২০১৪ সাল ছিল একটি দুঃসহ আর ২০১৫ সালটি হবে জনগণের বিজয়ের বছর: খালেদা

বুধবার সন্ধ্যায় গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যারলয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া বলেছেন জাতীয় জীবনে ২০১৪ সাল ছিল একটি দুঃসহ বছর, আর সামনে জনগণের বিজয় আসন্ন।   আগামী বছর হবে জনগণের বিজয়ের বছর।”  বলে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বিএনপির চেয়ারপারসন দেশবাসীকে ইংরেজি নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানান।
খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার  বলপ্রয়োগ ও ভয় দেখিয়ে টিকে থাকতে চায়্। তবে জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ালে ‘এই অগণতান্ত্রিক ও অবৈধ সরকারের’ পতন অনিবার্য বলে মনে করেন তিনি।

গণতন্ত্র, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে দেশের মানুষ জীবন দিয়েছিলেন উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, “আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দখলদারেরা সেসব লক্ষ্যের কবর রচনা করেছে। আমরা মনে করি, লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন এ বাংলাদেশের মালিকানা এখন আর জনগণের হাতে নেই।”

গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে প্রহসন হিসেবে মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে  সরকার, সংসদ, মন্ত্রিসভা, স্পিকার ও বিরোধী দলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের প্রতিনিধিত্বহীন হয়ে পড়েছে।  এ থেকে যে জাতীয় সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে জনপ্রতিনিধিত্বহীন বর্তমান শাসনব্যবস্থা প্রলম্বিত হওয়ার কারণে।”

খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, “গত এক বছর ধরে আমরা সর্বোচ্চ সংযম বজায় রেখে সংঘাত এড়িয়ে চলছি। অথচ প্রতিনিয়ত আমাদের কুৎসিত ও আক্রমণাত্মক ভাষায় হুমকি দেয়া হচ্ছে। আমাকে নাকি তারা মাইনাস করে দেবে। আমি মনে করি, চূড়ান্ত বিচারে মাইনাস করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের। অতীতে যারা মাইনাস করতে চেয়েছেন, তারাই মাইনাস হয়ে গেছেন। আর রাজনীতি থেকে আমাকে মাইনাস করার সিদ্ধান্ত একমাত্র দেশবাসী নিতে পারেন। অন্য কেউ নন। যারা হুমকি দিচ্ছে তারা তাদের ফ্যাসিবাদী চেহারাই সকলের সামনে তুলে ধরছে। দেশবাসীই যথাসময়ে তাদের উপযুক্ত জবাব দেবে।”

খালেদা জিয়া আরো অভিযোগ করেন, “যারা সরকারের অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিবাদ করছে তাদের ওপর নগ্ন হামলা চালিয়ে, মিথ্যা মামলা দিয়ে এবং গুম ও খুন করে স্তব্ধ করার চেষ্টা করছে। মানববন্ধনের মতো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও প্রতিবাদী জনগণকে দাঁড়াতে বাধা দেয়া ও হামলা করা হচ্ছে। সবখানে বিএনপি, ২০ দল ও অন্যান্য বিরোধী মতের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালাতে প্রকাশ্য উস্কানি ও নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। দেখামাত্র গুলি করার আদেশ দিয়ে আজ তারা জনগণের মত প্রকাশের মৌলিক অধিকারকে পদদলিত করছে। আইনের শাসন এখন পুরোপুরি নির্বাসিত।”

সরকার সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তের ভাষায় কথা বলছে দাবি করে বিএনপির চেয়ারপারসন হুঁশিয়ার করেন, “আমি বলতে চাই, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আগামীতে আরো সরকার আসবে। এখন আপনারা যেসব অপকর্ম করছেন, যেমন আচরণ করছেন, তার প্রতিফল আগামীতে ভয়ংকর হতে পারে।” বুঝে-শুনে কথা বলা ও কাজ করতে সরকারকে সতর্ক করে দেন তিনি।

খালেদা জিয়া বলেন, সরকারি দলের ছাত্র ও সহযোগী সংগঠনগুলো জনগণের কাছে ধিকৃত হতে হতে এখন বিভীষিকা ও মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের সন্ত্রাস ও অত্যাচারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ছাত্রলীগের অন্তর্ন্দ্বন্দ্বে প্রাণ হারাচ্ছে অনেকেই।

দেশের আইন-শৃঙ্খলার গুরুতর অবনতির হয়েছে দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, এর আগে এমন আর কখনো হয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, অপহরণ, সাংবাদিক নির্যাতন, চাঁদাবাজি, সংঘর্ষ, টেন্ডার ডাকাতি অবাধে চলছে। সংবাদ-মাধ্যমে শুধু হত্যার খবর আর লাশের ছবি। মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। এখন আতংকের জনপদের নাম বাংলাদেশ।”

বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, “সর্বগ্রাসী দুর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গেছে। অর্থনীতির মেরুদণ্ড  ভেঙে গেছে। ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো লুণ্ঠিত হয়েছে। হাজার হাজার কোটি কোটি ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে।”

দেশে আজ শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং  এর অবসান না হলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন খালেদা জিয়া।  তিনি বলেন, এই সংকট উত্তরণে অনতিবিলম্বে একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, অবাধ, নিরপেক্ষ, ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে সরকার গঠনের  কোনো বিকল্প নেই।

সেই লক্ষ্যে তিনি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, ভোটার তালিকার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করা, সব রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তি, বন্ধ করে দেয়া সব সংবাদপত্র ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল খুলে দেয়াসহ বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন।

বিএনপির চেয়ারপারসন ঐক্যবদ্ধভাবে একটি জাতীয় আন্দোলন গড়ে তুলতে সব গণতান্ত্রিক দল, শক্তি ও ব্যক্তির প্রতি  আহ্বান জানান। বিএনপি ৫ জানুয়ারি দিনটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ ঘোষণা করেছে জানিয়ে তিনি এ উপলক্ষে কয়েকটি কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর মধ্যে রয়েছে ওই দিন সারা-দেশে সভা-সমাবেশ ও কালোপতাকা বিক্ষোভ মিছিল। ঢাকায় কেন্দ্রীয় সমাবেশ।সরকার তাদের শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করতে দেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বর্তমান সরকারের হাত আলেম, সেনা অফিসার ও নাগরিকদের রক্তে রঞ্জিত দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, “এদের  (সরকারের) পায়ের তলায় মাটি নেই। এরা জনসমর্থনহীন। এরা বলপ্রয়োগ ও ভয় দেখিয়ে টিকে থাকতে চায়। জনগণ সাহস নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ালে এই অগণতান্ত্রিক ও অবৈধ সরকারের পতন অনিবার্য।” তিনি বলেন, “আমি মনে করি জনগণের বিজয় আসন্ন।  আমি বিশ্বাস করি, আগামী বছর হবে জনগণের বিজয়ের বছর।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।