‘তৈরি পোশাকখাত সুশাসন কর্তৃপক্ষ’ গঠনের প্রস্তাব টিআইবির

রানা প্লাজা ধসের পরে তৈরি পোশাক খাতের উন্নয়নে যেসব সুপারিশ করা হয়েছিল, তার অনেকটাই বাস্তবায়িত হলেও মৌলিক জায়গাগুলোয় কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি।

একইসঙ্গে পোশাক খাতের অগ্রগতি অব্যাহত রাখার স্বার্থে সুশাসন বিষয়ক বিভিন্ন উদ্যোগের সমন্বয় এবং তাদের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতামূলক কার্যক্রম নিশ্চিত করার জন্য পোশাক খাতের জন্য একটি ‘তৈরি পোশাকখাত সুশাসন কর্তৃপক্ষ’ গঠনের প্রস্তাব করেছে টিআইবি।

সোমবার রাজধানীতে তৈরি পোশাক খাতের সুশাসন চ্যালেঞ্জ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “গত বছরের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর গার্মেন্টস সেক্টরের নজিরবিহীন নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের বহুমুখী অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা থেকে উত্তরণের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মুখ্য অংশীজনেরা, বিশেষত সরকার, সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, বিজিএমইএ, কারখানার মালিক এবং ক্রেতাপক্ষ গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।”

তবে সকল পক্ষকে বিশেষত সরকারি সংস্থা, গার্মেন্টস মালিক এবং বিজিএমইএ এবং ক্রেতাপক্ষ ও তাদের প্রতিনিধিদের দায়িত্বশীল এবং নৈতিকতার অনুশীলনের আহ্বান জানিয়ে টিআইবি বলেছে, “এই খাতে সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্নীতি অব্যাহত থাকলে শ্রমিকরা নিরাপত্তা এবং অধিকার বঞ্চনার শিকার হতে থাকবে”।

‘তৈরি পোশাক খাতে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ: প্রতিশ্রুতি ও অগ্রগতি’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে মহাখালীর হোটেল অবকাশে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল।

সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছরের ৩১ অক্টোবর টিআইবি’র এক গবেষণায় চিহ্নিত ৬৩ ধরনের সুশাসনের সূচকের মধ্যে ৫৪টি সূচক সংশ্লিষ্ট ১০২টি উদ্যোগ গ্রহণ করে এই শিল্পের সঙ্গেসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজনেরা। এই ১০২টি উদ্যোগের মধ্যে ৩১ শতাংশ উদ্যোগ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে, ৬০ শতাংশ উদ্যোগ বিভিন্ন পর্যায়ের অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং ৯ শতাংশ উদ্যোগ এখনো ফলপ্রসূ হয়নি।

সুলতানা কামাল বলেন, “শ্রমিকদের স্বার্থের বিষয়ে যথাযথ সমন্বয় জরুরি। শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদী ও মৌলিক স্বার্থের বিষয়ে সরকার ও মালিক পক্ষের আরো বেশি ভূমিকা প্রত্যাশা করি।”

প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দুর্ঘটনার পর সরকার, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, বিজিএমইএ, কারখানার মালিক ও তাদের প্রতিনিধিত্বশীল ফোরামের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, “গার্মেন্টস খাতের সুশাসনের সমস্যা বহুমাত্রিক এবং যোগসাজশমূলক দুর্নীতির ঘটনার ব্যাপকতার কারণে ওই সমস্যাসমূহের সমাধানে অসাধারণ প্রচেষ্টার প্রয়োজন ছিল এবং সকল অংশীজন সেই সমস্যার মোকাবেলায় তাদের দৃঢ় প্রতিশ্রুতির স্বাক্ষর রেখেছেন।”

তবে গৃহীত ইতিবাচক উদ্যোগসমূহ সুশাসনের প্রতিকারে প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করলেও, টেকসই পরিবর্তনের জন্য তা অপর্যাপ্ত। সরকারের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও প্রস্তাবিত গার্মেন্টস পল্লীতে কলকারখানাগুলো সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। অনেকগুলো দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা হতাশার জন্ম দিয়েছে।

সরকার এবং ক্রেতাপক্ষ এবং তাদের ফোরাম কর্তৃক কারখানা পরিদর্শনে গতি খুবই শ্লথ এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত মানের স্বচ্ছতা ছিল না। ক্রেতার প্রতিনিধিত্বকারী কিছু পরিদর্শকদের ক্ষেত্রে স্বার্থের দ্বন্দ্বের ঝুঁকি রয়ে গেছে।

অন্যদিকে পর্যাপ্ত যাচাই বাছাই ব্যতিরেকে ও সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই নন-কমপ্লাইন্সের অত্যুৎসাহী অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনেক অর্ডার প্রত্যাহার বা বাতিল হয়ে গেছে, কমপক্ষে ৫০টি কারখানা বন্ধ হওয়ায় প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক চাকুরিচ্যুত হয়েছেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে এবং যদি ক্রেতাপক্ষ দায়িত্বশীল ও নৈতিকতা সম্পন্ন ব্যবসা পরিচালনায় ব্যর্থ হন, তাহলে আরো হাজার হাজার শ্রমিক চাকুরি হারাবে সেই কারণের জন্য, যার জন্য তারা মোটেই দায়ী নন।”

সমীক্ষা প্রতিবেদনে আরো বলা হয় যে, বিভিন্ন অংশীজনের প্রচেষ্টায় সমন্বয়হীনতার কারণে আরো দৃশ্যমান ও সুস্পষ্ট অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। সুশাসনের অব্যাহত চ্যালেঞ্জ এবং সকল উদ্যোগের কার্যকর সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে সমীক্ষা প্রতিবেদনে বিভিন্ন সুপারিশ উত্থাপিত হয় যার মধ্যে অন্যতম হলো টিআইবির পূর্বতন গবেষণার সুপারিশ অনুযায়ী একটি পূর্ণাঙ্গ গার্মেন্টস বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, ক্রেতা-মালিক অংশগ্রহণে স্থায়ী পোশাকপল্লী স্থাপন ত্বরান্বিতকরণ, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন, কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্ডার বাতিল, শ্রমিক ছাঁটাই এবং কারখানা বন্ধের ঝুঁকি নিরসনে ক্রেতা, মালিক ও সরকার কর্তৃক বিশেষ সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।