ঈদ সামনে রেখে সারা দেশে পথে পথে পুলিশের চাঁদাবাজি

ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীসহ সারা দেশে অসৎ পুলিশ সদস্যরা পরিবহন সেক্টরে ব্যাপক চাঁদাবাজিতে নেমেছে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা অভিযোগ করেছেন এই অসৎ পুলিশ সদস্যদের অত্যাচারে রাস্তাঘাটে যানবাহন নিয়ে বের হওয়া যাচ্ছে না। রাস্তায় বের হলেই টাকা দিতে হয়।

 

মালিক-শ্রমিকদের অভিযোগ নানা অজুহাতে পুলিশ এই অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে পুলিশের এই অত্যাচার বাড়ছে। রাজধানীর পথঘাটসহ সড়ক-মহাসড়ক সর্বত্রই পুলিশের এই অত্যাচার ভয়ানক রূপ নিয়েছে।

 

পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা বলেছেন, হাইওয়ের অর্ধশতাধিক স্পটে পুলিশ প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে। আর রাজধানীতে এরূপ স্পট রয়েছে ৩০টির ওপরে। যেখানে একটু দাঁড়ালেই পুলিশের বখরা নেয়ার দৃশ্য চোখে পড়বে। এ দিকে চাঁদাবাজির ব্যাপারে ডিআইজি হাইওয়ের সাথে সোমবার সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো কথা বলতে পারবেন না বলে জানান।

 

পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা বলেছেন, কিছু অসৎ পুলিশের অত্যাচারে তারা এখন অতিষ্ঠ। কোনোভাবেই তাদের নিবৃত করা যাচ্ছে না। রাস্তায় নামলেই তাদের চাঁদা দিতে হয়। না হলে ঠিকমতো গাড়ি চালানো যায় না। তারা বলেন, যাদের দায়িত্ব রাস্তায় যাত্রী ও মালামালের নিরাপত্তা প্রদান, তারাই এখন আতঙ্কের কারণ। রক্ষক হয়ে পুলিশের কিছু সদস্য ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছেন।

 

প্রতি রাতেই সাড়ে ৯টার দিকে মতিঝিল শাপলা চত্বরে দেখা যায় বিশাল যানজট। অনুসন্ধানে দেখা গেছে এখানে এই সময়ে যানজটের কারণ ট্রাকে পুলিশের চাঁদাবাজি। গত কয়েক দিনে প্রত্যক্ষ করা গেছে রাত ৯টার পর থেকেই কিছু ট্রাক রাজধানীতে প্রবেশ করে, যদিও রাত ১০ টার আগে ট্রাক এবং দূরপাল্লার বাস রাজধানীতে প্রবেশ করার কথা নয়। নির্ধারিত সময়ের আগে রাজধানীতে প্রবেশ করায় এই ট্রাকগুলো পুলিশের টার্গেট। মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকায় এই ট্রাকগুলো রাস্তার ওপর থামিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির ঘটনা প্রত্যক্ষ করে আসছেন পথচারীরা।

 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এখানে একটি পুলিশ বক্স রয়েছে। যেখানে রাতে ট্রাকের লাইন লেগে যায়। একই অবস্থা রাজধানীর দৈনিক বাংলা, পল্টন মোড়, শাহবাগ, বাংলামোটর, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, তেজগাঁও সাত রাস্তা ও ফার্মগেটসহ বিভিন্ন এলাকার।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফার্মগেট এলাকার ট্রাফিক ইন্সপেক্টর রফিকের অত্যাচার চরম আকার ধারণ করেছে। এখানে প্রতিদিন হয়রানির শিকার হচ্ছেন গাড়িচালকেরা। কেউ টাকা দিতে না চাইলে তাকে ফার্মগেট পুলিশ বক্সে নিয়ে আটকে রাখা হয়। রফিকের নিজস্ব একটি বাহিনী রয়েছে। যাদের দিয়ে তিনি নিয়মিত চাঁদাবাজি করছেন।

 

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে অবগত আছেন। কিন্তু রফিকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। একাধিক সিএনজি অটোরিকশাচালক বলেছেন, এই এলাকা অতিক্রম করতে তাদের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। কোনো গাড়িকে সিগন্যাল দিলেই ধরে নেয়া হয় টাকা না দিলে মুক্তি নেই।

 
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি মহাসড়কে। দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকচালকেরা বলেছেন, একটি গাড়ি ঢাকায় পৌঁছতে দুই থেকে তিন হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। ঈদ এলে এই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক-শ্রমিক ঐক্যপরিষদের সদস্য সচিব মাহমুদুল আলম মন্টু বলেছেন, পথে পথে থামিয়ে হাইওয়ে পুলিশ চাঁদাবাজি করছে। তিনি বলেন, পুলিশের দায়িত্ব যাত্রী ও মালামালের নিরাপত্তা দেয়া। কিন্তু হাইওয়ে পুলিশ এখন চালকদের কাছে আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে।

 

ফেরিঘাটগুলোর প্রবেশদ্বারেই পুলিশের হাতে টাকা গুঁজে দিতে হয়। না হলে সিরিয়াল পেতে দেরি হয়। এটি বেশি হয় ট্রাকের বেলায়। মালবোঝাই ট্রাক আটকে দেয় ঘাটে টাকা না পেলে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ওসমান আলী বলেন, পুলিশ রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে।

 

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি হাজী মো: তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, রাস্তায় গাড়ি পেলেই পুলিশ তা নিজেদের গাড়ি মনে করে টাকা নিয়ে নেয়। পুলিশ কারণ অকারণে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে চাঁদাবাজি করছে।

 

হাইওয়ে পুলিশের সাথে পাল্লা দিয়ে চাঁদাবাজি করছে জেলা পুলিশ। মানিকগঞ্জের নয়ারহাটে সরকার স্কেল বসিয়েছে। এখন গাড়িতে বেশি মালামাল লোড করা হলেও সেখানে এক হাজার টাকা দিতে হয়, আবার লোড কম হলেও এক হাজার টাকা দিতে হয়। না হলে ড্রাইভারদের ধরে নিয়ে মারধর করে।

 

তোফাজ্জল হোসেন বলেন, এয়ারপোর্ট রোড দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে মাসের শুরুতেই পুলিশের কাছ থেকে টোকেন নিতে হয়। না হলে পুলিশ এয়ারপোর্ট রোড দিয়ে কোনো ট্রাক ঢাকায় ঢুকতে দেয় না। তোফাজ্জল বলেন, যশোর থেকে একটি গাড়ি ঢাকায় আসতে পথে কম হলেও দুই হাজার টাকা দিতে হয়। এমনকি অনেক সময় তিন-চার হাজার টাকাও দিতে হয়। তিনি বলেন, মালিক ও শ্রমিকরা এখন অতিষ্ঠ।

 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি মো: আলী রেজা বলেন, পুলিশের চাঁদাবাজির কারণে মালিক-শ্রমিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি বলেন, প্রতিটি জেলায় এভাবে চাঁদাবাজি চলছে। কোথাও চাঁদাবাজির মাফ নেই। এখন মাসিক হারে চাঁদা নিচ্ছে। গাড়ি চালাতে হলে মাসের শুরুতেই চাঁদা দিতে হবে। মালিক-শ্রমিকেরা এর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেন না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।