শনিবার, অক্টোবর 16, 2021
শনিবার, অক্টোবর 16, 2021
শনিবার, অক্টোবর 16, 2021
spot_img
Homeউপজেলাকুমিল্লায় দুর্বৃত্তদের পেট্রোল বোমায় বাবা মেয়ে, বিদেশ যাত্রীসহ নিহত ৭ দগ্ধ ২০

কুমিল্লায় দুর্বৃত্তদের পেট্রোল বোমায় বাবা মেয়ে, বিদেশ যাত্রীসহ নিহত ৭ দগ্ধ ২০

ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়ারবাজারের জগমোহনপুরে একটি যাত্রীবাহী বাসে দুর্বৃত্তদের পেট্রোল বোমায় ৭ যাত্রী নিহত হয়েছে। দগ্ধ হয়েছেন আরো ২০ যাত্রী। মোঙ্গলবার ভোররাত সাড়ে তিনটায় এই নির্মম ঘটনার শিকার হন অসহায় সাধারণ যাত্রীরা। নিহতরা পুরুষ না মহিলা তা চিনার উপায় নেই।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের জগমোহনপুরে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী আইকন পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো ব ১৪-৪০৮০) একটি বাসে দুর্বৃত্তরা পেট্রোল বোমা নিপে করে । এতে মুহুর্তের মধ্যে বাসটিতে আগুন ধরে যায়।  খবর পেয়ে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌছে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনে। বাসের কয়েকযাত্রী জানালা দিয়ে লাফিয়ে প্রাণে বাচঁতে পারলেও ততনে দগ্ধ হয়ে যায় অন্তত ২০ যাত্রী।

প্রত্যদর্শীরা আরো জানান, ঢাকাগামী আইকন পরিবহনের বাসটিতে যাত্রী ছিলেন ৪০ জনের মতো। রাত সোয়া তিনটার দিকে এসব যাত্রীদের বেশিরভাগই ঘুমিয়ে ছিলেন। নৈশ বাস হওয়ায় বাসের দরজাও ছিল তালা বদ্ধ। জেগে থাকা এক মহিলা যাত্রী দেখতে পান বাসটি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জগমোহনপুরে আসার পর বাম পাশ থেকে পেট্রোল বোমা ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। বোমাটি বাসের জানালার কাঁচ ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে বিষ্ফোরিত হলে পুরো বাসে আগুন ধরে যায়। তখন বাস চালক দুলাল ও জেগে থাকা মহিলা যাত্রী মাফরুহা গ্লাস ভেঙ্গে লাফিয়ে পড়ে চিৎকার দিতে থাকেন।

প্রত্যদর্শীরা জানান, খবর পেয়ে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিস। তারা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার আগেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় মহিলা যাত্রী মাফরুহার স্বামী নুরুজ্জামান পপলু ও মেয়ে মাইশা। নিহত পপলু যশোর জেলা জাসদের নেতা বলে জানা গেছে। সেই সাথে কাতারের উদেশ্যে যাওয়া তিন যাত্রীর মধ্যে ইউসুফসহ দুই জন। সব মিলিয়ে নিহত পুড়ে অঙ্গার হন ৭ যাত্রী। দগ্ধ হন আরো ২০ জন।

মিয়ারবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ নাজিম উদ্দিন জানান, এ ঘটনায় অন্তত ৭ জন নিহত এবং ১২/১৩ জন দগ্ধ হয়েছে। নিহতদের পরিচয় নিহ্নিত করা যাচ্ছে না। দগ্ধদের প্রথমে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। তিনি জানান, খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমরা ব্যবস্থা নিলেও ঘটনার বিভৎসতায় এ সময়ের মধ্যেই ওই হতাহতের ঘটনা ঘটে।

উল্লেখ্য, আইকন পরিবহনের বাসে পেট্রোল বোমা মারার কয়েক মিনিট আগে একই দুর্বুত্তরা একই এলাকার কাকড়ি ব্রিজের কাছে বিজলী পরিবহনের একটি মিনিবাসে পেট্রোল বোমা নিপে করে। পুলিশ ও লোকজনের ছোটাছুটির মধ্যে পেট্রোল বোমা ছুড়ে মারে আইকন পরিবহনে। পুড়ে যাওয়া বাসটিকে মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছুটে যান। কুমিল্লার পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তী জানান, দুর্বৃত্তদের গ্রেফতার করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। আহতদের কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে চকোরিয়ার রাশেদুল বাদশা ও হানিফের অবস্থা আশংকা জনক।

নিহতদের মধ্যে ৫ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে:
অবরোধকারীদের ছোড়া পেট্রোল বোমায় নিহত সাতজনের মরদেহ পড়ে আছে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ (কুমেক) হাসপাতাল মর্গের বারান্দায়। সাদা প্যাকেটে মোড়ানো মরদেহগুলোর মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এরা হলেন, কক্সবাজার জেলার চকোরিয়া এলাকার কৃষক ইউসুফ (৫৫), যশোর জেলার পিডব্লিউডির ঠিকাদার নুরুজ্জামান পাবলু (৫০) ও তার মেয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রী মাইশা নাইমা তাসনিন (১৬), ঢাকার কাপ্তানবাজার এলাকার ওয়াসিম ও নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার পলাশ গ্রামের শান্ত (১৬)। নিহতদের মধ্যে নুরজ্জামান পবলু, তার মেয়ে তাসনিন,  ওয়াসিম ও শান্তর পরিবারের সদস্যরা কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় পৌঁছায়। বাকিদের স্বজনরা গতকাল বিকালে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পৌঁছায়নি।

ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হওয়া ৬ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে:
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট থেকে জানানো হয়েছে দগ্ধ হওয়া ছয় ব্যক্তি ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ভর্তি হওয়া ব্যক্তিরা হলেন কক্সবাজারের মো. হানিফ (৩৫) ও রাশেদুল (২৫), মানিকগঞ্জের মো. ফারুক (২৩) ও মো. জিলক্বদ (২০), ফরিদপুরের মো. আরিফ (২২), নারায়ণগঞ্জের মো. শফিকুল (১৮)। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ খন্দকার জানান, রাশেদুলের ৮০ শতাংশ ও শফিকুলের শরীরের ২৮ শতাংশ পুড়ে গেছে। শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় তাঁদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। জিলক্বদের শরীরের ২০ শতাংশ, আরিফের ১০ শতাংশ ও হানিফের ৭ শতাংশ পুড়ে গেছে।

 

ভাগিনা পুড়ে কয়লা, বোনের সন্ধান পাচ্ছি না!
এদিকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ (কুমেক) হাসপাতাল মর্গে ভাগিনা মাহমুদুল হাসান শান্তর (১৪) মরদেহ খুঁজে পেলেও বোন আসমা আক্তার (৩৮) কোথায় আছেন তা তিনি জানেন না। তাকে এখনো খুঁজে পাননি দুলাল মিয়া। বোনের খোঁজে চৌদ্দগ্রাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছেন দুলাল মিয়া। কিন্তু কোথাও ভর্তি নেই তার বোন আসমা। দুঘর্টনার খবর পেয়ে নরসিংদী থেকে কুমিল্লায় এসেছেন দুলাল মিয়া। বড় ভাগিনা মাহমুদুল হোসানকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় পেয়েছেন। পরে কুমেক হাসপাতাল মর্গে এসে পেয়েছেন ছোট ভাগিনার মাহমুদুল হাসান শান্তর মরদেহ। কিন্তু কোথাও বোনের দেখা পাচ্ছেন না। বুক ভরা দুঃখ নিয়ে এদিক ওদিক খুঁজে ফিরছেন আদরের ছোট বোনটিকে। দুলাল মিয়া জানান, আসমা ও তার দুই ছেলে কক্সবাজার থেকে গতরাতে আইকন বাসে করে ঢাকা ফিরছিলেন। পথে এ দুঘর্টনার কবলে পড়েন। অবরোধকারীদের ছোড়া পেট্রোল বোমায় যখন পুরো বাসে আগুন জ্বলছে তখন টের পেয়ে বড় ভাগিনা হোসেন জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ে প্রাণে বেঁচে যায়। ছোট ভাগিনা শান্ত ও বোন আসমা নামতে পারেনি। তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ভাগিনা আমার পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে, কিন্তু বোনটা কোথায় আছে তা জানিনা। দুলালের আর্তনাদে হাসপাতালের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments