিনে পাড়া-মহল্লায় এবং স্থানীয় বাজারে অতি চড়া মূল্যে বিক্রয় করে।

ভয়ানক পরিতাপের বিষয় হলো, এসব ইলিশের শতকরা প্রায় ৯৫ শতাংশই মানবদেহের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ, ক্ষতিকর রাসায়নিক ‘ফরমালিন’ যুক্ত। দীর্ঘ দিন কোল্ড স্টোরেজে থাকার কারণে যেমন ইলিশের স্বাদের বারোটা বাজে তেমনি অতিমাত্রায় ফরমালিনের কারণে ইলিশের সাভাবিক রঙ এবং গন্ধও পরিবর্তি হয়ে যায়। আবার স্বাদও নষ্ট হয়ে যায়। ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে, মাছের স্বাভাবিক রঙ ঝকঝকে রূপার মতো না হয়ে ফ্যাকাশে ও হলুদাভ হয়ে গেছে। লালচে গোলকের মাঝে ইলিশ মাছের কুচকুচে কালো চোখ যেখানে চকচক করার কথা সেখানে দেখা যাবে গর্তে ঢুকানো শুঁটকি মাছের চোখের মতো ম্রিয়মান ফ্যাকাশে কালো চোখ। পুরো মাছ’টাকেই মনে হবে একটা শুঁটকি।

এই অতিরিক্ত ফর্মালিন যুক্ত ইলিশ খেয়ে প্রতি বছরই বহু মানুষ (শিশু, ছেলে, বুড়ো সবাই) পেটের পীঁড়ায় ভোগেন। তাছাড়া ফরমালিনের দীর্ঘ প্রভাবে ক্যানসার, যকৃত ও কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়া, মারাত্মক পীঁড়াদায়ক চর্ম রোগ হওয়াসহ হার্ট বা হৃৎপিণ্ডেরও নানাবিধ ক্ষতি হতে পারে। এ ব্যাপারে সবাই যথেষ্ট সচেতন এবং সতর্ক হতে হবে। বাজার থেকে মাছ কেনার সময় সচেতনভাবে সতর্ক হয়ে কিনতে হবে; তা অভিজাত বিপণি-বিতানই হোক আর গ্রামের হাটে-বাজারে বা পাড়া মহল্লার খোলা বাজার থেকেই হোক।

আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি ঠিক কিন্তু একদিনের বাঙালি সেজে যম-খাওয়া না খেলে বাঙালিয়ানা নষ্ট হবে না। আমরা আমাদের ঐতিহ্য নিশ্চয়ই রক্ষা করে চলব, অবশ্যই আমাদের জাতীয়, আঞ্চলিক ও সামাজিক ও ধর্মীয় প্রথাগুলো পালন করবো। সে জন্য অজান্তে নিজের শারীরিক ক্ষতি করে নয়। শরীরটা তো আপনার, আপনার ক্ষতি হলে কোনো ব্যবসায়ী আপনার ক্ষতি পূরণ দেবে না। এ দেশের প্রচলিত আইন ওইসব অসাধু ব্যবসায়ীর রক্ষাকবচ; আপনার আমার সুরক্ষার জন্য নয়। কাজেই নিজেরা সচেতন হতে পারলে  গুটিকয়েক অসাধু ব্যবসায়ী লেজ গুটাতে বাধ্য হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।