চকরিয়ায় উৎপাদনে বাম্পার সম্ভাবনা আশানুরূপ মুল্য পাচ্ছেনা লবণ চাষীরা

কক্সবাজারের চকরিয়ায় প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকুলে থাকায় চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদনে বাম্পার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ লবণ শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) কক্সবাজারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক পরিবেশের কারনে শুধু চকরিয়া নয়, পুরো জেলায় চলতি মৌসুমে লবণের ভাল উৎপাদন পরিলক্ষিত হচ্ছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, চলতি মৌসুমে বিসিকের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে লবণ উৎপাদনে নতুন রের্কট সৃষ্টি হতে পারে।

তবে স্থানীয় সুত্রে অভিযোগ উঠেছে, দেশের পর্যাপ্ত লবণ উৎপাদন ও আগের বছরের উৎপাদিত লবণ মজুদ থাকার পরও রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রীক একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী চক্র সরকারের কয়েকটি মন্ত্রানালয়ের কর্মকর্তাদের আস্কারায় বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করে দেশীয় লবণ শিল্পের বারোটা বাজাচ্ছে। এ অবস্থার কারনে চলতি মৌসুমে লবণ আমদানির একটি নৈতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশে উৎপাদিন লবণ বিক্রি করার মুহুর্তে।

বাংলাদেশ লবণ চাষী সমিতির সভাপতি ও চকরিয়া উপজেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি এডভোকেট শহিদুল্লাহ চৌধুরী জানিয়েছেন, গতবছর দেশে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ লবণ মজুদ থাকার পরও একটি মহল বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করে। যার কারনে চলতি মৌসুমে উৎপাদিত লবণ বিক্রি করতে গিয়ে চাষীরা বিপাকে পড়েছেন। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা উৎপাদন মৌসুমে লবণ ক্রয়ের জন্য কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন মোকামে উপস্থিত হন। কিন্তু বিদেশ থেকে আমদানি করা লবণে চাহিদা মেঠানোর কারনে এখনো ব্যবসায়ীরা লবণ ক্রয়ের জন্য এখানে উপস্থিত হয়নি। ফলে স্থানীয় বাজারে বড় ব্যবসায়ীরা উপস্থিত না হওয়ায় কক্সবাজার জেলার লবণ চাষীরা সঠিক মুল্যে লবণ বিক্রি করতে পারছেনা। এখনো বেশির ভাগ চাষীর উৎপাদিত লবণ মাঠেই পড়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ লবন শিল্প কর্পোরেশন কক্সবাজারের গবেষণা কর্মকর্তা এটিএম ওয়ালী উল্লাহ বলেন, এবছর (চলতি মৌসুমে) কক্সবাজার জেলার চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, টেকনাফ, কক্সবাজার সদর উপজেলা ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী (আংশিক) উপজেলার ১৩টি কেন্দ্রের অধীনে প্রায় ৬০হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছে। এসব এলাকায় গতবছর লবণ জমির পরিমাণ ছিলো ৬৪হাজার ১৫১ একর। তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে বিসিক লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ১৮লাখ ৯৬হাজার মেট্রিক টন। গতবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ১৫লাখ ১০হাজার মেট্রিক টন। প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকুলে থাকায় লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে উৎপাদন হয় ১৬লাখ ৩৩হাজার ৯শত মেট্টিক টন লবন। চাষীদের হিসেব মতে উৎপাদনের পরিমান ১৯লাখ মেট্রিক টনের বেশি হবে। বিসিক গবেষণা কর্মকর্তার ধারণা, এবছরও (চলতি মৌসুমে) প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুকুলে থাকায় লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে লবণে বাম্পার উৎপাদন হবে।

বাংলাদেশ লবণ চাষী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো.শহিদুল ইসলাম বলেন, গতবছর উৎপাদিত লবন দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিসিকের তথ্য মতে এখনো বিপুল পরিমাণ লবণ চাষীদের জমিতে বিক্রির অভাবে পড়ে রয়েছে। গতবছরের চাষের খরচ এখনো অনেক চাষী উত্তোলন করতে পারেনি। তারপরও জীবিকার প্রয়োজন ও বাপ-দাদার পেশা হিসেবে চাষীরা এবছরও (চলতি মৌসুমে) লবণ চাষে নেমেছে। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশ ভাল থাকায় এখন জমিতে বিপুল পরিমাণ লবণ উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা গতবছর কারসাজির মাধ্যমে বিদেশ থেকে লবন আমদানি করে দেশের লবণ শিল্পের গলা চেঁেপ ধরেছে। এ অবস্থার কারনে চলতি মৌসুমে উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও চাষীরা বড় ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি না থাকায় এখানে ভাল দামে লবণ বিক্রি করতে পারছেনা। তিনি আরো বলেন, দেশের লবণ শিল্প ও চাষীদের রক্ষা করতে হলে অবশ্যই বিদেশ থেকে লবণ আমদানির প্রথা বন্ধ করতে হবে। এ জন্য সরকারের সংশিষ্ট মহলকে দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করতে হবে। না হলে এখানকার ক্ষুদ্র লবণ চাষীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকানো ছাড়া উপায় থাকবেনা।

গত কয়েকদিন সরেজমিনে চকরিয়া উপজেলার বদরখালী, ইলিশিয়া, দরবেশকাটা, ঢেমুশিয়া, খুটাখালী ও ডুলাহাজারা ইউনিয়নের লবণ উৎপাদন এলাকা ঘুরে চাষীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিমণ (পলিথিন পদ্ধতির) সাদা লবণ ১৪০-১৫০টাকা ও সনাতন পদ্ধতির (মাঠ ওয়াশ) কালো লবণ বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকা দামে। এতে চাষীদের উৎপাদন খরচও মিলছেনা বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক চাষী। চাষীরা জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উৎপাদন মৌসুমে বড় ব্যবসায়ীরা লবণ ক্রয় করতে আসেন। তাঁরা আসলে লবণ বিক্রি করে ভাল দাম পেতেন। কিন্তু এবছর এখনো এসব বড় ব্যবসায়ীরা লবণ ক্রয় করতে আসেনি। ফলে স্থানীয় বাজারে কমদামে উৎপাদিত লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।