মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কঠোর নিরাপত্তায় ভোরেই কামারুজ্জামানের দাফন সম্পন্ন

মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর নিজের শেষ ইচ্ছে মতো গ্রামের বাড়িতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী রবিবার ভোর সোয়া ৫টায় তার প্রতিষ্ঠিত বাজিতখিলা এতিমখানা মাদ্রাসার পাশেই তাকে দাফন করা হয়।

 

কামারুজ্জামানের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ভোর রাত চারটা ৫০ মিনিটে মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে ফজরের আজানের আগে কামারুজ্জামানের আত্মীয়-স্বজনদের উপস্থিতিতে নামাজে জানাজা পড়ানো হয়। জানাজার নামাজ পড়ান কামারুজ্জামানের বোনের মেয়ের জামাই এবং ওই মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ।

 

জানাজায় তিন কাতারে অন্তত ৫০ জন আত্মীয়-স্বজন অংশ নেন। এরপর ভোর পাঁচটার দিকে ওই এতিমখানার সামনে পূর্বনির্ধারিত স্থানে কামারুজ্জামানের দাফন দেয়া হয়। এরআগে ঢাকা কেন্দ্রিয় কারাগার থেকে দাফনের জন্য কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে কামারুজ্জামানের মরদেহ শেরপুরে তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

 

শনিবার দিবাগত রাত সোয়া ৩টার দিকে কামারুজ্জামানের লাশবাহী গাড়িবহর শেরপুর জেলার সীমানায় প্রবেশ করে। জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) শাহজাহান মিয়া তা গ্রহণ করেন। পরে রাত ৪টা ২০ মিনিটের দিকে সদর উপজেলার বাজিতখিলা কুমরী মুদিপাড়ায় কামারুজ্জামানের নিজ বাড়িতে পৌঁছে লাশবাহী গাড়িবহর।

 

৪টা ৪০ মিনিটে তার লাশ বুঝে নেন স্বজনরা। লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছার পরই জানাজার প্রস্তুতি শুরু হয়। সেখানে তার প্রতিষ্ঠিত বাজিতখিলা এতিমখানা মাদ্রাসার মাঠেই অনুষ্ঠিত হয় জানাজা। মধ্য রাতের আগেই কবর তৈরিসহ দাফনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখা হয়।

 

রাতেই বিভিন্ন স্থান থেকে আত্মীয়-স্বজনরা জানাজায় অংশ নিতে কামারুজ্জামানের গ্রামের বাড়িতে জড়ো হন। রাতে ওই এলাকায় প্রচুর ঝড়-বৃষ্টি হয়। পুরো এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। রাত ৪টার দিকে বিদ্যুৎ আসলেও থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা।

 

তারা জানান, কামারুজ্জামানের গ্রামের বাড়ির আশপাশে কাউকেই ঢুকতে দিচ্ছে না আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। লাশবাহী গাড়ি বহরের সাথে ঢাকা থেকে যেসব গণমাধ্যমকর্মীরা এসেছিলেন তাদেরকেও বাজিতখিলা বাজারেই আটকে দেয় আইনশৃংখলা বাহিনী। অনেকেই ঘন্টার পর ঘণ্টা বাজিতখোলা বাজারের মোড়ে অপেক্ষা করে জেলা শহরে ফিরে যান।

 

শনিবার রাত সাড়ে ১০টায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কামারুজ্জামানের রায় কার্যকর করা হয়। কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রি. জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন ফাঁসি কার্যকরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পরে রাত ১১টা ৪০ মিনিটে তার লাশবাহী গাড়ি শেরপুরের পথে রওনা হয়।

 

আগে থেকেই বাজিতখিলা এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি ও পুলিশ। শেরপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মেহেদুল করিম এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা জানান।

 

এদিকে প্রথমে মুক্তিযোদ্ধারা কামারুজ্জামানকে শেরপুরে দাফন করতে না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে শনিবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসনের সাথে বৈঠকের পর তারা দাফন প্রতিহত করার পরিবর্তে আনন্দ-মিছিল করার ঘোষণা দেন।

 

জেলা প্রশাসক জাকীর হোসেন বলেন, ‘জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল শুরুতে কামারুজ্জামানকে শেরপুরে দাফন করার ক্ষেত্রে প্রতিহত করার ঘোষণা দিলেও আমাদের অনুরোধে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।’

 

এর আগে এশার নামাজের আযান শুনে একাই গোসল করে নেন কামারুজ্জামান। এশার নামাজ আদায়ের পর দুই রাকাত নফল নামাজ পড়েন তিনি। কারা মসজিদের পেশ ইমাম তওবা পড়াতে গেলে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিজেই তওবা পড়েন এই জামায়াত নেতা।

 

ফাঁসি স্থগিত করার জন্য জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আবেদনের মধ্যে এই ফাঁসি কার্যকর করা হলো। এর মধ্যে জাতিসংঘ এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দ্বিতীয় কোনো আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হলো।

 

এর আগে একই ধরনের অভিযোগে আপিল বিভাগে যাবজ্জীবন থেকে সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর।

 

গত সোমবার কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে দেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ। এরপর রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা সুযোগ থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম এই নেতা তা নাকচ করে দিয়েছেন এই বলেন যে, প্রাণের মালিক আল্লাহ, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইব কেন?

 

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কামারুজ্জামানকে ২০১৩ সালের ৯ মে ফাঁসির আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এরপর গত বছরের ৩ নভেম্বর বিভক্ত রায়ে কামারুজ্জামানকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির আদেশ বহাল রেখে রায় দিয়েছিল আপিল বিভাগ।

 

সর্বশেষ চলতি বছরের ৫ মার্চ আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল মামলার চূড়ান্ত পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেন কামারুজ্জামানের আইনজীবীরা। গত ৬ এপ্রিল রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয় আপিল বিভাগ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।