শনিবার, অক্টোবর 16, 2021
শনিবার, অক্টোবর 16, 2021
শনিবার, অক্টোবর 16, 2021
spot_img
Homeকক্সবাজারকক্সবাজারে পাহাড় খেকোরা অপ্রতিরোধ্য!

কক্সবাজারে পাহাড় খেকোরা অপ্রতিরোধ্য!

বিভিন্ন আইনী জঠিলতা ও ফাঁক ফোকরের কারণে পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হিমসিম খাচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর। আর তাই দিনে দিনে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে কক্সবাজার জেলার চিহ্নিত ও লুকিয়ে থাকা পাহাড় খেকোরা। এসব পাহাড় খেকো ভূমিদস্যুরা আইন ও প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে শহরের ভূমিভাগের প্রায় ৭০ শতাংশ পাহাড় ইতোমধ্যেই কেটে সাবাড় করে ফেলেছে।

 

এক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতাদের ইন্ধন রয়েছে বলেও জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা। ২০১১ সাল থেকে কক্সবাজারে পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যক্রম শুরু করে। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে পরিবেশ অধিদপ্তর জেলার প্রায় অখ্যাত শ্রেণীর ৭২ পাহাড় কর্তনকারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। অন্যদিকে রহস্যজনকভাবে প্রভাবশালী শ্রেণীর চিহ্নিত পাহাড় কর্তনকারীরা এখনোও ধরাছোয়ার বাইরে রয়ে গেছে।

 

আর কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই পাহাড় কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে কয়েক শ’ মামলা হলেও এর কোনটিই এখন পর্যন্ত নিস্পত্তি হয়নি। তিনি আরোও জানান, মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব, এতিমখানা, মন্দির, লাইব্রেরীসহ আরোও বিভিন্ন স্পর্শকাতর ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের নাম ভাঙ্গিয়ে একের পর এক নিত্য নতুন কৌশল প্রয়োগ করে পাহাড় খেকোরা নিয়মিত পাহাড় কেটে যাচ্ছে। এসব স্থাপনা উচ্ছেদ বা সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোন ধরণের আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘কর্তৃপক্ষ খুবই অসহায়’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খোদ জেলা সদরের পিএমখালী, ঝিলংজা ও পৌর এলাকায় প্রায় শতাধিক পাহাড় খেকো ভূমিদস্যু রয়েছে। যারা প্রতিদিনই পাহাড় কর্তনের কাজে লিপ্ত রয়েছে। শহরের সাহিত্যিকা পল্লী, পাহাড়তলী, ঘোনার পাড়া, বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন দক্ষিণ সাহিত্যিকা পল্লী, লিংকরোড, বাসটার্মিনাল, পাওয়ার হাউস খাদ্য গুদামের পেছনে, উত্তরণ, ইসলামাবাদ, সাহিত্যিকাপল্লী সংলগ্ন সমিতিবাজার, কলাতলীর লাইট হাউজ, আদর্শগ্রাম, গুচ্ছগ্রাম, চন্দ্রিমা ঘোনা, জর্জরি পাহাড়, গরুর হালদা সড়ক, ইউসুফ আলীর ঘোনা, নতুন জেলখানার পার্শ্ববর্তী এলাকা, মাঠিয়াতলী এবং বাসটার্মিনাল সংলগ্ন ঘোনা পাড়া এলাকায় পৃথক পৃথক ভাবে পাহাড় কাটার ধুম পড়েছে।

 
সরেজমিন, শহরের পাহাড়তলী ও ঘোনার পাড়া এলাকায় এখন আর কোন পাহাড় দেখা যায় না। এখানে যেসব পাহাড় ছিল তা কেটে হাজার হাজার ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। ঝিলংজার কলাতলী মেরিন ড্রাইভ সড়কে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন ধরনের ছাড়পত্র বা অনুমোদন ছাড়াই স্থাপনা নির্মানপূর্বক দখল করে রেখেছে ‘সাম্পান রিসোর্ট’, হক বিস্কুটের মালিকের বাড়ি ও মারম্যাড রিসোর্টের মালিকের দ্বিতল ভবন। কলাতলীতে উত্তরণ সমবায় সমিতির নামে কয়েকশ’ একর পাহাড় দখল করে কেটে সমতল করে ফেলেছে উত্তরণ সমিতি। এঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মুনির চৌধুরী ঢাকা থেকে এসে একটি মামলা দায়ের করেছিলেন।

 

এছাড়াও শহরের পৌর এলাকার ৫ নং ওয়ার্ডের সাহিত্যিকা পল্লীতে অবস্থিত চতুর্দিকের পাহাড়গুলো কেটে সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব স্থাপনা একাডেমিক ভবন ও প্রফেসরস কলোনী নির্মান করেছে, একই এলাকার নজরুল নির্মাণ করেছে অক্সফোর্ড নামে একটি কথিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, আল ফারুক ইসলামীক সেন্টার নামে আরোও একটি স্থাপনা গেড়েছে সায়েম চৌধুরী নামে এক হেফাজত নেতা। লিংকরোডে সরকার দলীয় এক প্রভাবশালী নেতার পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত হয়েছে ইমাম মুসলিম সেন্টার নামে স্থাপনা ও জামায়াত নেতার ইন্ধনে কলেজিয়েট স্কুল।

 
এছাড়াও যেসব স্থানে পাহাড় কেটে ঘর-বাড়ি ও দোকান পাট নির্মাণ কাজ চলছে এদের মধ্যে রয়েছে কলাতলীতে শাহ আলম, ইলিয়াস সওদাগর, দিদারুল আলম চৌধুরী, সাহিত্যিকা পল্লীতে কবরস্থানের পাহাড় কেটে ঘর নির্মান করেছে মাহাবুব, হেলেনা ম্যাডাম, মাস্টার জনি, আবু তাহের, মনির, সিটি কলেজের বিপরীত পার্শ্বে গরুর হালদা সড়কে পাহাড় কাটছে ফুরকান, সিরু বেগমের ছেলে মোস্তাফা এবং দক্ষিণ সাহিত্যিকা পল্লীতে সাহা শর্মা।

 
এব্যাপারে জেলা পরিবেশ কর্মকর্তা সরদার শরীফুল ইসলাম জানিয়েছেন, কক্সবাজার শহরের স্থলভাগের প্রায় ৬০ শতাংশই পাহাড়ি জমি। ভোগৌলিক অথবা পরিবেশগত নানা কারণে এখানে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে যত্রতত্র বসতি গড়ে উঠে। পাহাড়ে বসবাসের অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে এরা বসতি স্থাপন করতে গিয়ে শহরের প্রায় ৭০ শতাংশ পাহাড় কেটে সমতল করে ফেলেছে বলেও স্বীকার করেন তিনি। তিনি আরোও জানান, উল্লেখিত পাহাড়গুলো পূর্বে বন বিভাগের অধিনে থাকলেও বর্তমানে ১নং খাস খতিয়ানের অন্তর্ভূক্ত এবং সমগ্র এলাকাতেই ব্যাপক ভাবে পাহাড় কাটা চলছে। সাধারণত এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ভূমি দস্যুদের আর্থিক সহযোগীতায় এবং নির্দেশনায় পাহাড়গুলো রাতের আধারে কর্তন করা হয়ে থাকে।

 

এরপর উক্ত স্থানে কিছু ঘর তুলে অবৈধ রোহিঙ্গা শরনার্থীদের পূণর্বাসন করে জমিতে দখল নিশ্চিত করা হয়। উক্ত জমি দখলে চলে এলে আরেকটি পাহাড়ে একই প্রক্রিয়ায় দখল করা হয়। যেহেতু কাগজ পত্রে জমির মালিক সরকার বা জেলা প্রশাসন এবং চক্রটি অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে নেপথ্যের অপরাধীদের সব সময় সনাক্ত করা যাচ্ছে না বলেও নিজের চরম অসহায়ত্বের কথা অকপটে স্বীকার করেন তিনি। তিনি আরোও বলেন, কক্সবাজের যে পরিমান পাহাড় কর্তন করা হয়েছে এর ফলে যেকোন সময় বড় ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ পাহাড় ধ্বসে ব্যাপক প্রাণহানীরও সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি অদুর ভবিষ্যতে হিলটপ সার্কিট হাউজ, আবহাওয়া অধিদপ্তর এর রাডার ষ্টেশন ও লাইট হাউজের মত অতিগুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনাও ধ্বসে পড়তে পারে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments