চলমান সহিংসতায় জোরালো হচ্ছে সংলাপের দাবি

বাংলাদেশের চলমান সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ‘সংলাপের দাবি’ জোরদার হচ্ছে৷ সর্বশেষ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ প্রধান দুই রাজনৈতিক নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে চিঠি দিয়ে সংলাপে বসার অনুরোধ করেছেন৷

 

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা চরম আকার ধারণ করায় কয়েকদিন আগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের (ইপি) দক্ষিণ এশীয় বিষয়ক প্রতিনিধি দল৷ সংঘাত এড়াতে দ্রুত সংলাপে বসার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি৷ ব্রাসেলস থেকে পাঠানো এক বার্তায় কমিটি-র প্রধান জি ল্যাম্বার্ট এ আহ্বান জানান৷

 

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে জি ল্যাম্বার্ট বলেন, মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার, সমাবেশ, ব্যক্তি, বাক এবং চলাচলের স্বাধীনতা সব পক্ষের নিশ্চিত করা উচিত৷ তাই চলমান সংকট উত্তরণে সরকার এবং বিরোধী পক্ষকে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে দ্রুত সংলাপের প্রয়োজন আছে বলে মনে করে ব্রাসেলস৷

 

পাশাপাশি বাংলাদেশের সব ধরণের সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন, সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠককালে দেশে চলমান রাজনৈতিক সংকট কাটাতে এবং নাশকতা বন্ধের সমাধান বের করতে সংলাপে বসার তগিদ দিয়েছেন৷

 

সচিবালয়ে সিনিয়র মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘‘বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে৷ আমরা একমত হয়েছি শান্তির স্বপক্ষে৷ সবাই শান্তি চাই, অশান্তি চাই না৷ এই যে বিশৃঙ্খলা, অশান্তি ও সন্ত্রাস চলছে আমরা সবাই এর বিরুদ্ধে৷ সবাই মনে করি যে, এর রাজনৈতিক সমাধান হওয়া উচিত৷” আলোচনার মাধ্যমে সম্পাদকরা সমাধানের প্রস্তাব করেছেন৷ তাঁরা বলেছেন, ‘‘এভাবে দেশ চলতে পারে না৷ এর একটি সমাধান হতেই হবে৷ মানুষ কতকাল এই অসহায় অবস্থায় থাকবে?”

 

বৈঠকের পর বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘‘আমরা গঠনমূলক আলোচনা করেছি৷ সম্পাদকদের মূল্যবান চিন্ত-ভাবনা ও পরামর্শ পেয়েছি৷ আমরা সকলে দেশে শান্তি চাই, কারণ আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এ দেশ পেয়েছি৷ দেশ এগিয়ে যাক, শান্তিপূর্ণ থাকুক – এ ব্যাপারে কোনো রাজনীতি নেই, কোনো মতভেদ নেই, কোনো দল নেই৷”

তিনি বলেন, ‘‘এটা ঠিক যে আলাপ-আলোচনার একটা পরিবেশ থাকে৷ সেগুলো নিয়ে আমরা কথা বলেছি৷ সন্ত্রাসের কথা অনেকে বলেছেন, নাশকতার বিষয়ে অনেকে বলেছেন৷ সবচেয়ে বড় কথা দেশটা আমাদের সকলের৷ দেশ ও মাতৃভূমিকে সব শ্রেণী ও পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে ভালো রাখব৷”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহীদুজ্জামান ডয়চে ভেলেকে বলেন, “এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না৷ অবশ্যই আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতায় আসতে হবে৷ আমাদের এখন সমস্যটা হয়েছে সংলাপে বসলেই আওয়ামী লীগ মনে করছে তারা ঠকে গেল৷ আবার বিএনপি মনে করছে তারা জিতে গেল৷ তাই আসলে ‘উইন উইন’ অবস্থায়ই সংলাপের আয়োজন করা গেলে ভালো৷

অপরদিকে রাজনৈতিক সংকটের উত্তরণে ফের সংলাপের তাগিদ দিয়েছেন ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকরা৷ একই সঙ্গে চলমান সহিংসতার নিন্দাও জানিয়েছেন তারা৷ সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘ডিপ্লোম্যাটিক’ ব্রিফিংয়ে ওই তাগিদ দেয়া হয়৷ দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশি দূতদের নিয়মিত ব্রিফিংয়ের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, ক্যানাডা, চীন, জাপান অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কোরিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের ঢাকাস্থ দূতাবাস বা হাইকমিশনের প্রধানদের আমন্ত্রণ জানিয়ে কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী৷

এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত খবর জাপা চেয়ারম্যান দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে দুই নেত্রীকে চিঠি দিয়ে সংলাপের অনুরোধ করেছেন৷ প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে এরশাদ বলেছেন, ‘‘আপনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা সম্পর্কে আপনি নিশ্চয় অবগত আছেন৷ আপনি শুধু দেশের প্রধানমন্ত্রীই নন, আমার কাছে আপনার তার চেয়েও বড় পরিচয় আপনি এ দেশের জাতির জনকের কন্যা এবং অতিব ধর্মপ্রাণ মুসলিম নারী৷ আপনার দেশপ্রেম এবং জনগণের প্রতি ভালোবাসা আমার কাছে প্রশ্নাতীত৷ আমি বিশ্বাস করি, সংকট যত তীব্র হয়, সমাধানের তাগিদ তত প্রবল হয়৷ আজকের প্রেক্ষাপটে এটা সর্বজনবিদিত যে, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে এত বড় রাজনৈতিক সংকট ইতিপূর্বে আর কখনও ঘটেনি৷”

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি বলেছেন, ‘‘আপনার দেশপ্রেম আমার কাছে প্রশ্নাতীত৷ সেই বিশ্বাস এবং আস্থা রেখেই দলীয় গণ্ডি পেরিয়ে আপনাকে এই নিবেদন করছি যে, আসুন এবার বিগত দিনের সকল তিক্ততা মুছে দিয়ে এবং ভুলে গিয়ে দেশে বিরাজমান সংকট উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করি৷”

 

সূত্রঃ ডিডব্লিউ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।