শনিবার, অক্টোবর 16, 2021
শনিবার, অক্টোবর 16, 2021
শনিবার, অক্টোবর 16, 2021
spot_img
Homeকক্সবাজারচকরিয়ায় ৫০৬ একর খাসজমি উদ্ধারে গতি পাচ্ছেনা স্থানীয় প্রশাসন!

চকরিয়ায় ৫০৬ একর খাসজমি উদ্ধারে গতি পাচ্ছেনা স্থানীয় প্রশাসন!

চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নের আলীমুদ্দীন ওয়াক্ফ স্টেটের নামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের সরকারী ৫০৬ একর খাসজমি বিগত ৬৩ বছর ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র জবরদখল করে রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০০৭ সালে তত্তাবধায়ক সরকারের আমলে উপজেলা প্রশাসন যৌথ বাহিনীর সহায়তায় এজমি উদ্ধার করে লাল পতাকা উছিয়ে দিলেও ফের গত আটবছর ধরে এসব জমি আবারও দখল করে নিয়েছেন ওই প্রভাবশালীরা। অভিযোগ রয়েছে, বিপুল পরিমাণ এ জমি বেহাত হওয়ার কারণে প্রতিবছর ৫০হাজার টাকা করে গেল ৬৩বছরে সরকার মুনাফাসহ প্রায় কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে ভুমি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দখলে জড়িতরা উচ্চ আদালতে রীট মামলা দেয়ার কারণে রায় নিষ্পতি না হওয়ায় মুলত এসব খাস জমি উদ্ধারে গতি পাচ্ছেনা স্থানীয় প্রশাসন।

অনুসন্ধাণে জানা গেছে, উপজেলার খুটাখালীর মেদাকচ্ছপিয়া মৌজায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি গ্রামের জাফর আলী চৌধুরীর ছেলে ইজ্জত আলী চৌধুরী’র নামীয় আর.এস ৫৬ খতিয়ানের ৮৬২ একর ৬৮ শতক জমি থেকে ১৯১৯ সালে আলিমুদ্দীন ওয়াক্ফ স্টেটের নামে ৩৩০৬ নং ভূঁয়া ওয়াক্ফ কবলা সৃজন করেন আলীমুদ্দীন চৌধুরী নামের একব্যক্তি। অথচ আর.এস খতিয়ানের রের্কডপত্রে তার কোন নাম নেই। ওই ভূঁয়া কবলা সৃজনের পর আর.এস, এম.আর.আর ও বি.এস জরীপ সম্পন্ন হলে কোন জরীপে তাদের নামে ওই জমি রেকর্ড করতে পারেনি। ১৯২৮ সালে সম্পন্ন হওয়া আর এস জরীপের পর আর এস ৫৬ খতিয়ানের জমি থেকে ১৯৫০ সালে রাষ্ট্রীয় অর্জন ও প্রজাস্বত্ব আইনের ২০ ধারা মোতাবেক উল্লেখিত খতিয়ান থেকে ৩৭৫ বিঘার অতিরিক্ত জমি সরকারের কাছে হুকুম দখলের মাধ্যমে স্যারেন্ডার করা হয়। পরে এ জমির তিপূরণ বাবত পুর্বের মালিক ফৌজুল করিম চৌধুরী (তিপূরণ মামলা নং /৫৯-৬০ ইং মূলে) ওই সময় ১৭ হাজার ২৭৭ টাকা ৮০ পয়সা ও হাজী ফৌজুল কবির চৌধুরী (তিপূরণ মামলা নং- ৩/৫৯-৬০ইং মূলে) ১৯ হাজার ৬৪০ টাকা ৩১ পয়সা সরকারের কাছ থেকে বুঝে নেন।

সুত্র জানায়, পরবর্তীতে এ জমি পিআরআর জরীপে পৃথক ৬টি খতিয়ানে বিভক্ত হয়েছে। তদমধ্যে ৫৬/১ ও ৫৬/২ খতিয়ানের ৪৩১ একর ৫৬ শতক ও ইজ্জত আলীর অধীনস্থ ১৫১ একর ৩৫ শতক জমি থেকে প্রায় ৫০৬ একর ২৬ শতক জমি সরকার খাসজমি হিসাবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের ১ নম্বর খাস খতিয়ানভূক্ত করেন। ৫৬/৩ খতিয়ানে বর্তমান মোতায়াল্লি নজরুল ইসলাম চৌধুরী’র পিতা ফৌজুল করিম চৌধুরীর নামে ৫৭ একর ৮৯ শতক, ৫৬/৪ খতিয়ানে সুলতানুল কবির চৌধুরী, পিতা- ফৌজুল কবির চৌধুরীর নামে ৩২ একর ৭৭ শতক, ৫৬/৫ ও এমআরআর ৩৫ এবং বিএস ১৫৬ খতিয়ানে আবদুল জলিল মাস্টারের নামে ৫৯ একর ২০ শতক ও ৫৬/৬, এমআরআর ৩৮ ও বিএস ৭৬ খতিয়ানে হাজী গুরা মিয়ার নামে ১২৫, একর ১১ শতক জমি রেকর্ড করা হয়। বিএস জরীপে ১১৪ ও ১১৫নং বিএস খতিয়ানে মাত্র ১৪ একর ৮০শতক জমি আলীমুদ্দীন ওয়াক্ফ স্টেটের নামে রেকর্ড হয়েছে।

এলাকাবাসী জানায়, মোতায়াল্লি বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও তার চাচাতো ভাই বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামীলীগের প্রয়াত সুলতানুল কবির চৌধুরীর পিতা এবং ওয়াক্ফ স্টেটের নামে সরকারী ভাবে ১০৫ একর ৪৬ শতক জমি রেকর্ডে উল্লেখ থাকলেও তারা বিগত ৬২ বছর ধরে প্রশাসনের বিভিন্ন্ শ্রেণীর কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ও সরকারের বিরুদ্ধে কাল্পনিক মামলা করে সরকারী খাস খতিয়ানের ৫০৬ একর জমি ভূঁয়া ওয়াক্ফ এস্টেটের নাম ভাঙ্গিয়ে জরব দখলে রেখেছে। বর্তমানে ৫০৬ একর জমির (লবণ ও চিংড়ি জমি) বাজার মূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, সরকারের বিপুল পরিমাণ খাসজমি প্রভাবশালীদের দখলে থাকায় ১৯৯৫ সালে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাদী হয়ে ৭৩ লাখ ৮০ হাজার ৫৬২ টাকা ও ২০০৭ সালে ১ কোটি ২৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা তিপূরণের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন দখলবাজ চক্রের বিরুদ্ধে। তবে ওই সময় মোতাওয়াল্লি নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও তার লোকজন এসব জমি দীর্ঘদিন ধরে ভোগ দখলে থাকার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তি পূরণ মামলার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে দুটি রিট পিটিশন মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে মামলা গুলো উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ অবস্থার কারনে বেহাত হতে চলা সরকারের বিপুল খাসজমি উদ্ধারে স্থানীয় প্রশাসন কোন ধরণের গতি পাচ্ছেনা।

জানা গেছে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মতায় আসার পর উপজেলা প্রশাসন যৌথ বাহিনীর সহায়তায় (তৎকালীন সহকারী কমিশনার ভূমি সাইফুল ইসলামের) নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে মেদাকচ্ছপিয়াস্থ আলীমুদ্দীন ওয়াক্ফ স্টেটের অবৈধ দখলে থাকা সরকারের ৫০৬ একর খাস জমি উদ্ধার করেন। এ সময় প্রশাসন ওই জমিতে লাল পতাকাও উছিয়ে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের সময় যৌথ বাহিনী ওয়ার্কফ স্টেটের বাংলো থেকে গ্রেফতার করেন মোতাওয়াল্লি নজরুল ইসলাম চৌধুরীকে। প্রায় ৮ মাস কারাভোগের পর উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে মোতাওয়াল্লি নজরুল ইসলাম চৌধুরী প্রশাসনের দেয়া লাল পতাকা উপড়ে ফেলে ফের এসব জমি আবারও জবর দখল করে নেয়। সেই থেকে এখনো জমিগুলো তাদের দখল রয়েছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত ৬৩ বছর ধরে ওয়াক্ফ স্টেটের নামে প্রভাবশালীরা সরকারের বিপুল পরিমাণ খাস জমি এভাবে অবৈধভাবে দখলে রাখলেও ইতিপূর্বে স্থানীয় প্রশাসন এসব জমি উদ্ধারে কার্যকর কোন প্রদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো প্রশাসনের কর্মকর্তারা আর্থিক সুবিধা নিয়ে গোপনে দখলবাজদেরকে নানাভাবে সহায়তা দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এ সুযোগে ওয়াক্ফ স্টেটের সংশ্লিষ্টরা সরকার বদলের সাথে নিজেদের পরিচয় বদল করে ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্ট নেতাদের অনুকম্পায় এসব জমি দখলে রেখে চলছে। এভাবে তারা বিগত ৬৩ বছর ধরে এসব জমি দখলে রেখে লবণ ও চিংড়ি চাষাবাদ করে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অপরদিকে বিপুল পরিমাণ খাসজমি বেদখলে থাকায় সরকারও প্রতিবছর লাখ লাখ টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আহম্মদ হোসেন ভুইঁয়া বলেন, সরকারের এত পরিমান জমি বেদখলে থাকার ব্যাপারটি অবহিত ছিলাম না, কারণ উপজেলায় যোগদান করেছি সবেমাত্র। তবে এব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, এরআগে উচ্চ আদালতে মামলাগুলোর বর্তমান কার্যক্রম প্রসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -spot_img

Most Popular

Recent Comments