নাই্যংছড়ির জামছড়ি সীমান্তে ১০ মর্টার সেল নিক্ষেপ ও গোলাবর্ষণ

* বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে
* বিজিবি-বিজিপি ও নৌ বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান
* সীমান্তের প্রায় ১০টি পয়েন্ট হতে মিয়ানমারের পুঁতে রাখা মাইন উদ্ধার
* পূর্ব নির্ধারিত পতাকা বৈঠকটি অনিশ্চিত

 
নাইংছড়ি সদর ইউনিয়নের পর্দানঝিরি ও জামছড়ি এলাকা বরাবর মিয়ানমার সীমান্তে গোলাবর্ষণ হয়েছে। গতকাল ৩ জুন মঙ্গলবার রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণে সীমান্ত কাপিয়ে তুলে মিয়ানমার বাহিনী। ওই ঘটনায় এলাকার জনগণ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে দিগি¦দিক ছুটাছুটি করে। অধিকাংশ লোকজন বাড়ি-ঘর ছেড়ে নিরাপদে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। ঘটনার পর পরই নাই্যংছড়ির জামছড়ি এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা কামাল উদ্দিন (৩২ ) জানান রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে সে বাজারের দিকে যাওয়ার সময় পানছড়ির ৪৫ ও ৪৬ নং পিলারের ওপার থেকে গোলাবর্ষণের আওয়াজ শুনতে পেয়ে সে দ্রুত ব্রীজের নিচে আশ্রয় নেয়। তার পরিবারও ঘর-বাড়ি ছেড়ে কোথায় আশ্রয় নিয়েছে সঠিক ভাবে বলতে পারেনি।

 

ওই এলাকার ইউপি সদস্য আলি হোসেন জানান, আমি নিজেও আতংকিত, আমার আশে-পাশের এলাকাবাসীকে নিরাপদে সরে যেতে বলেছি, এবং বিষয়টি প্রশাসনকেও জানিয়েছি। এর কিছুন পরেই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)’র সাথে যোগাযোগ করা হলে নাই্যংছড়ি জোন ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শফিকুর রহমান জানান, সীমান্তে মিয়ানমার অংশে গোলবর্ষণের আওয়াজ শুনা গেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, মায়ানমার সীমান্তরী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ও মায়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের রোহিঙ্গা বিছিন্নতাবাদী সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) সাথে এই গোলাগুলি হয়েছে। উভয় পে কমপে ১ শত রাউন্ড গুলি এবং মায়ানমার থেকে বিকট শব্দের ১০টি মর্টার সেল নিপে এর খবর পাওয়া গেছে। তবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া  যায়নি।

 
প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে সীমান্তে উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বান্দরবান জেলা প্রশাসক কেএম তারিকুল ইসলাম জানান, ‘মিয়ানমার গায়ে পড়ে কিছু করার চেষ্টা করলে আমরাও তার কড়া জবাব জানাতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকায় যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে সে জন্য মিয়ানমার সরকার দায়ী। এমুহূর্তে কূটনৈতিক পর্যায়ে ঢাকা ও মিয়ানমারে পৃথক বৈঠকের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু সমাধানের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে সরকার।

 
বান্দরবানের নাই্যংছড়ি সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমান মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) গুলিতে নিহত হওয়ার পর সীমান্তে দুই পই শক্তি বৃদ্ধি করে আসছে।
এদিকে কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলের অদূরে বাংলাদেশি জলসীমার কাছাকাছি তিনটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে মিয়ানমার। পাল্টা জবাবে বাংলাদেশও জলসীমায় যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। তবে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে মিয়ানমারের যুদ্ধজাহাজ সরিয়ে নিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

 
এর আগে প্রত্যদর্শী সূত্রে জানা যায়, ৫২, ৫০, ৫১ নম্বরসহ কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্টে মিয়ানমার সীমান্তরী বাহিনী মাইন পুঁতে রাখে। মাইনগুলো বিজিবি ও স্থানীয় জনসাধারণের সহায়তায় মাটি থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে।
মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে দু’পই মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। সীমান্ত অধিবাসিরা চরম আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পুরো সীমান্ত জুড়ে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করে কঠোর সতর্কাবস্থায় রয়েছে। সেন্টমার্টিন ও শাহপরীরদ্বীপের মাঝামাঝি জল সীমানায় মিয়ানমার নৌ-বাহিনীর তিনটি জাহাজ অবস্থান নেওয়ায় বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীও মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে বলে জানা গেছে।

 
মিয়ানমার মংডু শহরে সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ে আজ ৫ জুন বৃহস্পতিবার সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও উক্ত বৈঠকে সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এপার-ওপারে সীমান্ত এলাকায় পরিস্থিতি নজরদারীতে দুই দেশের সীমান্তরী বাহিনী অনড় থাকবে বলে সীমান্তের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে ধাবিত হওয়ায় ৫জুনের পূর্ব নির্ধারিত পতাকা বৈঠকটি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এব্যাপারে জানতে সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল ফরিদ ও নাই্যংছড়ি ৩১ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল শফিকুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে এদের কেউ ফোন রিসিভ করেননি।

 
সীমান্তে নির্ভরযোগ্য কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবানের নাই্যংছড়ি, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তের বিপরীতে বিজিপির পাশাপাশি মিয়ানমার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে। তারা সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশও দিয়েছে। ফলে  মংডু শহরে সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী ওয়ালিদং, ফকিরাবাজার, সাহাব বাজার, তুমব্র“, ঢেকিবনিয়া, নাইচাদং, পেডানপুরো, বলিবাজারসহ প্রভৃতি গ্রামের রোহিঙ্গা মুসলিমদের মাঝে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা ও চরম আতংক বিরাজ করছে।

 
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মুজাহিদ উদ্দীন জানান, সেন্টমার্টিন ও শাহপরীরদ্বীপ এলাকার মাঝামাঝি জল সীমানায় মিয়ানমারের নৌ-বাহিনীর জাহাজ অবস্থান করছে। বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর একটি জাহাজও জল সীমানায় অবস্থান করছে।
তিনি বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজিবি সদস্যরা সতর্ক প্রহরায় রয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।